দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েসোমিতির আকাশ ধূসর হয়ে আছে, বাতাসে পোড়া গন্ধ আর ছাই, তারপরেও বিশাল এই সংরক্ষিত এলাকার মূল আকর্ষণ ইয়েসোমিতি ভ্যালিতে যখন পৌছালাম তখন ঠিক দেড়শ বছর আগে এখানে আসা জন মিউরের (John Muir) মতই মুগ্ধতায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম সেই উপত্যকার ঐন্দ্রজালিক সৌন্দর্যে। সারি সারি নানা আকৃতির পাহাড়, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব যেন ঠিকরে বের হচ্ছে এই ধোয়াটে আকাশ ভেদ করে, তার মাঝে যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টায় মত্ত এল ক্যাপিটান, দূরে যেন আকাশ থেকে স্বর্গীয় জলপ্রপাত নেমে এসেছে, ধোঁয়া আর মেঘ একাকার এই বিশাল ক্যানভাসে, দানবীয় গাছের কেবল স্নিগ্ধতা বাড়িয়েছে এই সুন্দরের, তাদের অনুপস্থিতিতেও পৃথিবীর সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি বলেই পরিচিত হতো এই উপত্যকা, এভাবে বলেও যদি বুঝাতে পারি এই অবাক সৌন্দর্যের খনির সামান্য ছিটেফোঁটা তাহলেও চলতি পথের এই লেখা সার্থক। 

Onu TareqOnu Tareq

সকালে রওনা দিয়েছিলাম এলডোরাডো হিলস থেকে, আগের দিন পাহাড়ি ঢলের কবলে পড়ায় যেহেতু আগের পরিকল্পনা বাতিল করে হিমিদের বাড়িতেই ফেরত যাওয়া হয়েছিল, তাই আজ আর উনারা আমাদের সাথে ইয়েসোমিতিতে যেতে পারলেন না, পরদিনই সোমবার, ছুটি পাওয়া মুস্কিল হবে, যদিও পুঁচকে অব্যয় খুবই বড়দের মত বারবার যেতে চাচ্ছিল আমাদের সাথে!

Onu TareqOnu Tareq

এবার অন্য পথ দিয়ে ন্যাশনাল পার্কে প্রবেশের সময় শুনলাম পার্কে প্রবেশের মোট চারটে পথের দুইটিই বন্ধ, এবং যে কোন সময় আগুন-পানির কারণে বাকী দুইপথও বন্ধ হয়ে যেতে পাড়ে, কাজেই আমরা যেন একটু জলদিই করি এই স্বর্গদর্শন আর গাড়ির কাছাকাছিই যেন থাকি। দুঃখের সাথে জানালেন পার্কের রেঞ্জার যে থিয়াগো পাস এখনো বন্ধ আর যেখানে গেলে এই ইয়েসোমিতি ভ্যালির সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য একই দৃশ্যপটে দেখা যায় সেই গ্লেসিয়ার পয়েন্ট এখন বন্ধ আবহাওয়ার কারণে, শুধু তাই না জলে শতভাগ নিখুঁত প্রতিফলনের ছবি যে সবাই তোলে মিরর লেকে, তাও বন্ধ, এবং অন্তত যে একটি জায়গায় যেতে চেয়েছিলাম সেই জন মিউর ট্রেইলে যাবারও কোন উপায় নেই, এবং কবে যে সেই পয়েন্টগুলো দর্শনার্থীদের জন্য খুলবে তা কেউই জানে না!

Onu TareqOnu Tareq

আর দেখা মিলবে না এখানে অন্যতম পরিচিত প্রতীক দ্য হাফ ডোমের, আধা গম্বুজের মত দেখতে যে পাহাড় চূড়া থেকে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নর্থ ফেস-এর লোগো নেওয়া হয়েছে, এক সাধারণ রোদ মাখা দিনে এদের সবাইকেই বেশ ভালো দেখা যাবার কথা, বিশেষ থেকে গ্লেসিয়ার পয়েন্ট থেকে। যেহেতু এই আবহাওয়ার সাথে ঝুঝে কারোই কিচ্ছুটি করার নেই, তাই সেই উপত্যকায় উপভোগ করলাম প্রাণ ভরে, হেঁটে হেঁটে গেলাম সেই ইয়েসোমিতি জলপ্রপাতে, পথে এক জায়গায় ওস্তাদ জন মিউরের ছবি, ধাতব ভাস্কর্য, এই এলাকা সংরক্ষণের পিছনে তাঁর অনস্বীকার্য ভূমিকা ইত্যাদি লেখা। সেই সাথে আছে আলোকচিত্রগ্রাহক অ্যানসেল অ্যাডামসের কথাও।

Onu TareqOnu Tareq

উপত্যকা থেকে বাহির হবার সময় সুড়ঙ্গের কাছেও বেশ সুন্দর একটা ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে পুরো উপত্যকার দেখা মেলে। সেই আধো উম্মোচিত অতি আকাঙ্ক্ষিত স্থানে আসতে পরে অত্যন্ত খুশি লাগলেও, জানলাম যে আবার আসতে হবে এখানে, হাতে সময় নিয়ে। ( উল্লেখ্য এখানের ভিতরে থাকলে চাইলে ক্যাম্প গ্রাউন্ডগুলোতে অন্তত এক বছর আগ থেকেই বুকিং দিতে হয়!) 
ফেরার পথ তখনো দাবানলের কারণে বন্ধ হয় নি, কিন্তু পথে বেশ পোড়া পোড়া গাছ নজরে আসলো, একাধিক বার ছোটখাটো গুঁড়িকে কালো ভালুক ভেবে ভূল করলো দলের সবাইই। উপত্যকার বাহিরেও যেদিক দিয়েই যায়, কেন যেন এক অজানা রোমাঞ্চ ঠিকই কাজ করে এখানে, জায়গাটি প্রিয় ইয়েসোমিতি বলেই।

সে রাতে ব্যাস লেক (Bass lake) নামে এক সুন্দর শান্ত লম্বাটে হ্রদের পাশেই চমৎকার কেবিনে থাকা হল, আশরাফ ভাই এটা খুঁজে বের করেছিলেন, যে আমরা সবাই মিলে এখানে থাকব, শেষ পর্যন্ত আবহাওয়ার কারণে তা না হলেও বেশ সুন্দর একটা জায়গায় আমাদের থাকা হল তাদের কল্যাণে।

Onu TareqOnu Tareq

পরদিন কিংস ক্যানিয়নের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার পর এক স্থানীয় অ্যান্টিকের দোকানে থামা হলো বিগ ফুট বা সাসকোয়াচের সুদৃশ্য ভাস্কর্য সহ নানা জিনিস দেখে, এই কিংবদন্তী এখনো ভালোই বিক্রি হয় দেখা গেল, শুধু যদি মানুষ এই ব্যাপারগুলোতে মিথ্যা না বলত, তাহলে আরও দ্রুত এদের ব্যাপারে সত্যগুলো আমরা জানতে পারতাম। জগতের খুটিনাটি অনেক জিনিসই সেই দোকানে থরে থরে সাজানো, তার মাঝে পেইন্টিং-এর কয়েকটা দারুণ বই বেশ সস্তায় পেয়ে আমি আর কনক দা কিনে ফেললাম, এর মাঝে বিখ্যাত নিসর্গী চিত্রকর Robert Bateman এর প্রকৃতির পেইন্টিংগুলোর এক বড় বই পেয়ে কিনে পেলে পরে নাড়াচাড়া করার সময়ে দেখি বইতে তাঁর অটোগ্রাফও আছে!!! আর এই অমূল্য বইয়ের দাম রেখেছিল ১ ডলার!

আর পথে থামা হল Cat Haven নামে এক জায়গায় যেখানে বিশ্বের নানা জাতের বুনো বেড়ালদের রাখা হয়েছে, তবে চিড়িয়াখানার মতো না, বরং উদ্ধারকৃতদের রাখা হয় সুস্থ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেবার জন্য। এমনকি ২টা বেঙ্গল টাইগারও আছে, সুযোগ পেয়ে এক বাঙলা বাঘের ছানার সাথে দেখা হলো, যার নাম অ্যাপোলো!

এরপর সোজা কিংস ক্যানিয়ন, অনেকেরই জানা নেই যে কিংস ক্যানিয়নের এক জায়গায় কিংস নদীর কারণে সৃষ্ট গিরিখাদের উচ্চতা/ গভীরতা ৮২০০ ফুট, যা অতি বিখ্যাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চাইতেও বেশী গভীর! এক কালে এই অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল সব সিক্যোয়া গাছ রক্ষার জন্য একটি সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রস্তাবনা আসলে সেটার ফলশ্রুতিতে কিংস ক্যানিয়নকেও ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

Onu TareqOnu Tareq

সেখানের ভিজিটর সেন্টারটায় এখানের অধিবাসী প্রাণীদের হাগুর (বিষ্ঠা) নমুনার একটা সুন্দর ফ্রেমে প্রদর্শন করে রাখা, বনে গেলে প্রাণীদের চিনতে হলে তাদের পায়ের ছাপ চেনা যেমন দরকার, তেমনি দরকার তাদের হাগু চেনাও, যাতে আপনি জানেন কে এখানে ছিল একটু আগে, বা কয় দিন আগে! হয়ত তাদের দেখা সহজে মিলবে না, কিন্তু হাগু দেখে জানতে পারবেন তাদের অস্তিত্ব ও সংখ্যা নিয়ে।

Onu TareqOnu Tareq

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে মেঘ ছুঁয়ে দূরের-কাছের পাহাড় ছুঁয়ে কেবলই বিমোহিত হতে হতে আমরা ঘুরে ঘুরে এগিয়ে চললাম একবার হাজার হাজার ফুট উপরে, আরেকবার খরস্রোতা কিংস নদীর পাড় ঘেষে। প্রায় এক ঘণ্টার ওয়ানওয়ে ড্রাইভ, একেবারে শেষ মাথায় যেয়ে সামনে সিয়েরা নেভাডা পর্বত মালা, তখন আবার ১ ঘণ্টা লাগবে ফিরে আসতে। পথে গ্রিজলি ফলস নামে এক জলপ্রপাতের নিচে দিনের ভোজন শেষে সেই জল-পাহাড়-বনের রাজ্যে স্মরণীয় কিছু সময় কাটিয়ে চললাম প্রিয় জেনারেলের সাথে দেখা করতে।

বিশ্বের যে দেশেরই হোক খাকি বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে অজাতমুগ্ধতা নেই আমরা, কিন্তু এই জেনারেল সাহেবকে দেখার ইচ্ছা শিশুকাল থেকেই, ভদ্রলোকের বয়স মাত্র ২২০০ বছর হলেও উচ্চতা ২৭৫ ফুট, মানে ঢাকার ২৫ তলা ভবনের সমান! আমেরিকার গৃহযুদ্ধের কিংবদন্তী জেনারেল William Tecumseh Sherman এর নামে এই দানব সিক্যোয়া গাছের নামকরণ করা হয়। ওনার চেয়ে আরও হাজার বছরের প্রাচীন সিক্যোয়া গাছ আছে এই ক্যালিফোর্নিয়াতেই , কারণ এরা জন্মায় একমাত্র সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে, কিন্তু নানাবিধ প্রাকৃতিক কারণেই এই জেনারেলই এখন বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতম গাছ ( ইদানীং আরেকটা উঁচু গাছের কথা শোনা যাচ্ছে বটে, কিন্তু বিজ্ঞানিরা সাধারণ মানুষের কৌতূহলের ভিড়ে তাঁর যাতে ক্ষতি না হয়, সেই জন্য উনার ঠিকানা দিচ্ছেন না! তাই তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে কেউই নিশ্চিত না)। কিন্ত তারপরেও দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, ভলিউম হিসেব করে এটাই পৃথিবীর বৃহত্তম গাছ!

Onu TareqOnu Tareq

জায়ান্ট সিক্যোয়া ন্যাশনাল পার্কে নানা জাতের সুউচ্চ গাছের ভিড়ে গেরুয়া রঙের ইয়া মোটা মোটা গুঁড়ি দেখা যায় অনেক দূর থেকে, তাদের বর্ণের কারণেই! কদিন আগেই দেখা জায়ান্ট রেডউড অরণ্যে যেমন শুধু তাদেরই জয়জয়কার ছিল, এখানে তেমন না, নানা জাতের পাইন ও অন্যান্য দানবদের মাঝেই দেখা যায় সিক্যোয়াদের। এর মাঝেও রাজাধিরাজ জনাব শেরম্যান! উনার গুড়ির পরিধি প্রায় ১০৩ ফুট, বলেন দেখি কয়জন মানুষ লাগবে হাতে হাত রেখে তার গুঁড়িটা ঘিরতে?

Onu TareqOnu Tareq

জেনারেলের চারপাশে কাঠের বেড়ার বেস্টনী, যাতে প্রতিদিন তাকে দেখতে এসে অবাক আপ্লূত হাজার হাজার মানুষ যেন শিকড়ের উপরের ভূমিতে দাঁড়িয়ে কোন ক্ষতি না করে, অধিকাংশ সিক্যোয়াই আসলে বেড়ার অন্যপাশে। তাঁকে অনেকক্ষণ অবাক নয়নে দেখে স্যালুট দিয়ে বিড়বিড় করে বললাম অ্যালান কোয়াটারমেইন বইতে পড়া সেই অমর লাইনগুলো-

"বড় একটা গাছ কাটার আগে সবার একবার ভেবে দেখা দরকার। সুন্দর বড় গাছ দেখতে চিরদিনই আমার ভাল লাগে। শৈত্যপ্রবাহের সময় কি গর্বভরে মাঠ উঁচু করে থাকে ওরা, প্রাণ ভরে অনুভব করে বসন্তের পদধ্বনি! কি অসাধারণ শোনায় তাদের কণ্ঠ, যখন তারা কথা বলে বাতাসের সাথে। পাতার ফিসফিসানির কাছে হার মানে বায়ূ দেবতা ঈওল্যাসের হাজারটা বীণা। সারাদিন পাতাগুলো চেয়ে চেয়ে দেখে সূর্যালোক, সারারাত ধরে দেখে তারা। শতাব্দীর পর শতাব্দী তাদের খাবার জোগায় মা ধরিত্রী। অনেক দালান-কোঠা-বংশের উত্থান পতন দেখার পর অবশেষে ঘনিয়ে আসে চূড়ান্ত দিন। হয় লড়াইয়ে সেদিন জিতে যায় বাতাস, নয়তো নেমে আসে অস্বাভাবিক মৃত্যু।"

Onu TareqOnu Tareq

 

এরপর হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে হারিয়ে খুঁজে খুঁজে পেলাম পাশাপাশি দাঁড়ানো এক জোড়া সিক্যোয়াদের, যারা Twin নামেই পরিচিত, এবং তাদের ছুঁয়ে নিজেদের ধন্য করতে পারে মানুষেরা!

সেই গেরুয়া রঙা বাঁকল দুই ফুট পুরু, বেশ নরম! সেখানে খুব স্পষ্ট করে লেখা আছে এক জায়গায় যে কেন এই সিক্যোয়াদের টিকে থাকা এবং বিস্তারের জন্য দাবানলের দরকার! দাবানল হলেই সিক্যোয়া বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটে যথার্থ ভাবে, সেই সাথে পুড়ে যাওয়া গাছপালার ছাই সার হিসেবে বাড়তি পায় তারা, আবার আগুন মাটিতে জন্মানো শত্রু ফাঙ্গাসদের পুড়িয়েও দেয়, তাই আগুন প্রাকৃতিক ভাবেই লাগবে এই গাছেদের টিকে থাকতে!

কাছেই ২৪০০ বছরের প্রাচীন এক সিক্যোয়া গুড়ির এক অংশ রেখে একেবারে হাতে-কলমে দেখানো হয়েছে যে জীবদ্দশায় সে কতবার দাবানলের সম্মুখীন হয়েছে! আর কত কিছুই না দেখেছেন তিনি, মানুষ ১০০ বছর হলেই সেটাকে ঐতিহাসিক বানিয়ে ফেলে, আর ২ হাজার বছরের বেশী, তখন রোমান সভ্যতার যুগ, মানুষের পৃথিবীর কত কিছুই না জানা যেত তাঁর বয়সী হলে!

অতি বিস্ময়কর এই জগত, এখানে আমরা মানুষেরা ক্ষণিকের অতিথি মাত্র! সেই বিস্ময়বোধকে সঙ্গে নিয়ে তারা যেন হাজার হাজার বছর টিকে থাকেন সেই কামনা করে আবার পথে আমরা।

গন্তব্য – ডেথ ভ্যালি।