জনাব ট্রাম্প এই কুইন্স এলাকাতেই বেড়ে উঠতে উঠতে বখে গিয়েছিলেন। জানা গেল এই অঞ্চলের বিশাল অংশের জমির মালিক তার পরিবার, মানে বাপ-দাদার আমল থেকে। পথে বেশ ক'জায়গাতেই নানা ভবনের গায়ে 'ট্রাম্প' লেখা দেখে কৌতুহল থেকে জানলাম সবই তার বাপের তালুক, কোনটা অফিস, কোনটা হাসপাতাল, এমনকি নদীর ধারে এক বিশাল গলফ কোর্সও নজরে আসলো। ক'মাস আগে মিডিয়ায় এসেছিল ট্রাম্পের মালিকানাধীন এক গলফ সেন্টারে Time পত্রিকার ফটোশপ করা নকল কভার বাঁধিয়ে ঝুলিয়ে রাখা আছে যেখানে তাকে হাস্যোজ্জল দেখা যায়, অথচ ঐ সংখ্যার পত্রিকার কভারে আসলেই ট্রাম্প ছিলো না!

গল্ফ সেন্টারটির পাশ দিয়েই যাচ্ছি যেহেতু তাই ভাবলাম একবার ঢুঁ মেরে দেখা যাক সেই বিটকেল।নকল জিনিসটা ঝুলতেছে কিনা এখনো! কিন্ত সন্ধ্যা নামার তাড়া আর জীবনে হুজ্জত কম বাড়াতে চাওয়ার চিন্তা থেকেই আর থামা হলো না! 

আচ্ছা কাল জানি গল্প-নদী কতদূর গড়িয়ে ছিল?

অহ, অপু আসা পর্যন্ত! আবার সে এসেছে ফিরিয়া! এখন এই দুই মাস প্রতিদিন তার লাল প্যান্ট আর হাসি সহ্য করিতে হইবেক! (যদিও ভ্রমণসাথী এবং সুখাদ্যের পাচক হিসেবে সে দারুণ)। কাজেই দলের সবাই এখন আমেরিকায়, কেবল প্রাণভোমরা কনক আদিত্য দাদা আসলেই Hasta la vista বলে পথে নেমে পড়ার অপেক্ষা।

বিকেলে যাত্রা শুরু হলো নিউইয়র্ক আর নিউজার্সির সীমান্তে অবস্থিত 'পমোনা'র উদ্দেশ্যে। কতদূর পমোনা জানতে চাইলেই আগের দিন স্বভাব ছড়াকার মৃদুল দা ছড়া কেটে শুনিয়েছিলেন,

'কমও না
বেশীও না
এই হলো পমোনা'

যাত্রাপথে শকটচালক নতুন বন্ধু অরিত্র সিদ্ধান্ত নিলো যে আমরা শহরের ভিতরে মেইন রোড এড়িয়ে ছিমছাম ছবির পর সবুজের ঘেরা রূপকথার বাড়ী দিয়ে সাজানো মহল্লা দিয়ে যাবো। ভাগ্যিস সে তাই চেয়েছিলো! কী যে চমৎকার বাড়ী গুলো, সুষম স্থাপত্য সারি সারি, সেই সাথে বিশাল সব গাছ সব বাড়ীতেই, লনের মিলিটারী ছাট সবুজ ঘাস খুব একটা আরাম-আরাম এনে দিলো চোখে আর মনে। সেই সাথে এটাও জানা গেল যে এগুলো বেশ দামী বাড়ী, পশ এলাকা আর কী! কিন্তু আমাদের অঞ্চলের মতো শুধু টাকার মালিক না এখানের বাসিন্দারা, সুরুচিরও মালিক।

প্রধান সড়কে ওঠার পর থেকেই রাস্তার দু'ধারে কেবল সবুজ আর সবুজ। লুসি আন্টি জানালেন যে এই প্রাণদায়ী সবুজ থাকে মাত্র ৪ মাস, শরতেই সবুজ পাতা রঙিলা লাল/হলদে/কমলায় জীবনের গল্প লেখা শেষ করে ঝরে পড়ে ভূমির উর্বরতা বাড়ায়, কিন্তু পাতাহীন সারি সারি গাছের কঙ্কাল, সে মিহি তুষারের প্রলেপ লাগানো হলেও বেশিক্ষণ সহ্য করা মুশকিল অধিকাংশ মানুষের জন্য।

মাঝে রাজহাঁস ঘোরাঘুরি করতে দেখতে টলটলে এক হ্রদে থামা হলো বুকের হাপরে সুবাতাস ভরার জন্য, অরিত্রের কাছ থেকে জানা গেল এই হ্রদের চারপাশে কাঠের তৈরি হাঁটার রাস্তা আছে, যা ঠিক এক মাইল! মানে হ্রদের চারপাশে একবার ঘুরে আসলেই আপনার এক মাইল হাটা হয়ে গেল ! ( আমরা যে এখন মাইলের দেশে, কিলোমিটারের নয়, ওজন হয় পাউন্ডে, কিলোগ্রামে না আর তাপমাত্রা ফারেনহাইটে, সেলসিয়াসে না - সেটা এখনো রপ্ত হয় নি। তাই মনে রাখার প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছি যে ১ মাইলে ১.৬১ কিলোমিটার ! )

Onu TareqOnu Tareq

হ্রদের পাশে এক নোটিশে দেখলাম যে এই এলাকা বন্যপ্রাণীদের বাসযোগ্য রাখার জন্য যত বেশী সম্ভব এই দেশী গাছ লাগাবার চেষ্টা চলছে অনেক বছর ধরে, তাও নানা জাতের গাছ- ফুল, ঘাস, গুল্ম, বিরুত, বনস্পতি। এবং সেখানে মানুষের হস্তক্ষেপ নেই গাছ লাগাবার পর! এমন ছোট ছোট মরূদ্যান হওয়া উচিত আমাদের ইট-কাঠ-কংক্রিটের ম্রুভুমি মহানগরীগুলোতে।

সন্ধ্যের কমলা তুলির আঁচড় তখন আসি আসি করছে পশ্চিম আকাশে, সোনার সিংহ তখনো কেশর দুলিয়ে গর্জন করে ওঠে নি, তখন হাডসন নদী পেরোলাম আমরা, সুদৃশ্য সেতু দিয়ে। শান্ত, বিস্তৃত জলরাশি, মালবাহী জলযান আছে কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নদী সংগ্রহ করে যাচ্ছি সারা জীবন ধরেই, সেই শৈশবের পদ্মা দিয়ে শুরু, আজ হাডসনের দেখা পেলাম, যদিও নৌকা করে না ঘুরলে, সাঁতার না কাটলেও আলতো জল স্পর্শ না করলে কী নদী-ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয়?

দিনের আলো থাকতে থাকতেই হাজির হবার গন্তব্যে, আমাদের প্রিয় নীলু আপু এবং আশরাফ ভাইয়ের বাড়িতে, যার জন্যই এখানে আসা, এবং আগামি কদিন এখানে থেকেই তাদের সাথে বিভিন্ন জায়গায়। চমৎকার বাড়ীটি এক বনের কিনারে, অদূরেই চলে গেছে গর্জনশীল হাইওয়ে, কিন্তু বাড়ির আঙিনায় বেড়াতে আসে হরিণের পাল। ধূসর কাঠবিড়ালি আর পাখির ঝাঁকেরা তো আছেই বাসিন্দা হিসেবে, সেই সাথে আছে নীলু আপুর ফুলেল বাগান, আর আশরাফ ভাইয়ের সব্জি কর্নার।

Onu TareqOnu Tareq

৩৮ বছর ধরে এই দম্পতি আছেন মার্কিন দেশে, সচলায়তনে লেখালেখির সুবাদে নীলু আপু আমাদের সবার কাছে মাতৃসমা, সেই সাথে রুচি-অরুচি মিলে যাওয়ায় তিনি আসলেই আমাদের বন্ধু হয়ে গেছে বয়সের সীমানা অতিক্রম করে অনেক আগেই। তাদের নিয়ে অনেক গল্প আসবে আগামী দিনগুলোতে, শুধু একটা গর্ব করার মত বিষয় জানিয়ে রাখি চুপি চুপি- ওনাদের বড় কন্যা তন্বী নন্দিনীর প্রথম বই Bright lines প্রকাশ করেছে বিশ্বখ্যাত পেঙ্গুইন প্রকাশনা গত বছর। কোন পরিচিত বাংলাদেশীর বই পেঙ্গুইন এর আগে প্রকাশ করেছে বলে জানা ছিলো না।

রাতে এক ব্যাটেলিয়ন খাওয়াবার মতো রান্না করেছেন আপু আর ভাইয়া কষ্ট করে! বিশেষ করে এই আমেরিকায় এসে গরম গরম ভাতের সাথে এত সুস্বাদু গরুর ভুড়ি খাওয়ার ( টাটকা করলা ভাজি, মাছের ঝোল, দুর্দান্ত মুড়িঘণ্ট, বেগুনভাজা বাদই দিলাম) পর জেট ল্যাগ উপেক্ষা করে এতরাতে লিখে যাওয়া বেশ কঠিনই।

বাকি গল্প কাল হবে, প্রস্তত থাকুন আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক শহরে যাবার জন্য। দেখা হবে-