ঠিকানাবিহীন মানুষের কাছে চিঠি পাঠাবে কোথায়৷ যাযাবরের ঠিকানা দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে ঘুরে বেড়ায়৷ লোকালয়ের মানুষ থেকে খানিকটা দূরে যেতেই দ্বীপান্তরি হওয়া। এবার দ্বীপান্তরি হতে জাহান ভাইয়ের দলের সাথে উপকূলের এক অজানা চরে যাবার লোভখানা সামাল দিতে পারলাম না। যাযাবর হয় সংগীহীন৷ ৩৪ জনের একটা গ্রুপ শুধুমাত্র সৈকত আর মামুন ভাই ছাড়া কেউকে চিনি না। এরপর পথিক চলে অজানার পথে৷ ৩নং বিপদ সংকেত উত্তাল নদী এর মাঝেই আমাদের যাত্রার হল শুরু। তাসরিফ ৪ এ করে আমাদের প্রথম গন্তব্য চর ফ্যাশন বেতুয়া ঘাট৷ আস্তে আস্তে বুড়িগংগা, ধলেশ্বর আর ছোটখাট নদী পার হয়ে চলে এলাম চাঁদপুরের কাছাকাছি।

মেঘনায় ঢোকার পর হাল্কা রোলিং টের পেলাম৷ বেশ মায়ের মমতা মিশানো দুলুনিতে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিল। ঘুম ভাংগলো ভয়াবহ রোলিং আর তাসরিফের বডির কাপাকাপিতে। উপকূলে এই রকম পকেট মাস্টার ডায়নামাইট চালানোর সাহস দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। ঝাকাঝাকিতে ব্রেইন সাময়িক দ্বিধান্বিত হলেও বাহিরে ঝুলতে থাকা চাঁদ দেখে পুলকিত অনুভব করলাম৷ সময় এখন মধ্যরাত৷ আর আমাদেত তাসরিফ ৪ সম্ভবত মেঘনার শাখা নদী মাছকাটাতে প্রবেশ করেছে। এম.ভি পারিজাত করে বরিশাল থেকে দিনের বেলায় মজু চৌধুরীর হাট গিয়েছিলাম বিধায় এই নদী গুলোর বিশালতা অনুভব করতে পারি।

মাঝ রাতে যেন একটা গল্প শুনিয়েছিলেন তাসরিফ ৪। ডেকের বাউন্ডারি ওয়ালে ফারহান ৫ এর গুতা খাওয়ার তাজা ক্ষত এখনও বহন করে চলছে। এই রুটে ঘাট পলিটিক্স যে কত খারাপ না আসলে বুঝা যায় না। জলের রাশি কেটে কেটে উত্তাল ঢেউ এর মাঝে চলছে আমাদের লঞ্চ। এর মধ্যে দেখলাম সৈকত ভাই বেশ ভাল ঘুম দিয়েছেন আর মামুন ভাই এর ঘুমাইলে হিসাব থাকে না। পকেট থেকে সিগারেটের শলকা বের করে ওষ্টে স্পর্শ করলাম। অনুভব করলাম গরম ছ্যাকা। নদী পথ সব সময় আমায় নস্টালজিক করে তুলে। প্রিয়ার হাত ধরে প্রথম চাঁদপুর যাবার স্মৃতি গুলো মনে পড়ে গেল।

বাহিরে মাতালী হাওয়ায় রজনীর এই শেষ প্রহরে নিদ্রাতুর চোখে গাড় অন্ধকারের মাঝে মায়াবী ওই চাঁদের আলোয় দেখছি ঢেউ এর আলো ছায়ার খেলা। সিগারেটের অর্থহীন ধোঁয়ার মাঝে চারপাশের জগৎটাকে বড্ড আপার্থিব মনে হচ্ছে। মুরব্বীরা বলে নদীতে বাওয়া বাতাস চলে। বিচরণ করে খারাপ জ্বীন। তাই কি চাঁদটা রক্তিম লাগছে না কি আমার চোখের মায়া৷ আস্তে আস্তে তাসরিফ মাছকাটা থেকে ইলিশা নদীতে প্রবেশ করলো। ততক্ষনে ভোরের সূর্য এক নতুন দিনের আহবান নিয়ে যেন হাজির হল। পূর্বকাশে রক্তিম আভা নদীর পানিতে আলো আধারীর এক অদ্ভূত আলোড়ন সৃষ্টি করলো। ঢেউ তরংগের খেলায় প্রকৃতি আপন রুপে সাজছে। ভোরের সোনা রোদ্দুর, গোধূলির সেই রক্তিম আভা এক পবিত্র শুদ্ধতায় মনটা উদ্বেলিত করলো।

ভোর ছয়টার দিকে মামুন ভাইয়ের ঘুম ভাংগলো তিনি ক্যামেরা নিয়ে উপরে চলে গেলেন। ইতি মধ্যে লঞ্চের ভিতরে পরিচিত হলাম আরিফ ভাইয়ের গ্রুপের সাথে। আরিফ ভাই কে এই সফরে আমি ফান্টা হুজুর উপাধি দিয়েছিলাম। ফান্টা হুজুর কোংদের নিয়ে লঞ্চের ছাদে চলে গেলাম। শরৎ এর ভোরে আকাশে এক টুকরা শুভ্র মেঘের দল খেলা করছে অবিরাম। যত আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে ততই যেন প্রকৃতি আমাকে অবাক করছে। মেঘনার দুপাড়েই যেন জীবন জেগে উঠেছে। ছোট ছোট ডিংগি নৌকা করে জলপুত্রদের দল নেমেছে অকুল দরিয়ায়।

চারপাশে সবুজ গাছগাছালি পাখপাখালিতে ভরপুর পরিবেশ মনে দোলা দেয়। এরই মাঝে লঞ্চ ঘাট ধরলো মংগল সিকদার ঘাটে। এখানে মেঘনা যেন আমায় অন্য গল্প শুনালো। যে কেউ প্রথম দেখায় ভাবতে পারে নদী যেন নয় এক বালুচরের মাঝে লঞ্চ থেমে আছে। মামুন ভাই ক্লিক করছে একের পর এক অনবদ্য ছবি। সবার কাছে আগেই ক্ষমা প্রার্থী গল্পের খাতিরে এই সফরে আমার সাথে কানেক্টেট যারা ছিল তাদের নামই আসবে বাকিদের কথা না হয় আমার অন্তরে থাকবে। সাতঘাটের পানি খাওয়া শেষে তাসরিফ ৪ এসে গেল তার আপন নীড় বেতুয়া ঘাট। হ্যালো চর ফ্যাশন।

(চলবে....)