শাঁ শাঁ শব্দে প্রায় উড়ে চলছি উচু উচু সব গাছের ফাক দিয়ে। দু হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছি মাথার উপরের হ্যান্ডেল। শুধু একটা দড়ির সাহায্যে ঝুলে আছি মাটি থেকে প্রায় ৬০ ফিট উপরে। চলতে চলতে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি চারিপাশের আর নিচে দ্রুত অপসারমান সবুজের সমারোহ। দ্রুত চলে আসলো সামনের প্লাটফর্ম। বিশাল রেডউড ট্রীর উপর কাঠের মাচার মত প্লাটফর্ম তৈরী। গাইডের নির্দেশ অনুযায়ী হাত মাথার উপরে তুলে দড়ির উপর আঙ্গুল দিয়ে দিলাম আলতো চাপ গতি কমানোর জন্য। তবে হিসেবের গন্ডগোল হয়ে গেল। যতটুকু গতি কমার কথা ছিল তার থেকে বেশী বেগে ছুটে চললাম । মনে হচ্ছে যেন সশরীরে আছড়ে পড়ব গাছের গুড়ির উপর

...

ঘরকুনো হিসেবে বন্ধুমহলে আমার বেশ দূর্নাম আছে। এর অবশ্য কারন আছে। আন্ডারগ্রাডে থাকতে দরজা বন্ধ করে দিনরাত খুটখাট করে কম্পিটারে কোড করে যেতাম। পরিনামে এখন আমার পরিব্রাজক বন্ধুদের সাথে ভ্রমন নিয়ে কথা বলতে গেলে অবজ্ঞা ভরে বলে - যা যা তোর দৌড় কতদূর জানা আছে। আমি মনে মনে লজ্জা পাই। ঠিকই ত বলেছে। আফসোস করি মনে মনে - দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া... ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই এই লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেতে মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ি।

মনে আছে স্কুলে থাকতে ক্লাসের ফিচেল ধরনের কিছু ছেলে হিন্দি কোন এক গানের প্যারোডি বানিয়েছিলো এরকম - "ঝুলে ঝুলে লাল মেরা মাস্তাকালান্দার।" হেড়ে গলায় মাঝে মাঝে গেয়ে নিজেদের মধ্যে ফ্যাচ ফ্যাচ করে হাসাহাসি করত। মনে হয় অশ্লীল জাতীয় কোন কথা। ঝুলে ঝুলে লাল না হলেও আমাদের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির জিপলাইন ক্যানোপি ট্যুরে ঝুলে ঝুলে পার হবেন প্রায় ২০০০ ফিট। গ্যাদাকালে কার না শখ ছিল টারজানের মত দড়ি ধরে গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ানোর। সেই দূঃখে ত আমাদের পৌনেপাতলুন পরিহিত উত্তরাধুনিক কবি কি জানি দূছত্র লিখে ফেলেছিল টারজান বিষয়ক। তবে একেবারের টারজানের মত না হলেও, প্রায় বিনা দক্ষতায় কাছাকাছি একটা অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এই জিপলাইন ট্যুরের উপর ভালো কিছু হয় না। তার উপর ভার্সিটির ছাত্র হিসেবে পাচ্ছি স্পেশাল হাফ প্রাইস ডিস্কাউন্ট। মাগনা পাইলে বাঙালী নাকি আলকাতরাও খায়, হাফ প্রাইস পেয়ে আমি উঠলাম গাছের আগায়। উনিশ-বিশ।

ডাব্লিউ ভি এর জিপলাইন ক্যানোপি ট্যুরে আছে ৪-টা জিপলাইন, একটা গাছ থেকে আরেক গাছে যাবার জন্য দড়ির সেতু যাকে এরিয়াল ব্রিজ বলে, মাচার একতলা থেকে দোতলায় যাবার জন্য কাঠের গুড়ির তৈরী মই যাকে বলে এরিয়াল ল্যাডার । ট্যুর পরিশেষে আছে র‍্যাপেল স্টেশান যেখান থেকে দড়ির সাহায্যে ঝুলে ঝুলে মাচা থেকে নেমে যাবেন ৪৫ ফিট নিচের মাটিতে। জিপলাইন চারটার প্রথমটার দৈর্ঘ্য ২০১ ফিট থেকে শুরু করে , আস্তে আস্তে দীর্ঘ হয়ে শেষটার দৈর্ঘ্য ৯৮০ ফিট। মাটিতে নামে দশ মিনিট বনের মধ্যে হেটে বেজক্যাম্পে ফেরত।

নির্ধারিত দিনে সকাল সকাল গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম কুপারস রক স্টেট ফরেস্টের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে করে আধা ঘন্টার মত লাগে যেতে। বনের মধ্যে ভার্সিটির আউটডোর এডুকেশান সেন্টার। অফিস বাংলো ছাড়াও আছে, ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। দেখি আমার সাথে বেশ কজন আমেরিকান ট্যুরে অংশ নিচ্ছে। বাবা-মা আর দুই ছেলে-মেয়ে, একজন বয়োবৃদ্ধ কিন্তু মোটামোটি শক্তসমর্থ ব্যক্তি (পরে জেনেছিলাম ইনি ক্যান্সার থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন সম্প্রতি।)

অবনীল
ছবিঃ বনের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে রাস্তা ।অবনীল

 

অবনীল
ছবিঃ আউটডোর এডুকেশন সেন্টারে ঢোকার মুখে ছোট্ট একটা কভার্ড ব্রীজ পার হতে হয়।অবনীল

অফিসে ফর্ম-টর্ম সাইন করে বনের মধ্যে দিয়ে মিনিট পাচেক হেটে চলে গেলাম নির্ধারিত স্থানে। দেখি এখানে অবস্ট্যাকল কোর্স করার জন্য উচু সব কাঠের কাঠামো দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাধা। আর আউটডোর কোর্সের ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য স্থায়ী চালার মত কিছু ঘর তৈরে করে রাখা আছে। ট্যুর গাইডদের সাথে পরিচিত হলাম। তারা আমাদের নিয়ে চললো একটা ঘরের বারান্দায়। দেখেই বারান্দায় শোয়ানো আছে সারি সারি হারনেস আর হেলমেট। কিভাবে পড়তে হবে দেখিয়ে দিল তারা। এই হারনেস জিপলাইনে লাগিয়ে ঝুলে পড়তে হবে দড়ি থেকে, তারপর শো শো করে যাত্রা। সবকিছু পড়ে-টড়ে চল্লাম সবাই প্রথমেই প্র্যাকটিস লাইনে। ছোট্ট একটা জিপলাইন । ১০-১৫ ফিট লম্বা হবে। এখানে কিভাবে হারনেসের সাথে জিপলাইন কারাবিনারের সাহায্যে আটকাতে হবে , হ্যান্ডল্বার কিভাবে ধরতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা দড়িতে কিভাবে চাপ দিয়ে গতি কমাতে হবে আর মাচায় পৌছানোর আগেই যদি থেমে যাও তাহলে কিভাবে পোছাতে হবে দেখানো হলো। একবার বুঝে ফেলতে পারলো পুরো ব্যাপারটা তেমন জটিল কিছু না।

অবনীল
ছবিঃ জিপলাইনে চড়ার জন্য প্রস্তুত।অবনীল

প্রাকটিস শেষে আমাদের নিয়ে চলা হলো আসল জায়গায়। দেখি ছোট একটা কাঠের প্লাটফর্মে সিড়ি উঠে গেছে। গাইডরা বলে দিল - "এই লাইনে যে আগে থাকবে সে যাবে কিন্তু সবার শেষে কারন, উঠার পর পরি কারাবিনার চেঞ্জ করে প্লাটফর্মের সাথে হারনেস আটকে দেওয়া হবে।" আমি ছিলাম সবার শেষে । ভাবছিলাম শেষে গেলে বোধহয় পুরো ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখে নিতে পারবো। কিন্তু অবস্থার ফেরে কারাবিনার চেঞ্জের পরিক্রম অনুসারে আমি হয়ে গেলাম সবার প্রথম জিপলাইন যাত্রী! একজন গাইড অবশ্য চলে গেল সবার আগে। ক্যাম্পগ্রাউন্ডটা আসলে কিছুটা উচু যায়গায়। জিপ্লাইনে চড়ে যেতে যেতে দেখবেন মাটি পায়ের নিচ থেকে দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কারন লাইন চলে গেছে নিচু যায়গায় অবস্থিত একটা গাছের মাচায় ।

এই মাচাটা মাটি থেকে প্রায় বিশ ফিট উপরে। খুব দ্রুত পার হয়ে গেলাম ২০০ ফিট ধাতস্থ হতে না হতেই। মাচা কাছিয়ে আসাতে দূর থেকে দেখলাম গাইড গতি কমানোর সিগন্যাল দিচ্ছে। দড়িতে আলতো চাপ দিয়ে গতি কমিয়ে নিলাম। ব্রেকারে এসে পৌছানোর পর শুন্যে ঝুলত অবস্থায় নিজেকে ঘুরিয়ে নিয়ে দড়ি ধরে ধরে চলে আসলাম মাচার উপর। অপেক্ষা করতে লাগলাম অন্যদের জন্য। সবাই মাচায় একসাথে হলে কুপারস রক স্টেট ফরেস্টের উপর সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিল গাইড। জেনে অবাক হলাম জৈববৈচিত্রের দিক দিয়ে এই অরণ্য বিশ্বের বিখ্যাত সব বনাঞ্চল যেমন এমাজন রেন ফরেস্টের সাথে র‍্যাঙ্কিং-এ সারির প্রথম দিকে। দূরে তাকিয়ে দেখলাম চেস্টনাট রিজ পর্বতের সারি। গাছের উচু থেকে বনের বৈচিত্রের একটা সম্পূর্ণ ভিন্নরকম ধারনা পাওয়া যায়।

অবনীল
ছবিঃ প্রথম জিপলাইন পার হচ্ছি। প্রায় ২০০ ফিট দৈর্ঘ এর।অবনীল

 

অবনীল
ছবিঃ পেছনে পেন্সিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের চেস্টনাট রিজ পর্বতসারি দেখা যাচ্ছে। এর উচ্চতা সাগরপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ ফিট।অবনীল

শুরু দ্বিতীয় পর্ব। এই মাচা থেকে পাশের আরেকটা গাছে চলে গেছে কাঠের গুড়ি দিয়ে তৈরী দড়িতে বাধা মই। বুঝলাম এইটাই সেই এরিয়াল ব্রিজ। গাইড নির্দেশ দিল - একজন একজন করে পার হবেন। কেউ ঝাকাবার চেষ্টা করবেন না বা একসাথে পার হবার চেষ্টা করবেন না। এতে দুলুনির চোটে তাল হারিয়ে বিপদের শংকা আছে। আবার ভাগ্যের ফেরে লাইনে সবার আগে আমি। আস্তে আস্তে কাঠের গুঁড়ির উপর এক পা দুপা করে পার হতে লাগলাম। নিচে তাকিয়ে দেখি কাঠের গুড়ির ফাক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নিচের সবুজ। কোন দূর্ঘটনা ছাড়াই পার হয়ে গেলাম।

অবনীল
ছবিঃ এরিয়াল ব্রিজ পার হবার সময়।অবনীল

এবার আরো দীর্ঘ লাইন। প্রায় ৭০০ ফিট লম্বা । এরেকটু বেশী চ্যালেঞ্জিং কারন এবার লাইন শেষে যে মাচা সেটা মাটি থেকে চল্লিশ ফিট উপরে। লাইন যত দীর্ঘ হয় ভরবেগ তত বাড়তে থাকে, তাই যাত্রা শেষে নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে যায়। যাহোক, এবার সবার শেষে আমি। শো শো শব্দে চলতে লাগলাম দড়ি বেয়ে। শক্ত করে ধরে আছি মাথার উপরের হ্যান্ডেল। পুরো শরীর ঝুলে আছে হারনেসের সাহায্যে। এবার কিছুটা ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখার সময় পেলাম। দুধারে দীর্ঘ গাছের সারে যতদূর দৃষ্টি যায়। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি ফার্ণের মেলা বসেছে চারিদিকে। কি সুন্দর! দুবারের প্র্যাকটিস হওয়ায় এবার গতি সামলাতে সমস্যা হলোনা। মাচায় উঠে উপরের দিকে তাকিয়ে অস্ফুষ্ট সরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো - "ওহ! শিট।" এই মাচা দোতলা। কাঠের গুড়ির মই উঠে গেছে উপরে। বুঝলাম এটাই সেই এরিয়াল ল্যাডার আর এটাতে করেই উপরে উঠতে হবে আমাদের। উপরের মাচা হলো আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে উচু প্ল্যাটফর্ম। মাটি থেকে ৬০ ফিট উচুতে। গাইড আমাদের আস্বস্ত করলো যে এই মই থেকে ফস্কে পড়ে গেছে এমন ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটেনি। সাবধানে দুহাতে পায় ফর করে এক ধাপ এক ধাপ করে উঠে গেলাম উপরে। উপরের মাচা থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। ফার্ণের ব্যাপ্তি ত বিস্তৃত এই জায়গায়।

অবনীল
ছবিঃ দ্বিতীয় জিপলাইন। ৭০০ ফিট।অবনীল

অবনীল
ছবিঃ এরিয়াল ল্যাডারে করে উঠছি।অবনীল

এবার শেষ লাইন। সেই সাথে সবচেয়ে দীর্ঘতম লাইন । ৯৮০ ফিট। সবার আগে যাত্রা শুরু করলাম। তারপরের ঘটনা ত শুরুতেই বলেছি। আগেই জেনে নিয়েছিলাম জিপ্লাইনে সবোচ্চ গতিবেগ ওঠে ৩৫ মাইল/ঘন্টা। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হাত দিয়ে দড়িতে চাপ দিয়ে চলেছি। গ্লাভস ভেদ করে তপ্ত দড়ির আচ হাতের তালুতে টের পাচ্ছি। মাচার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি এমন সময় ধুম করে থেমে গেলাম। ব্যাপার কি ? উপরে তাকিয়ে দেখি স্পিড ব্রেকার সেট করা আছে । তাতে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে আমার রোলার। শুন্যে ভাসমান অবস্থায় শরীর ঘুরিয়ে দুহাত দিয়ে দড়ি ঠেলে ঠেলে রোলারটাকে এবার আরো এগিয়ে নিলাম। পায়ের নিচে মাচা চলে আসল। ঝামেলা শেষ।

অবনীল অবনীল

অবনীল
ছবিঃ দীর্ঘতম এবং সর্বশেষ লাইন। ৯৮০ ফিট লম্বা।অবনীল

একে একে সবাই মাচায় জড়ো হলে এবার গাইড বলল - আমরা আমাদের যাত্রার শেষ পর্যায়। এখন আমরা আছি মাটি থেকে ৪৫ ফিট উপরে। এখান থেকে র‍্যাপেল মানে দড়ির সাহায্যে একে একে সবাই নিচে নেমে যাবে। কিভাবে দড়ি ধরে ঝুলে পড়তে হবে দেখিয়ে দিলো । তারপর নিচ থেকে আরেক গাইড পুলি টেনে টেনে নামিয়ে নেবে। জিপলাইনের থেকে এই ব্যাপারটা বেশি অস্বস্তিকর লাগলো আমার কাছে। মাচার কিনারে শরীর ঝুলিয়ে দেবার ব্যাপার আছে ত! যাহোক একবার দড়ি ধরে পজিশন নিয়ে নিলে আর সমস্যা নাই। ধীরে ধীরে নেমে গেলাম কোনো ঝামেলা ছাড়াই। বনের ভেতর দিয়ে হাটা দিলাম সবাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।