সারা মার্কিনমুলুকে সবচেয়ে বেশী জাতের মানুষ থাকে নিউইয়র্ক স্টেটে, আবার সেখানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাতির মানুষ রঙচঙে খিচুড়ি হয়ে থাকে 'কুইন্স'এ। সেখানের পাব্লিক বাসে উঠলেই মনে হয়, ' এ তো ভ্রাম্যমাণ মানব চিড়িয়াখানা!', তামাম মহাদেশের মানুষ হাজির এই একরত্তি বাহনে, যদিও অধিকাংশ জনেরই ভাব বিনিময়ের ভাষা একটাই 'ইংরেজি'।

তো কাল মধ্যরাতে গ্যান্ট্রি পার্কে গাড়ী হাকিয়ে হাজির হয়ে গেলেন পুরনো সুহৃদ, দুর্দান্ত ছড়াকার, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অনেক বছরের কর্মী, 'রাঙা সকাল' ও ভুতুড়ে 'মধ্য রাতের ট্রেন' অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মৃদুল আহমেদ ভাই। তার দুরন্ত উপস্থিতি যে কোন জায়গাকেই পলকের মধ্যে জীবন্ত করে তোলে, সেই সাথে আছে একের পর এক গান, ছড়া, প্রাণখোলা হাসির তরঙ্গ। সেই রাতেই টেনে নিয়ে গেলেন জ্যাকসন হাইটে, চা- সমুচা খাবার কথা থাকলেও খোলা বাতাসে ঘোরাঘুরি করে খিদে বেশ চাগিয়ে ওঠায় শেষে নান-মুরগীর বংশ নাশ করায় ব্রতী হলাম এক বাংলাদেশী রেস্তরাঁয়। মৃদুল ভাই ও ভাবীরর ঘর আলো করে আছে তিন কন্যা মৌনামী, সৌরাত্রি আর সৌমিনী। মজা হচ্ছে মৌনামী আর সৌরাত্রি, এই শব্দ দু'টি তাদের নিজেদের আবিষ্কার, প্রচলিত বাংলা শব্দকে আরেকটু পালটে, আরো শ্রুতিমধুর করে একেবারে এক ও অদ্বিতীয় শব্দ কয়েন করে অনন্য নাম উপহার দিয়েছেন কন্যাদের! বাংলা ভাষার নাম কানে, প্রাণে শান্তি দেয়। যারা ভবিষ্যৎকালে কোন পিচ্চিদের নাম রাখবেন, তারা জিনিসটা ভেবে রাখতে পারেন।

আড্ডা শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত, তখন টিপ টিপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেছে, যা ভোরে ঝুমঝুম হয়ে জেটল্যাগের ফাঁদে আটকা পড়া ঘুম ভাঙিয়ে দিলো! তার খানিক পরেই বেরোলাম আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা জাদুঘর 'নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট' বা METS এ যাবার জন্য।

পথে সাবওয়ে ষ্টেশনে যাবার জন্য চাপা হল একটা বিশেষ ধরনের বড় গাড়ীতে যার গালভরা নাম 'ডলার ট্যাক্সি', সাধারণ ইয়েলো বা গ্রীন ক্যাব নয়, এর শরীরে কোথাও ট্যাক্সি শব্দটা খোদাও করাও নেই, ডলার-ট্যাক্সির অধিকাংশ চালকই কৃষ্ণাঙ্গ, সেখানে চালক বাদে ৪ জন্য যাত্রী বসতে পারে, নির্দিষ্ট এলাকার রুটের মধ্যে যেখানেই নামেন ভাড়া ২ ডলার!

METS জাদুঘর নিয়ে কিছু বলতে যাওয়ায় বাতুলতা মাত্র, কোন ভাবেই এই বিশাল সংগ্রহশালার মহত্ত্ব এবং বিস্তার আপনি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না, সেটা হোক চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, মিশরীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন, বা ভারতীয়, কেবল ঘোর লাগা একটা ভাব কাজ করে, এবং আরেকদিন সেখানে ফেরার জন্য এক আকুতি ঘাই মারতে থাকে ভিতরে। এর মাঝেও প্রিয় ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, পল সেজান, পল গগ্যাঁ, ক্লদ মোনে, এদুয়ার মানে, রেঁনোয়া, ভেরমের, সিসলে, তুলুস-লুত্রেক, সেউরাতের জগত আর সেই সাথে অগুস্ত রদ্যাঁর ভাস্কর্য, পিকাসো তুলির আচড়, আর রেমব্রান্টের আলোছায়া, প্রাচীন ওস্তাদ টিটিয়ান, তিনতোরেত্তোর মুন্সিয়ানা আর স্প্যানিশ গয়া-এল গ্রেকোর সৃষ্টি নিয়ে যায় এক অন্য গ্রহে, যেখানে বিস্ময় আর মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছুই নেই, থাকতে পারেও না।

METS এর টিকেটের দাম বেশ চড়া, কুড়ি ডলারের উপরে, কিন্তু নিউইয়র্কের রেজিষ্ট্রার্ড বাসিন্দা আর সেখানে ছাত্রদের জন্য টিকেটের দাম সম্পূর্ণ ডোনেশন ভিত্তিক, কেউ চাইলে ১ ডলার দিতে পারে, বা ১০ বা ১০০! সাথে স্থানীয় বন্ধু থাকায় সে এযাত্রা খুব সস্তাতেই এই বিশ্ব সম্পদ দেখার ব্যবস্থা করে দিল।

মিশরীয় সংগ্রহশালাটি অতি অনন্য, কত যে মমি, মমির কফিন, সারকোফোগাস, সমাধি মন্দিরের দেয়াল, দেবতার ভাস্কর্য, ভাষাহীন হয়ে বিমূঢ় বিস্ময়ে দেখে গেলাম প্রায় লাখ খানেক নিদর্শন, তাদের মধ্যেও বিশেষ কিছু ছিল ৪ হাজার বছর আগে লিলেন কাপড়ের সম্ভার।

কিছু বোঝার আগেই দেখি কয়েক ঘন্টা চলে গেছে, কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের গ্যালারীটা দেখে আফগানিস্তানে গান্ধারী শিল্পের নিদর্শন আর পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার নিখুঁত সব বুদ্ধ ভাস্কর্য দেখে সেখানের বর্তমান হালচাল চিন্তা করে খানিকটা আফসোস নিয়েই বেরোলাম অন্যদিন আবার আসব বলে, যদিও জাদুঘরের ১০ ভাগ দেখাও সম্ভব হয় নি, আর একদিনে এর বেশী দেখতে চাইও না!

ভেড়ার সরমা দিয়ে চটজলদি পেটপূজা সেরে ফুটবল খেলা দেখার জন্য যখন মহল্লার পানশালায় পৌছালাম, তখন আরও একবার মনে হলো, 'আমি তো আমেরিকায়!', ৩ বিশাল টিভির ২টা তেই চলছে নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিদের বেসবল খেলা, মাঝের টিভিতে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো ফুটবল খেলা চললেও সেটাতে কোন ধারাভাষ্য শোনা যাচ্ছে না, কারণ টিভির শব্দ মিউট করে চালানো হচ্ছে উদ্বাহু মিউজিক!

খেলা শেষে বাসায় ফিরতেই দেখি, "আমি যাই বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে" অবস্থা, বড় ভাই তানভীর অপু তল্পিতল্পা গুছিয়ে মার্কিন দেশে চলে এসেছে এক সাথে ভ্রমণে অংশ নেবার জন্য।