'কী চাকরি করা হয়?' নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার জলদ গম্ভীর কন্ঠের প্রশ্ন।

- 'জী, চাকরি করি না আপাতত, ছুটিতে আছি'

'কী চাকরি'?

- চাকরি না করে ছুটিতে আছি, পৃথিবী দেখার চেষ্টা করছি। পাখিদের নিয়ে পরিবেশ রক্ষার কিছু কাজ করি, কিন্তু সেগুলো স্বেচ্ছাসেবী কাজ।

'আমেরিকায় কোথায় ঘুরবা?'

- মূলত ন্যাশনাল পার্কগুলো- ইয়েলোষ্টোন, ইয়েসোমিটি, জায়ান্ট সিকোয়া, গ্রেট স্মোকি এই সব।

'ওয়েলকাম টু আমেরিকা'

ব্যস, পাসপোর্টে সিল বসিয়ে দিলেন ধুম করে, সেটা নিয়ে ২০ মিনিট করে ল্যাগেজ নিয়ে বের হতেই বন্ধু তমরী আর তার ছোট ভাই অরিত্রর সাথে দেখা। তাদের কুইন্সের জ্যামায়কায় অবস্থিত বাসায় যেতেই আন্টি- আংকেলের সাথে দেখা বেশ ক'বছর পরে।

যেহেতু আমরা সবাই বুনো জীবজন্তু পছন্দ করি তাই প্রথমেই আড্ডা জুড়ে থাকলো এই বাসাতে দেখা যাওয়া পাখি আর পশুদের কথা, এবং আমাকে অতি অবাক করে আনন্দে ভাসিয়ে আন্টি জানালেন তাদের বাসার মূল ফটকে এক জোড়া র‍্যাকুন দম্পতি প্রতি রাতে এসে বেড়ালের জন্য রাখা খাবার খেয়ে যায়! ইদানীং আবার তাদের দুই ছানা হয়েছে, তারাও আসে সেই নৈশভোজে। র‍্যাকুন আমার অতি আগ্রহের প্রাণী, ফ্রেড জিপসনের 'দ্য হাউন্ড-ডগ ম্যান' ( সেবার অনুবাদে শিকারি পুরুষ) পড়ে পড়ে তাদের প্রেমে পড়ে গেছিলাম, এবং তারা খাবার আগে খাবার ধুয়ে নেয়, এবং খাওয়া শেষে দুই হাত (সামনের দুই পা) ধুয়ে নেয়! এই আজব বৈশিষ্ট্যের কারণ অবশ্য জানা নেই! আন্টির মোবাইলে তোলা র‍্যাকুন জোড়ার দারুণ ছবি দেখেই বললাম 'জীবনে বুনো র‍্যাকুন দেখি নাই, আমেরিকায় এসে প্রথম রাতেই র‍্যাকুন দেখলে তার চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! (আমেরিকায় এক সময় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের কুন বলে বর্ণবাদী গালি দেওয়া হতো, কেন কে জানে!)।

তখন রাত ১টা, আংকেল বললেন "এখনো ওদের আসতে দেরী আছে, চলো তোমাকে আমার বিড়ালদের দেখিয়ে নিয়ে আসি, এই এলাকার নানা রাস্তায় অন্তত ২০টা বিড়ালকে আমি খাওয়ায় প্রতি রাতে, নির্দিষ্ট জায়গায় গেলেই ওদের দেখা যাবে!"

এমনিতেই তাদের বাসায় ছাই, পুচকা আর টাইগার নামের ৩ বেড়াল আছে যাদের ব্যক্তিত্ব অতি আলাদা- একজন লাজুক, আরেকজন বেশ সংবেদনশীল আরেকজন বেশ টম-মাস্তান টাইপ, যে বেড়াল হয়েও পাড়ার কুকুরদের কামড় দিয়ে আসে নিয়মিত!

ভোর ৩টায় ফিরলাম রাতের নদীর মতো রাস্তাগুলো আস্তে আস্তে ঘুরে নানা মোড়ে বিড়ালদের খাবার দিয়ে, নির্জন দ্বীপের মতো পার্কগুলো দেখে, এসে জানা গেলে র‍্যাকুনেরা এসে খাবার খেয়ে চলে গেছে আমাদের দেরী দেখে। ৪টার সময় খুব সরগোল শুনে জানালায় যেয়ে দেখি স্টারলিং পাখির ঝাঁক কিচির-মিচির করে সূর্য তুলে এনেছে!

জেট ল্যাগে ক'ঘন্টা পরেই ঘুম ভাংলো, সেই সাথে রাস্তার ওদিকেই অবস্থিত খেলার জায়গায় বাস্কেটবল খেলার থপথপ আওয়াজে। বিশ্ব যতই ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, ওয়েলকাম টু আমেরিকা!

'আহারে
আহারে 
কোথায় পাবো তাহারে'
গান শোনার ফাঁকেফাঁকে এক ছোটকাজে ব্রুকলিন যাওয়ার পথে সবচেয়ে বেশী চোখে পড়লো রাস্তার দুই ধারের কবরস্থান আর সুউচ্চ গির্জাগুলো!

ফেরার পথে 'ফরেস্ট হিলস'এ তমরীর প্রিয় ক্যাফেতে কফি খেতে থামা হলো যেখানে প্রায়ই তার বন্ধুরা জ্যাজ আর ব্লুজ গায়! 'রেড পাইপ ক্যাফে'তে কাগজের কাপের পরিবর্তে কাচের পেয়ালায় কফি দেওয়া হয় বলে গ্রাহকদের বেশ তৃপ্ত দেখা গেল।

এরপর সাবওয়ে বা পাতালরেল সহযোগে গ্যান্ট্রি প্লাজা ষ্টেট পার্ক যাওয়ার সময় খেয়াল করে দেখলাম সবাই মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত সেই কক্ষে, শুধু এক কোণে নির্জনতায় মোড়া এক কৃষ্ণাঙ্গ ভদ্রলোক একটা বইয়ের শেষ ক'টা পাতা পড়ে, পরম যত্নে গুছিয়ে রেখে আরেকটা বই পড়া শুরু করলেন! Finding forester সিনেমার লেখক চরিত্রের সিন কনারি হয়তো এই বইপোকাকে দেখলে বিমুগ্ধ ভাবে আবারও বলতেন, 'You write well & u r black!'

লং আইল্যান্ড ডকে নেমেই সামনে চোখে পড়ে 'ইষ্ট রিভার' নদীর অপর পাড়ের আলো ঝলমলে ম্যানহাটন, অথচ কোন কোলাহল নেই এপাড়ে, এত ব্যস্ত নগরীর এ এক অন্যরকম অনিন্দ রূপ, কান পেতে শোনা বাতাসের সরসর আর সাইপ্রেস গাছের পাতার মর্মর কেবল নেরুদার শব্দমালার কথা মনে করিয়ে চলল-

"I like you calm, as if you were absent:
distant and saddened, as if you were dead.
One word at that moment, a smile, is sufficient.
And I thrill, then, I thrill: that it cannot be so."

চলবে...........