মধ্যরাতে ওয়াশিংটনডিসির ইউনিয়ন বাস ষ্টেশনে নেমেই অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা হলো, এমনিতেই গ্রে হাউন্ডটার বসার আসন সুবিধার ছিলো না, ৫ ঘন্টার যাত্রা, কিন্তু আসন হেলানো যায় না! কাহাতক আর এভাবে ৯০ ডিগ্রী করে বসে থাকা যায়। তার উপর নামার পর দেখি ওয়েটিং রুমের সারি সারি চেয়ারে মূলত কৃষ্ণাঙ্গরা অপেক্ষা করছে, কয়েকজন ঘুমাচ্ছে কয়েকটা চেয়ার জুড়ে, এই সময় পুলিশ এসে কড়া গলায় বললো যাদের কাছে ট্রেনের টিকেট আছে শুধুমাত্র তারাই এখানে থাকতে পারবে, অন্যদের বেরিয়ে যেতে হবে। বুঝলাম আর দশটা বড় শহরের মতোই গৃহহীনেরা চেষ্টা করে রাতটা কোন মতে এখানের ছাদের নিচে পার করতে। আমাদেরও টিকেটের কথা জিজ্ঞাসা করতেই জানালাম যে কেবল নিউইয়র্ক থেকে এসেছি, বন্ধু গাড়ী নিয়ে পথে, আসলেই চলে যাবো। পুলিশ আবার বলে, "দেখো, বেশি দেরী কইরো না।"

ক্যাপসুলক্যাপসুল

অল্প পরেই রেজোয়ান এসে হাজির, ষ্টেশন থেকে বাহির হতেই ইউ এস ক্যাপিটাল ( হাউজ অফ কংগ্রেস) ভবন ঝকঝক করছে চাঁদের আলোয়। গাড়ী নিয়ে সামান্য এগোতেই সুবিখ্যাত সুপরিচিত সুউচ্চ ন্যাশনাল মনুমেন্ট সেই অবেলিস্ককে চোখে পড়ল, ওয়াশিংটনডিসির ছবি মানেই এই স্থাপত্য দেখা যায়, সিনেমাতে তো বটেই, এলিয়েনরা এসেই গুলতি মেরে এটা ভেঙে ফেলে! এরপর জেফারসন মেমোরিয়াল দেখা গেলো পটোম্যাক নদীর তীরে, খানিক পরেই স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরগুলোর সারি! সরাসরি বাড়ী না যেয়ে খানিকক্ষণ ঘুরে ডিসিতে মোটামুটি চিনিয়ে দিলেন রেজোয়ান ভাই, এই শহরেই বেড়ে উঠেছে সে, বাংলাদেশ থেকে কৈশোরেই চলে এসেছিল পরিবারের সাথে, গত ১০ বছর ধরেই আছেন এই শহরে। তার গাড়ীতেও করেই চলবে আমাদের আমেরিকান ড্রিম ট্রিপ।

Onu TareqOnu Tareq

পরদিন সকালে উঠেই সবার আগে যাওয়া হলো Air & Space Museumএ। ডিসিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গাড়ী পার্কিং এর, পিলপিল করে এখানের অফিসগুলোতে মানুষ আসে মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া থেকে, আর এত গাড়ী আসায় দিনের বেলা পার্কিং নিয়ে চলে অদেখা প্রতিযোগিতা। সেই ঝামেলা শেষ করে জাদুঘরে ঢুকতেই দেখিলাম মাথার উপরে সারিসারি বিমান, এক কোণে 'দ্য স্পিরিট অফ সেন্ট লুই', যে পলকাদর্শন বিমানে করে চার্লস লিন্ডবার্গ প্রথম মানুষ হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। পাশেই দারুণ সেই মার্কারি-৬ মহাকাশযানের ক্যাপসুল যেটাতে করে জন গ্লেন প্রথম আমেরিকান হিসেবে পৃথিবীকে পুরোটা প্রদিক্ষণ করে ইতিহাস গড়েন। আর তারপাশেই পাশেই সেই মূল কারণ যার জন্য আমরা এসেছি এখানে, সেই চন্দ্রশীলা বা চাঁদের পাথর ( মাটি নয়)! চাঁদ থেকে আনা পাথর আছে অনেক খানেই কিন্তু শুনেছিলাম এই একমাত্র জায়গা যেখানে চাঁদের পাথর ছোঁয়া যায় ( ফেসবুকে সেই ছবি দেবার পর অবশ্য জানতে পারলাম টেক্সাসের হিউস্টনে এবং ফ্লোরিডার নাসা সেন্টারেও চাঁদের শীলা ছুঁয়ে দেখা যায়)। সে যে কী অপূর্ব থরথর অজানা অনুভূতি, সুদূরের চিরচেনা চাঁদের এক অংশ মিলে গেছে আমার দেহের এক অংশের সাথে, কত নির্ঘুম রাত কেটেছে এই চাঁদের সঙ নিয়েই, সেই চাঁদের অংশ আজ আমার সাথী ক্ষণিকের তরে হলেও!

আমাকে যদি বলা হয়, কোথায় যেতে চাই জীবনে, আমি চাইবো যেখানে সারা জীবন কাটালাম সেই পৃথিবীটাকে একবার দেখতে, নীল একটা বলের মতো যে ঝুলে আছে মহাশুন্যে, যেখানে আমাদের উদ্ভব-জন্ম-মৃত্যু, তাকে একবার দূর থেকে দেখতে বড় সাধ হয়।

Onu TareqOnu Tareq

এই জাদুঘরের কোণে কোণে জানা গুপ্তধন, একটা ঘরে ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত দুই ভাই, সেই সাইকেলমেকার থেকে বিমানের আবিষ্কারক হয়ে ওঠা উইলবার ও অরভিল রাইটের স্মরণে, সযত্নে রাখা আছে বিশ্বের প্রথম বিমান 'কিটি হক'। কী যে রোমাঞ্চ চারিদিকে!

কিংবদন্তীতে পরিণত হওয়া মহিলা-বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট নিয়ে আলাদা অংশ আছে, আছে তাঁর চালানো বিমানও। অ্যাপোলোর বিশালকায় স্যাটার্ন ৫ ইঞ্জিন, যার জন্য আমাদের চন্দ্রাভিযান সম্ভব হয়েছিলো, তাও চাক্ষুষ করা গেল। দেখা মিললো চাঁদের নানা ধরনের শিলার, এমনকি ধূলোরও! কিন্তু সেগুলো ছোঁয়ার অনুমতি নেই! আর মিলনরত অবস্থায় অ্যাপোলো-সয়ূজ!

Onu TareqOnu Tareq

এখানে আছে অজস্র কক্ষ, চলছে ব্ল্যাক হোল নিয়ে নানা তথ্যচিত্র, আছে একটা মহাকাশযানের ভিতরে দেখার ব্যবস্থা, আরো নিযুত জিনিস। কিন্তু এখন সময় নেই আর, এই শহরে এসেছিই ২ জিনিস দেখার জন্য চাঁদের পাথর আর কিংবদন্তীর অভিশপ্ত নীল হীরা, হোপ ডায়মন্ড' দেখার জন্য।

কাজে কাজেই হাতে সময় কম, তাই চাঁদের পাথর আরেকবার ছুঁয়ে তাকে ভালো থাকতে বলে চললাম পরের গন্তব্যে-