বাজে সময় গুলো মানুষের যেন কাটতেই চায়না। একঘন্টাকেও এক সপ্তাহের মত দীর্ঘ মনে হয়, আবার একটা লম্বা সময় যখন খুব ভালোভাবে কাটাবেন, আপনার মনে হবে কয়েক মুহূর্তেই বুঝি সময়টা শেষ হয়ে গেলো!

ঠিক এই কারণেই মিনা যখন তার ফেসবুকের দেয়ালে লেখেন- “Now that I am leaving the country, it feels like I've only been here for a few seconds...” (দেশটা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড ছিলাম এখানে)-  আমরা বুঝে যাই এই দেশটাতে ভালো সময় কাটিয়েছেন তিনি, সব ভালো-খারাপ, তিতা-মিঠা মুহূর্তের সারাংশে পৌঁছে দেশটির স্মৃতিকে মধুর স্মৃতি হিসেবেই রায় দিয়েছে তার মন।

বলছি মিনা ফ্লাইভহম টড এর কথা। ফেসবুকের কল্যানে ডেনিশ এই রেড ক্রস কর্মীর নাম হয়ত অনেকেরই শোনা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে! বাংলাদেশে দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়ে অবশেষে দেশ ছাড়লেন গত ২৫ মে। যাবার আগে জানিয়ে গেছেন এই দেশ সম্পর্কে তার অনুভূতি ফেসবুকের দেয়ালে।

কক্সবাজারে মিনা টড কক্সবাজারে মিনা টড

এত বৈচিত্র্য এই দেশে- যা হয়ত আমাদের প্রতিদিনের অভ্যস্ততায় নজর এড়িয়ে যায়, মিনার লেখা গুলো সেই বৈচিত্র্যকেই নির্দেশ করে নান্দনিক ভাষার আশ্রয়ে।

তিনি দেখেন এই দেশে পাশাপাশি সহাবস্থান চরম দারিদ্র্য আর অগাধ বিত্তের, এখানে হাত ধরে পথ চলে দূর্নীতি আর সততা, এখানেই পাওয়া বিশ্বের অন্যতম দূষিত বাতাস (ঢাকা), আবার এই দেশেই বিশ্বের অন্যতম সবুজ ও দূষণ মুক্ত শহর (রাজশাহী) অবস্থিত!

আর তাই বাংলাদেশ কে তিনি দেখেছেন বর্ণিল এক দেশ হিসেবে। তার ভাষায় “রেইনবো কান্ট্রি”! যেখানে প্রতিদিন তার দেখা হয় এমন মানুষের সাথে যারা দেশিয় সংস্কৃতি কে তাচ্ছিল্য করে, আবার পরক্ষণেই খুঁজে পান এমন কাওকে যারা পুরোপুরি ধারণ করেন এই দেশকে, কথা হয় আপাদমস্তক শিক্ষিত কারো সাথে, আবার আড্ডায় মেতে ওঠেন এমন কারো সাথে যে কোনদিন বই ছুঁয়েও দেখেনি!

হাওরে ঘুরছেন মিনা হাওরে ঘুরছেন মিনা

চলার পথে মিনা পরিচিত হয়েছেন এমন মানুষের সাথে যারা বিশ্বাস করেন নারী ও পুরুষের সমতায়, আবার দেখেছেন এমন মানুষ ও যারা নারীকে স্রেফ একটা বস্তু হিসেবে দেখে। মিনা দেখেছেন এমন রমণী যার জীবনের একমাত্র আশা বিয়ে করে সংসারী হওয়া, আবার এমন নারীর দেখা পেয়েছেন যারা পৌছুতে চায় সাফল্যের শীর্ষে, নিজের ব্যবসা টাকে দাড় করাতে চায়, ঘুরে দেখতে চায় পুরো পৃথিবী!

এই বৈচিত্র্যটাকেই ভালোবেসেছেন মিনা। তার মনে হয়েছে এত এত বিচিত্র মানুষ প্রত্যেকেরই যেন আলাদা আর নিজস্ব একটা রঙ আছে! আর সেই রঙ এই পূর্ণ হয়েছে সাত রঙের কালার প্যালেট, এই দেশটি হয়ে উঠেছে বর্নিল-রঙ্গিন-রংধনু এক দেশ। যেখানে হয়ত আছে ধূসর বা কালো, কিন্তু আছে উজ্জ্বল লাল-নীল-সবুজ ও!

আর এই সব বৈচিত্র্যের ভিড়ে একটা সাধারণ মিল খুঁজে পেয়েছেন তিনি সবার মধ্যে! সেটা হল এই দেশের মানুষের আন্তরিকতা আর আতিথেয়তা! তার ভাষায়-

“এত এত পার্থক্যের পর ও একটা ব্যাপারে সকলেই এক- তা হল প্রত্যেকেই খুবই বন্ধুভাবাপন্ন ও অতিথি পরায়ণ! আর প্রত্যেকেই উদগ্রীব হয়ে চেষ্টা করেছে আমি যেন এই দেশটাকে ভালোবাসি, অনুমান করতে পারেন কি ঘটেছে? তাদের চেষ্টা সফল!”  (Despite the many differences, there is something that all these people share, and that is being super friendly and hospitable, and eager to make you like their country. And guess what - they succeeded!)   

ক্ষুদ্র- নৃগোষ্ঠীতে মিনা সজ্জিত হচ্ছেন তাদের পোশাকেক্ষুদ্র- নৃগোষ্ঠীতে মিনা সজ্জিত হচ্ছেন তাদের পোশাকে

 

মিনার এই দেশ ভ্রমণ ছিলো বিচিত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সব অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। তিনি অবাক হয়েছেন- যে দেশে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত সে দেশের এত কম মানুষ সাঁতার জানে! চায়ের কাপে আড্ডায় ঝড় তুলেছেন এখানে সেখানে আমাদের মতই, তাই দিনে দশ কাপ চা ও খাওয়া হয়েছে তার- এটাও মিনার জন্য মজার এক অভিজ্ঞতা। তবে সব থেকে বেশি মজা পেয়েছেন যখন তিনি ডেনমার্কের অধিবাসী শুনে বাংলাদেশীরা গর্ব ভরে তাকে ড্যানিশ কন্ডেন্স মিল্ক এর কৌটা দেখিয়েছে! আর মিনা নাম শুনেও মিনা কার্টুন দেখাবে না- তাও কখনো হয়?  

 

এই সুন্দর সময়গুলো কাটানোর ভিতরেও মিনা লক্ষ্য করেছেন এই দেশের ক্ষত গুলোকে, আবার দেশের তরুণদের ভেতরেই দেখেছেন সেই ক্ষত শুকানোর আশাও! তার ভাষায়-  “I'm well aware of the problems that there are in this country. Extreme poverty, overpopulation, corruption, waste, and inequality, are just some of the issues that are yet to be dealt with. But I have been happy to see how many strong souls, progressive thoughts and awesome initiatives there are wherever you look. And I believe that if you keep this up, change is gonna come. Step by step.”

( আমি এই দেশের সমস্যা গুলো সম্পর্কে সচেতন। চরম দারিদ্র্য, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দূর্নীতি, অপচয় আর অসমতার সাথে এখনো অনেক বোঝাপড়া বাকি। কিন্তু আমার এটা দেখে ভালো লাগছে যে এখানে কত দৃঢ় তরুণ প্রাণ, উন্নত চিন্তা আর দারূন সব উদ্যোগের ছড়াছড়ি। আর আমি বিশ্বাস করি- এই বিষয়গুলো যদি অটুট থাকে, পরিবর্তন আসেবেই, একের পর এক)

 

বাংলাদেশি পরিবারের সাথে মিনার জন্মদিন উদযাপন বাংলাদেশি পরিবারের সাথে মিনার জন্মদিন উদযাপন

 

এই দেশ থেকে যাওয়ার সময় মিনা মিস করেছেন প্রত্যেকটা ছোট্ট স্মৃতিকে, বারান্দায় শুঁকোতে দেয়া বহুবর্নের কাপড়, পাড়ার মুসল্লী চাচার মেহেদী রাঙ্গানো দাঁড়ি, ছোট্ট চিপায় এটে যাওয়া নাপিতের দোকান বা রিকশায় শহরময় ঘুরে বেড়ানো একাকী সময় গুলো।  

তাইতো যাওয়ার সময় দেশটি সম্পর্কে এতকিছু লিখেও তার মনে হয় কিছুই যেন বলা হলনা-  “This was supposed to be a short post, but Bangladesh has found a place very close to my heart, and deserves so much more than just a few words”

( সম্ভবত এটা খুবই ক্ষুদ্র একটা লেখা, কিন্তু বাংলাদেশ স্থান গেড়ে নিয়েছে আমার হৃদয়ের খুব কাছেই, আর তাই আমার কাছে এই দেশের পাওনা এই কটা শব্দের থেকেও অনেক বেশি কিছু)

মিনা তার লেখা শেষ করেছেন এই দেশকে, দেশের মানুষদেরকে ভালোবাসা জানিয়ে। সম্ভবত যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন এই দেশের সমস্যা থেকে মুক্তির- সেই স্বপ্ন পূরণেই সম্ভব তার ভালোবাসার দায় মেটানো। ভালোবাসা মিনার জন্য, মিনা দের জন্য। প্রতিদিনের এই চারপাশটাকে নতুন করে দেখানোর জন্য।

মিনা ফ্লাইভহম টড এর ফেসবুক স্ট্যাটাসঃ status