লম্বা পথ পরিভ্রমণ আজকে। এইবার আইসল্যান্ডের উত্তর দিকে যাত্রা। গত কয়েকদিন কেবল আইসল্যান্ডের দক্ষিণে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে অদ্ভুত সব জলপ্রপাত, জিসার, গ্লেসিয়ার্স, বুলু-ল্যাগুন , টেক্টোনিক প্লেট, প্লেন রেক, কালো সৈকত এসব রয়েছে। আগের পর্বগুলোতে এসব সম্পর্কে একটু ধারণা দিয়েছে।

লেক মিভাট এরিয়াতে অবস্থিত Skútustaðagígar ।লেক মিভাট এরিয়াতে অবস্থিত Skútustaðagígar ।

প্রায় ছয় থেকে সাত ঘন্টার ড্রাইভে রাজধানী রেকাভিক থেকে এসে পৌঁছালাম মিভাট (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Myvatn) শহরে। অনেক লম্বা ড্রাইভ। তাই নর্থের দিকে খুব বেশি দর্শনার্থী আসে না। অভাবনীয় সুন্দর এই দিকটা , অনেক আকর্ষণীয় জায়গা রয়েছে। আইসল্যান্ডের ট্যুর প্ল্যানে এক রাত এই দিকটাই থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে ভালো মতো সময় নিয়ে অনেক কিছু দেখা যায় এবং একই দিকে একই পথে উল্টা দিকে ছয় ঘন্টার ক্লান্তিকর ড্রাইভটাও বাদ দেয়া যায় । যদিও হোটেল এখানে তুলনামূলকভাবে অনেক এক্সপেন্সিভ। এখানে থাকার ব্যবস্থা করে রাখিনি , উল্টাদিকে ক্লান্তিকর ড্রাইভ -এর ভাবনায় মনটা একটু বিচলিত হয়ে আছে। 
ড্রাইভ করে আসতে আসতে রাস্তার একপাশে ভোলকানিক ভ্যালি, 
সবুজ আর হলুদ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ আর অন্য পাশ দিয়ে গাঢ় নীল লেক। অপূর্ব মনোরম এই দৃশ্য।

মাঝে মধ্যে এইদিক সেদিক রাস্তা ভুলে করে অবশেষে এসে পৌঁছালাম মিভাট শহরে।

দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে গেলেও আকাশ জুড়ে রেখে গেলো বিচিত্র রক্তিম আলো। রঙের তুলির ঝাপটা আকাশের ক্যানভাসে অপূর্ব এক রূপ দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে গেলেও আকাশ জুড়ে রেখে গেলো বিচিত্র রক্তিম আলো। রঙের তুলির ঝাপটা আকাশের ক্যানভাসে অপূর্ব এক রূপ

পড়ন্ত বিকেল তখন। কনে দেখা রোদ যাকে বলে। রোদ ছড়িয়ে পড়েছে হাতে পায়ে মুখে , আলতোভাবে মিশেছে সবুজ ঘাসে, কালো পাহাড়ে , চারপাশে গাঢ় নীল লেকের পানিতে।

গাড়ি পার্ক করে একটু হেটে হাস্যজ্জল এই পড়ন্ত রৌদের মধ্যে দেখতে গেলাম লেক মিভাট এরিয়াতে অবস্থিত Skútustaðagígar । 
এখানে ভূপৃষ্ঠে সারি সারি অনেকগুলো বাটি আকৃতির বড়ো গর্ত (Pseudocraters ) রয়েছে। কিছু কিছু গর্ত টিলার মতো ছোট ছোট পাহাড়ের উপরে , কিছু সমতলে এবং বেশ কিছু লেকের মাঝে ছড়ানো ছিটানো। গর্তগুলো মূলত সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগের এক্সপ্লোশন থেকে। আগ্নেয়গিরি ফলে গলিত লাভা যখন ভেজা মাঠির উপরে যেয়ে পরে তখন যে তাপটা উৎপত্তি হয়, তা থেকে স্টিম Eruption হয় এবং ইরাপশনের ফলে এক পর্যায়ে সেটা বাটি আকৃতির একটা গর্ত ধারণ করে। এরকম অনেক গুলো সারি সারি বাটি আকৃতির গর্ত রয়েছে। গর্তগুলোকে একত্রে Skútustaðagígar বলা হয়।

Zhaheed HoqueZhaheed Hoque

ঘন নীল পানি চারদিকে , আর মাঝে মাঝে বিশাল গর্ত আর এবড়োথেবড়ো কালো ভোলকানিক টুকরো পরে আছে এখানে সেখানে, গাঢ় সবুজ ঘাসের উষ্ণ চাদর মাটিতে , তার মাঝে কিছু কিছু হলুদ ঘাসের আবছা ছোঁয়া। দূরে নীল পানির মধ্যে মাথা ফুঁড়ে উঠে এসেছে কালো পাহাড়। আর অন্য পাশে ছোট্ট Myvatn শহরের কয়েকটা বাড়ি আর একটা পাহাড়াদার পুরোনো চার্চ। চোখ জুড়ানো অপূর্ব এক বিস্ময়। কিন্তু সমস্যা হলো এই জায়গাটাতে বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে থাকা খুব মুশকিল। মাথা আর মুখের চারপাশে অজস্র ছোট ছোট পোকা বিড়বিড় করে।

মাথা আর মুখের চারপাশে অজস্র ছোট ছোট পোকা বিড়বিড় করেমাথা আর মুখের চারপাশে অজস্র ছোট ছোট পোকা বিড়বিড় করে

সব সময় মাথা নড়াছড়া করতে হচ্ছে যাতে পোকা গুলো সব মুখে এসে না বসে। এরই মধ্যে কনে দেখা সূর্যও ডুবু ডুবু । তাই ফিরে আসলাম গাড়ির কাছাকাছি। অনেক ভাবনা চিন্তা করে ঠিক করলাম সাত ঘন্টা উল্টা ড্রাইভ করে হোস্টেলে আজকে আর ফেরত যাবো না। আগামীকাল আবার প্রায় ১৪ - ১৫ ঘন্টার ড্রাইভ। পাশের একটা হোটেলে দেখলাম এখনো ভেকেন্সি আছে। দামে একটু বেশি কিন্তু রাত এখানেই কাটানো ভালো হবে। আগামীকাল গোলাকার এই পথ ধরে Vestrahorn mountain এ যাওয়া হবে এতে করে পুরো আইসল্যান্ড - টা চক্কর দেয়া হবে, পুরো রিং রোডেও ড্রাইভ করা হবে । আইসল্যান্ড ঘিরে চক্রাকারে এই রাস্তাটাকে রিং রোড বলা হয় ( Vestrahorn mountain আর রিং রোড নিয়ে পরের পর্বে লিখবো )

হোটেলে রুমে যেয়ে ব্যাগ রেখে সালফারের গন্ধওয়ালা পানিতে সওয়ার করে আবার বের হয়ে পড়লাম কাছেই অবস্থিত ভোলকানিক রক ফর্মাশন দেখতে। জায়গাটার নাম Dimmuborgir । তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা। রক্তিম আকাশ।

এসব অদ্ভুত আকারের লাভা ফরম্যাশন প্রায় ২৩০০ বছর আগেরএসব অদ্ভুত আকারের লাভা ফরম্যাশন প্রায় ২৩০০ বছর আগের

Dimmuborgir মানে হচ্ছে ডার্ক সিটি। এখানে আসার পর বুঝতে পারলাম এইরকম একটা নাম দেয়ার পিছনে কারণটা কি। আইসল্যান্ডের মিভাট শহরের পূর্বদিকে অদ্ভুত সব আকারের লাভা থেকে উৎপত্তি রক রয়েছে Dimmuborgir নামের এই লাভা ফিল্ডের উপরে। বিভিন্ন আকারের নাটকীয় সব রক ফর্মাশনের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে এই জায়গাটা খুব জনপ্রিয়। এসব অদ্ভুত আকারের লাভা ফরম্যাশন প্রায় ২৩০০ বছর আগের । সে সময়ে ২০ মিটার উঁচু তরল লাভা লেক হঠাৎ করে collapse করে এবং অনেক লাভা সরে যায়। যে লাভা গুলো সরে যেতে পারে নায় , সেগুলো ধীরে ধীরে কেমন যেন ফাটল আর গর্ত হয়ে যায় এবং সেই সময় থেকে এখনো পর্যন্ত তারা ঠিকে আছে। পৌরাণিক কাহিনী মতে পাথরের এই বড়ো বড়ো দালান গুলো অনেক সত্ত্বার কিংবা মানুষের বসবাস ছিল। এবং সত্যিকার অর্থে এই রক ফরমেশন গুলো এমন যে আইসল্যান্ডিকরাও বিশ্বাস করে এখানে নানা রকম দানবের , সুপার ন্যাচারাল আত্মার বসবাস ছিল। এই উদ্ভট এবং অদ্ভুত লাভা পাথর গুলোর আবার নানা রকম নাম দেয়া হয় , যেমন castle , Church । এই লাভা ফিল্ডে ঢুকার আগে বেশ কিছু ওয়ার্নিং ছিল। বড়ো বড়ো লাভা রক গুলো যেকোনো সময় হুটহাট করে ধসে যেতে পারে। Dimmuborgir -এর ল্যান্ডস্ক্যাপ বেশ অনেক কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত লাভা ফিল্ড ওয়ার্ল্ডের মধ্যে অনন্য। অদ্ভুত ভৌতিক সব ভোলকানিক পাথরের মধ্যে ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখা যায়। এবার যাবার পালা কিন্তু দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে গেলেও আকাশ জুড়ে রেখে গেলো বিচিত্র রক্তিম আলো। রঙের তুলির ঝাপটা আকাশের ক্যানভাসে অপূর্ব এক রূপ দিলো। পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন। তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।
জীবনানন্দ মাথায় পেয়ে বসে সব সময়।

Zhaheed HoqueZhaheed Hoque

হোটেলে যেয়ে ক্লান্ত দেহ বিছনায়। রাত বারোটায় ঘুম ভেঙে গেলো। বের হয়ে পড়লাম Northern lights , Aurora দেখার আশায় । যদি কপালে জোটে।

গাড়িকে থামালাম হাইওয়ে-র এক পাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারপাশে কেবল (ধুধু ) অন্ধকার প্রান্তর। হালকা একটু দেখা মিললো aurorar . দিগন্ত রেখায় অন্ধকার আলোর একটু ছোঁয়া। গাড়ি থেকে নেমে শুনতে পাচ্ছি মেষের ডাক। বিকট ঝিঝি পোকার আওয়াজ , দীর্ঘ কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরের আকাশ ছুঁয়েছে দিগন্তে। ভূতের ভয় না। কিন্তু গায়ে কাটা দেয় এই জায়গাটি। বুকের স্পন্দন তা মনে হয় শুনতে পাচ্ছিলাম। পৃথিবীর অতীতের ভাঙাগড়া, মায়ামমতা সব এই জায়গায়। বেশিক্ষন থাকতে পারিনি। ঢুকে পড়লাম গাড়িতে। হোটেলের দিকে ফিরে এলাম ।

ছোট্ট Myvatn শহরের কয়েকটা বাড়ি আর একটা পাহাড়াদার পুরোনো চার্চছোট্ট Myvatn শহরের কয়েকটা বাড়ি আর একটা পাহাড়াদার পুরোনো চার্চ

“একবার যখন দেহ থেকে বা'র হয়ে যাব 
আবার কি ফিরে আসবো না আমি পৃথিবীতে? 
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোন এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।”

- জীবনানন্দ দাশ

গর্তগুলোকে একত্রে Skútustaðagígar বলা হয়গর্তগুলোকে একত্রে Skútustaðagígar বলা হয়

 

পরবর্তী (ষষ্ঠ এবং শেষ) পর্বে থাকছে Namafjall geothermal area তে ফুটন্ত কাদার ডোবা, viking settlements শহর Stokksnes এ Vestrahorn mountain , আইসল্যান্ডিক মেষ এবং রিং রোডের গল্প আর ইচ্ছুক ভ্রমনকারীদের জন্য যাবতীয় সব টিপস