সেদিন ছিল গোয়া ভ্রমণের তৃতীয় দিন। আর এদিনেই কক্সবাজারের সাথে গোয়ার আসল পার্থক্য গুলো চোখে আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল, নর্থ থেকে সাউথ গোয়া যাবার সময়। এই প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের মাঝে অবস্থিত সকল কিছু। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, গাছপালা, পাহাড় জঙ্গল, পুরনো আর ঐতিহ্যবাহি নানা রকম স্থাপনা আর চোখ জুড়ানো নির্মল প্রকৃতি। শান্ত, নিবিড় আর কোলাহলহীন এক সৈকতের শহর গোয়া। কোথায় কোথায়, কিভাবে, কিভাবে আর কেমন কেমন সেই পার্থক্য গুলো এই সবই বলবো আজকের গল্পে।

দ্বিতীয় দিন সন্ধায় সৈকত থেকে রুমে ফেরার পরে, হোটেল থেকে জিজ্ঞাসা করা হল আমরা নর্থ গোয়াতে সাইট সিয়িং করতে যেতে চাই কিনা? জিজ্ঞাসা করলাম, কি রকম ব্যবস্থাপনা? বলা হল পুরো নর্থ গোয়ার বিশেষ বিশেষ কয়েকটা বীচ, ফোরট, ডলফিন পয়েন্ট, ক্রুজ সাফারি আর আইসল্যান্ড এর যায়গা গুলো এসি গাড়িতে করে নিয়ে যাবে, যার সিট প্রতি সারাদিনে জন্য ভাড়া দিতে হবে ৩০০ রুপী করে। আমরা চাইলে দুই সিটও নিতে পারি ৬০০ রুপী দিয়ে সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে কোলে রাখতে হবে। কোন বাধ্য বাধকতা নেই।

শুনে রুমে চলে গেলাম একটু পরে জানাবো বলে। তারপর একটু বাইরে গেলাম খোঁজ নিতে যে সারাদিনের জন্য ছোট একটা গাড়ি ভাড়া কত পরবে বুঝতে। গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম ৩০০০-৫০০০ পর্যন্ত এক দিনের গাড়ি ভাড়া, সিট আর আকার ভেদে। শুনেই ঝটপট চলে এলাম রুমে, ছেলের মাকে বলতেই সে দ্রুত তিনটা সিট বুকিং করে দিতে বলল। ব্যাস সামনে গিয়ে তিন জনের জন্য তিনটি সিট বুক করলাম ৯০০ রুপী দিয়ে। পরদিন আমাদের নর্থ গোয়া দর্শনের আনন্দে বেশ খুশি খুশি লাগছিল।

সকাল ৮ টায় সবাই প্রস্তুত হয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি। আসলে গাড়ি গেটেই দাড়িয়ে আছে, হোটেলের অন্যান্য যারা যাবে বলে বুকিং করেছে তাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছি। ৮:৩০ এর মধ্যে সবাই এসে পরাতে আমাদের ১৫ সিটের এসি গাড়ি ১২ জনকে নিয়ে চলতে শুরু করলো সাউথ থেকে নর্থ গোয়ার দিকে। আর এরপরেই শুরু হল কক্সবাজারের সাথে গোয়ার আসল পার্থক্য গুলো চোখে পরা।

গাড়ি আমাদের হোটেল থেকে মুল রাস্তায় উঠে চলতে শুরু করতেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম গোয়া যে একটা প্রাচীন শহর, বহু বছর আগে গড়ে উঠেছে, সেটা যেন ঠিক তেমনিই আছে! অবাক ব্যাপার। বাড়িঘর সেই যেমন তৈরি হয়েছিল হয়তো ৫০ বছর আগে তেমনি আছে, রেখেছে। রাস্তাঘাট যেমন সংকীর্ণ ছিল তেমনই আছে, গাছপালা যেখানে যেমন গড়ে উঠেছে সেটাও তেমন ভাবেই বেড়ে উঠছে বা ঠায় দাড়িয়ে আছে। কোথাও কোন আধুনিকতার ছোঁয়া নেই, কোন বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করার জন্য বাহুল্যতা নেই, আর্টিফিশিয়াল সবুজের ছড়াছড়ি নেই।

একটা ব্যাপার যদি একটু ভেবে দেখেন তো বুঝতে পারবেন। আমরা যারা জীবনের তাগিদে সব সময় শহরে বসবাস করি, একটু প্রকৃতি, সত্যিকারের ন্যাচারাল সবকিছু আমাদের সবাইকে খুব টানে, সেটা সবুজ মাঠ হোক বা পুরনো গাছপালা বা বন জঙ্গলের মধ্যে গড়ে ওঠা আদি ঘরবাড়ি। যে কারনে গোয়াকে আরও বেশি ভালো লেগেছে, কেউ কোথাও কোন অযথা আকর্ষণ তৈরি করতে গিয়ে আসল প্রকৃতিকে উজাড় করে দেয়নি।

পুরনো জীর্ণ বাড়ি ভেঙে নতুন সুউচ্চ স্থাপনা গড়ে তলেনি, পাহাড়ের গায়ে গায়ে সাময়িক কটেজ তৈরি করেনি, যা যেমন ছিল তা সেভাবে রেখেই শুধু মানসিকতার পরিবর্তন করে, মননে আধুনিক হয়ে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্র শহর করে ফেলেছে। শুধু সুযোগ, সুবিধা আর নানা রকম আধুনিক আয়োজন রেখে। প্রকৃতি ঠিক যেমন ছিল অনেকটা তেমনই আছে। অন্তত আমি যতটুকু ঘুরেছি সেসব তেমনই লেগেছে আমার কাছে।

কিন্তু আমাদের কক্সবাজার? তার কি হাল সে তো আমরা সবাই জানি। সোনার ডিম পাড়া হাঁস এখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। প্রকৃতি, পাহাড়, বন, এমনকি সৈকত উজার করে দিয়েও আমরা গড়ে তুলেছি আর প্রতিনিয়ত তুলছি যত উঁচু সম্ভব ইট, পাথর আর স্টিলের পরিবেশ দূষণকারী স্থাপনা। ইট আর পাথরের দেয়ালে আজকাল দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতও চোখের আড়ালে চলে গেছে! এই হল আমাদের পরিবর্তন, আর এই হল আমাদের উন্নয়ন আর এই হল আমাদের এগিয়ে যাওয়া! হ্যা এগিয়ে যাওয়াই বটে তবে সামনের দিকে নয় পিছনের দিকে, প্রকৃতি, পাহাড়, অরন্য আর সমুদ্রের তীরকে চিরতরে ধংস করে দিয়ে!

আমরা প্রতিযোগিতা করছি প্রকৃতিকে কত বাঁচিয়ে রাখা যায়, কক্সবাজারকে কত আকর্ষণীয় করা যায়, কত দেশি বিদেশী পর্যটক কক্সবাজারে এনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যায় আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় সেটার না। আমরা প্রতিযোগিতা করছি কে কত বড় স্থাপনা গড়তে পারি, কে কতটা পাহাড় কেটে নিজের করে নিতে পারি, কে কোন অরন্য ধংস করে রিসোর্ট বানাতে পারি, কে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বীচে ধংস করে সমুদ্রের কতটা কাছে নিজেদের সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি করে টুরিস্ট ধইরা, কামাইয়া লইতে পারি এসবের।

কারন আমাদের লক্ষ্যই হল পাইছি টুরিস্ট, কামাইয়া লই!

কিন্তু আজ থেকে ১০/২০ বা ৫০ বছর পরে কি হবে? কে আসবে, পরিবেশ, পরিস্থিতি, আকর্ষণ আর বীচের অবস্থান কি দাঁড়াবে সে কথা কেউ একবারও ভাবিনা, ভাবছিনা, ভাবার দরকারও নেই। ভেবে কি করবেন বলুন? আপনারা পাইছেন টুরিস্ট, কামাইয়া লন!

আর আমাদের নীতিনির্ধারকরাও ঠিক এমনি পাইছো টুরিস্ট, কামাইয়া লও! খালি আমারে কিছু ভাগ দাও! এই হল আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ, সবচেয়ে বড় আর জনপ্রিয় আকর্ষণের বর্তমান চিত্র। তাহলে কিভাবে আমরা অন্য দেশে কম আকর্ষণীয় বীচের সাথে নিজেদের তুলনা করবো? যেখানে অন্য দেশের বীচের কাছে কিছু স্থাপনা থাকলেও সেগুলো প্রকৃতি ধংস করে নয়। অন্তত আমি যেটুকু যায়গা দেখেছি আর যে কটা বীচে ঘুরেছি।
কোথাও বীচ ঘেসে, অরন্য উজার করে, পাহাড় কেটে, নিজেদের আদি প্রকৃতি ধংস করে কোন কিছুকে, কোন বীচকে আকর্ষণীয় করতে দেখিনি।

আর জানেন, এই ন্যাচারল সবকিছুর জন্যই, নানাবিধ আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধার জন্য, অল্প খরচে নিজেদের মত করে অনেকদিন ঘুরতে পারার জন্য গোয়াতে সারা বছর শত শত নয়, হাজার হাজার, লাখ, লাখ বিদেশী পর্যটক আসে, থাকে আর ইচ্ছামত ঘুরে বেড়ায়। আর ওরা এই দিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করে নেয়, কর্মসংস্থান বাড়ায়, আর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় ভুমিকা রাখে।

কিন্তু আমাদের এতো বিশাল, এতো দীর্ঘ, এতো আকর্ষণীয়, এতো উচ্ছ্বসিত, এতো মাতাল করা কক্সবাজারের মত বীচ থাকা সত্ত্বেও কেন তেমন একটা বিদেশী দেখা যায়না? কেন কক্সবাজারের মত এতো বিশাল একটা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের লাখ লাখ ছেলে মেয়ে বেকার বসে থাকে? কেন আমাদের এখানে কোন টেকসই উন্নয়ন হয়না? কেন আমাদের কক্সবাজারকে নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী কোন কার্যকরী পরিকল্পনা হয়না? কেন কক্সবাজার দিয়ে আমাদের উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়না? কেন কক্সবাজার আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারছেনা?

কেন স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও এমন একটা রুটে একটা ট্রেন লাইন হলনা? কেন কক্সবাজার যেতে ঢাকা থেকে মাত্র ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১২\১৫ বা ২০ ঘণ্টা সময় লাগবে? কেন যেতে আর আসতে দুইদিন সময় লাগবে? কেন একটা রূপচাঁদা মাছ খেতে ৪ থেকে ৫ শত টাকা লাগবে? কেন একটা চারজনের পরিবারের সকালের নাস্তা খেতে ৯০০ টাকা লাগবে? কেন কক্সবাজার থেকে ইনানি যেতে ১০০০ টাকা ভাড়া লাগবে? কেন হোটেল রুমে বসে সমুদ্রের পরিবর্তে শুধু ইট পাথরের স্থাপনা দেখতে হবে?

কেন আবার? পাইছেন টুরিস্ট, কামাইয়া লন!

কিন্তু কইদিন আর কামাইবেন? মানুষ এখন আর অতো গাধা, খোঁড়া আর ভীতু নাই, এখন দেশের চেয়ে বিদেশে বেশি যায়। কিছুদিন পরে আরও যাবে, তখন সোনার ডিম পাড়া কক্সবাজার টুরিস্ট এর অভাবে খাঁ খাঁ করবে, আপনারা বসে বসে সারা বছর মাছি মারবেন, সমুদ্রের ঢেউয়ের পরিবর্তে চারদিকে আপনাদের নিজেদের গড়া ইট আর পাথরের হোটেল দেখবেন আর হায় হায় করবেন। যা খাবার খাইয়া লন...

পাইছেন টুরিস্ট, কামাইয়া লন!

এখনো সময় আছে, আসুন কক্সবাজারকে বাঁচাই, পর্যটনকে এগিয়ে নেই, দেশকে সমৃদ্ধ করি আর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখি।