To travel is to discover that everyone is wrong about other countries.
- Aldous Huxley

অ্যালার্ম বেজে যাচ্ছে কিন্তু ঘুম কোনো ভাবে ভাঙেনা। অ্যালার্ম কখন যে বন্ধ হয়ে গেলো টের পেলাম না। ইচ্ছে হচ্ছিলো আরো শুয়ে থাকি , হাতে পায়ে অবস অনুভূতি। নিজেকে তুলতে পারছিলাম না। অনেক্ষন দেহটাতে বিছানার সাথে আটকিয়ে রাখলাম। ঘুম ভাঙতেই পিনাট বাটার স্যান্ডউইচ খেয়ে দৌঁড়। 

আজকের সারাদিনের প্ল্যান গোল্ডেন সার্কেল (Golden Circle)। দক্ষিণ আইসল্যান্ডে এই গোল্ডেন সার্কেল ট্যুরিস্টের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এইটা মূলত তিনশো কিলোমিটারের একটা লুপ রাজধানী রেকাভিক থেকে দক্ষিণ আইসল্যান্ডে যেয়ে আবার রেকাভিক - এ ফিরে আসা। এবং এই লুপের মধ্যে রয়েছে অভাবনীয় সব সুন্দর ভ্রমণ বিষয়ক আকর্ষণ এবং দর্শনীয় স্থান। অন্যতম স্পটের মধ্যে রয়েছে টিংকভেটলির (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Þingvellir National Park), স্ট্রোককুর গিজার এবং গুলফস (আইসল্যান্ডিক ভাষায় লেখে Gullfoss)।

Þingvellir National ParkÞingvellir National Park

হোস্টেল থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের ড্রাইভে এসে পৌঁছলাম টিংকভেটলির পার্কে । আসার পথে চারপাশে অপূর্ব প্যানারমিক ভিউ। বেশ অনেকগুলো ঘোড়া কিছুক্ষণ পর পরে দেখা যাচ্ছিলো। দূরের অলস আবছা ধোঁয়া কালো পাহাড়ের সাথে মিশেছে। এই রকম দৃশ্য সাথে করে গাড়ি এসে পৌছালো টিংকভেটলির পার্কে। ভিসিটর সেন্টারে বেশ অনেক লোকজন। গাড়ি পার্ক করে ইনফরমেশন সেন্টারের কর্মচারীদের সাথে আলাপ করে বুঝে নিলাম এখানে কি কি করার যায়। এবং হাতে একটা ম্যাপ ধরিয়ে দিলো দেখালো আইসল্যান্ডের ফার্স্ট ওল্ড পার্লামেন্ট। ওখান থেকে অল্প একটু হাঁটা পথে আরেকটা জলপ্রপাত অক্সারাফস (Oxarafoss) এবং হেঁটে হেঁটে পুরো লুপ শেষ করতে প্রায় দেড় ঘন্টা মতো লাগবে।

পার্কের মধ্যে কোনো প্রবেশ মূল্য দিতে হয়নি কিন্তু গাড়ি পার্কিং জন্য টাকা দিতে হলো। হাঁটা শুরু করলাম পার্কের মধ্যে। দুইপাশে ভলকানিক পাহাড় এবং রাস্তা একেবারে কুচকুচে কালো। প্রচুর দর্শনার্থীরদের ভীড় এই জায়গাটা দেখতে। আইসল্যান্ডের অতীত ইতিহাস-বিজড়িত স্থানটিকে বর্তমানে একটি জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এখানে আইসল্যান্ডের ফার্স্ট পার্লামেন্ট ছিল। কোনো জরুরি ইভেন্টে এখানে লোকজনের এখনো সমাবেশ হয়।

Tectonic plate - চারপাশে ভাঙা আর বড়ো বড়ো ফাটল এবং এর এই ফাটলগুলো মাঝ দিয়ে লেকের পানি। ফাটলগুলো মূলত ইউরেশীয় আর নর্থ আমেরিকান টেকটনিক প্লেট Tectonic plate - চারপাশে ভাঙা আর বড়ো বড়ো ফাটল এবং এর এই ফাটলগুলো মাঝ দিয়ে লেকের পানি। ফাটলগুলো মূলত ইউরেশীয় আর নর্থ আমেরিকান টেকটনিক প্লেট

মজার ব্যাপার হচ্ছে হাঁটার সময় একপাশে নর্থ আমেরিকা আর অন্যপাশে ইউরোপ। এবং অনেক বড়ো ল্যান্ডস্ক্যাপ।চারপাশে ভাঙা আর বড় বড় ফাটল এবং এর এই ফাটলগুলো মাঝ দিয়ে লেকের পানি। ফাটলগুলো মূলত ইউরেশীয় আর নর্থ আমেরিকান টেকটনিক প্লেট। এখানে দুইজায়গার টেকটনিক প্লেট একসাথে হলো। প্লেট গুলো বছরে এক ইঞ্চি করে সরে যায়, ফলে আইসল্যান্ড আসলে একটু একটু করে বাড়ছে এবং লেক Thingvellir আইসল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো প্রাকৃতিক লেক। জিওগ্রাফিক্যাল এবং হিস্টোরিক্যাল তাৎপর্যর জন্য Þingvellir National Park সত্যিকার অর্থেই আইসল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটা সম্পদ।

ঝুম ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎ আবার। সাথে প্রচন্ড বাতাস। তাড়াহুড়া করে রেইন কোট গায়ে দিয়ে গাড়ির দিকে ছুটলাম। আঁকা বাঁকা সরু বৃষ্টি ভেজা কাদামাটা পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছলাম গাড়ির পার্কিং লট।

Geysir Geothermal FieldGeysir Geothermal Field

পরের গন্তব্য একই রাস্তা ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম আইসল্যান্ডে দিকে অবস্থিত Geysir Geothermal Field (ইংরেজিতে বলে Geyser) দেখতে যাওয়া। রাস্তার দুই পাশে ফ্যাকাশে হলুদ আর সবুজ ঘাসে বিস্তৃত, মুক্ত খোলা লাভা মাঠ দিগন্তে ছুঁয়েছে মাঠি থেকে ফুঁড়ে উঠা কিছু কিছু কুয়াশাছন্ন পাহাড়ের সাথে। মাঝে মাঝে লাল ছাউনি দেয়া সাদা রঙের কিছু খামার বাড়ি। ঘোড়া ঘাস খেয়ে যাচ্ছে আনমনে। ঝির ঝির বাতাস দোলা দিয়ে যায় শস্যক্ষেতে।

শস্যক্ষেতেশস্যক্ষেতে

অবশেষে গাড়ি এসে পৌঁছালো গোল্ডেন সার্কলের অন্যতম আকর্ষণ Geysir Geothermal Field । লোকেশনটা খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হয়নি , কেননা গোল্ডেন সার্কলের মধ্যে অবস্থিত আইসল্যান্ডের বেশ ট্যুরিস্টি জায়গা এটি। এই জিওথার্মাল ফিল্ডটি থ্রী স্কয়ার কিলোমিটারের মতো। পুরো মাঠ জুড়ে অনেক ছোট ছোট Geyser। Geyser এর নিচের পানির তাপমাত্র প্রায় ১২৫ ডিগ্রী সেলসিলাস। প্রত্যেকটা থেকে সালফারের কটু গন্ধ ওয়ালা বাষ্প বেরুচ্ছে। এবং এই Geyser গুলো অনেক দীর্ঘ দিন উত্সারিত হচ্ছে না। কিন্তু একটা Geyser আছে , যেটাকে স্ট্রোক্কুর বলা হয় (Strokkur) এবং সে স্ট্রোক্কুর প্রত্যেক পাঁচ থেকে সাত মিনিট পর পর উৎসারিত হয়। প্রচুর দর্শনার্থী চারপাশে। গরম কাপড় চোপড় পরে গোল করে ক্যামেরা হাতে বসে অপেক্ষায় বসে আছে স্ট্রোক্কুর-এর Erupt দেখতে।

গরম কাপড় চোপড় পরে গোল করে ক্যামেরা হাতে বসে অপেক্ষায় বসে আছে স্ট্রোক্কুর-এর Erupt দেখতেগরম কাপড় চোপড় পরে গোল করে ক্যামেরা হাতে বসে অপেক্ষায় বসে আছে স্ট্রোক্কুর-এর Erupt দেখতে

এই Eruption খুব অল্পসময়ের জন্য হয়, সুতরাং যাতে মিস না হয় সবাই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এমনিতে স্ট্রোক্কুর-এর চারপাশ থেকে বাষ্প বেরুচ্ছে কিন্তু Eruption এর ঠিক আগে মুহূর্তে মনে হচ্ছিলো অনেক ঘনীভূত স্টিম একসাথে বের হচ্ছে এবং হঠাৎ করে সজোরে ঝর্ণার মতো নিচ থেকে পানি উপরে উপচে পরে। চোখজুড়ানো অভূতপূর্ব এই দৃশ্য। কখনও কখনও 40 মিটার উচ্চতায়, তবে সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিটারের কম। একবার উৎসরণ দেখা মিস হলে , ৫ থেকে ৬ মিনিট অপেক্ষায় থাকতে হয় পরবর্তী উৎসরণ দেখার জন্য।

Strokkur - এবং হঠাৎ করে সজোরে ঝর্ণার মতো নিচ থেকে পানি উপরে উপচে পরে।Strokkur - এবং হঠাৎ করে সজোরে ঝর্ণার মতো নিচ থেকে পানি উপরে উপচে পরে।

জানা যায় , ১৭৮৯ সাথে দিকে ভূমিকম্পের ফলে বেশ কিছু সময়ের জন্য এটি বন্ধ হয়ে যায়। স্ট্রোককুরের বয়েস যখন এক , তখন এটি অনেক শক্তিশালী ছিল এবং জল গ্যাস , ও বাষ্প অনেক ফোর্স দিয়ে বের করতো। ধীরে ধীরে এর শক্তি কমতে থাকতে। ১৮৩০ সালের দিক থেকে এটি যথেষ্ট পরিমাণে শান্ত হয়ে গিয়েছিল। বহু বছর ধরে স্ট্রোককুরের এই উৎসরণ এইভাবে চলছে। এখানে সব জায়গায় সতর্ক করে লিখা আছে কোনো ভাবে যাতে পানি স্পর্শ না করা হয়। পানির তাপমাত্রা ৮০-১০০ ডিগ্ৰী সেন্টিগ্রেট।

Geyser এর নিচের পানির তাপমাত্র প্রায় ১২৫ ডিগ্রী সেলসিলাস।Geyser এর নিচের পানির তাপমাত্র প্রায় ১২৫ ডিগ্রী সেলসিলাস।

এই জায়গাটাতে একটু হেঁটে হাইক করে অল্প উঁচু একটা পাহাড়ে উঠা যায়। উপর থেকে চারপাশটা সবুজ, দূরে পাহাড়ে ঘেরা, আর একপাশে Geysers থেকে উঠে আসা বাস্প। সব মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর চোখ জুড়ানো একটি জায়গা। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। তড়িগড়ি করে নামার পালা এখন। গাড়িতে যেয়ে অনেক কৌশলে রেইন কোট আর প্যান্ট তা সেরে নিলাম। একেতো ঠান্ডার জন্য জ্যাকেট, কানটুপি তার উপর রেইনকোট , দম বন্ধ হবার অবস্থা। গরম গরম চায়ে চুমুক দিয়ে রওনা দিলাম জলপ্রপাত গুলফস (আইসল্যান্ডিকে Gullfoss, ইংলিশে Golden falls ) এর দিকে।

আইসল্যান্ডের দ্বিতীয় বড়ো গ্লাসিয়ার্স Langjökull থেকে উৎপত্তি ওয়াটারফল Gullfossআইসল্যান্ডের দ্বিতীয় বড়ো গ্লাসিয়ার্স Langjökull থেকে উৎপত্তি ওয়াটারফল Gullfoss

সাউথ-ইস্ট আইসল্যান্ডের Hvita river থেকে এই ফলের উৎপত্তি এবং এই নদীর পানি আসে আইসল্যান্ডের দ্বিতীয় বড়ো গ্লাসিয়ার্স Langjökull থেকে। তিনটি স্তরে এই অপূর্ব জলধারা। নানা জায়গায় অনেক দর্শনার্থীর ভীড় ওয়াটারফল দেখার। মাথায় buzz ধরার মতো জলপ্রপাতের আওয়াজ একটানা।

জানা যায় বিশ শতকের প্রথমার্ধে গুলফস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাবার্তা হচ্ছিলো। এই সময়ের মধ্যে, জলপ্রপাতের মালিক Tómas Tómasson আর Halldór Halldórsson বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভাড়া দিয়েছিলো। যাইহোক, আর্থিক সংকটের কারণে বিনিয়োগকারীদের প্রচেষ্টা ব্যর্থতার কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে জলপ্রপাত আইসল্যান্ড রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করা হয়, এবং এখন সুরক্ষিত।

স্মৃতিতে রেখে দেয়ার জন্য জলপ্রপাতের আসে পাশে কিছু ছবি তুলে হলো।

দিগন্ত জুড়ে রংধনুদিগন্ত জুড়ে রংধনু

এবার যাবার পালা। যাবার পথে অপূর্ব সুন্দর কনে দেখা রৌদ এবং দিগন্ত জুড়ে রংধনু। এই রকম অবস্থায় ড্রাইভ করা খুব মুশকিলের ব্যাপার, গাড়ি থামিয়ে কিছু ক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকা, বা নেমে ছবি তোলা।

অবশেষে হোস্টেলে ফেরার পালা।

Two roads diverged in a wood and I – I took the one less traveled by.
- Robert Frost

পরবর্তী (চতুর্থ) পর্বে থাকছে গ্লেসিয়ার্স ল্যাগুনে আইসবার্গ আর ভলকানিক সমুদ্র সৈকত ডায়মন্ড-বীচের গল্প