সকাল ৭ টা। হুইসেল বাজতেই ট্রেনে উঠে পড়লাম। সবার মধ্যেই কেমন চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। অনেকটা গোপনেই করা হয়েছে সকল আয়োজন। তবে এতো বড় একটা আয়োজন, সবাইকে না জানালে কি হয়? তাইতো ট্রেনে উঠেই শুরু হয়ে গেলো সেলফি উৎসব। একটা গ্রুপ সেলফি ফেসবুকে আপলোডও করে ফেললো খুর্শিদ রাজীব। তাতে ছোট্ট ক্যাপশন- ট্রাভেলিং টু সুন্দরবন। ব্যাস, ফেসবুক পাড়ায় জানাজানি হয়ে গেলো, আমরা ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি’র (রুরু) সদস্যরা সুন্দরবন ট্যুরে যাচ্ছি। বলে রাখা ভালো, আমরা যারা রুরুর সদস্য তাদের বেশির ভাগই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। 

 সুন্দরবনের পথে ট্রেনে রুরুর সদস্যরা সুন্দরবনের পথে ট্রেনে রুরুর সদস্যরা

সুন্দরবন ট্যুরের ব্যাপারটা সবাইকে হুট করে জানালেও আয়োজনটা হুট করে করা নয়। বেশ কিছু সদস্যের পরিশ্রম, সেই সাথে রুরুর সাবেক বড় ভাই, আপুদের দিক নির্দেশনা আর সহযোগিতায় আমাদের এই স্বপ্নযাত্রা। রুরু প্রতিষ্ঠার বেশ কয়েক বছর ধরেই একটা ট্যুর হবে এমন গুঞ্জন চলছিলো। তবে এবার সেটা সত্যি হয়ে ধরা দিলো।

সম্ভাব্য সকল উৎস্য থেকে টাকা কালেকশন করা হলো। এ ব্যাপারে রুরু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। আমরা প্রত্যেক সদস্য দিলাম মাত্র এক হাজার টাকা করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুন্দরবন। তাও আবার দুই দিনের (১৯-২০ এপ্রিল) ট্যুর। ভাবতেই কেমন ভালো লাগা কাজ করছিলো।

ট্যুর বিষয়ে বেশ কয়েকটি মিটিং করা হলো। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো সদস্যরা সবাই যাচ্ছি। শুধু তাই নয়, রুরুর সাবেক বড় ভাইদেরও সাথে পাচ্ছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কিছু ব্যক্তিগত কারণে চার জনকে রেখেই রওনা দিতে হলো। তারপরও আমরা ২২ জন একসাথে। ট্রেনের টিকিট আগেই কেটে রাখা হয়েছিলো। তাই সিট নিয়ে তেমন বেগ পেতে হলো না।

ট্রেন পাকশী ব্রিজের কাছে থামতেই সবাই কেমন উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। শত বছরের পুরাতন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। তার নিচে পদ্মা নদী আর সবুজের সমারোহ। এ যেনো এক স্বর্গপুরী। ভিডিও করার লোভ সামলাতে পারলাম না। ঝকঝক ট্রেন চলার শব্দ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখা। সব মিলিয়ে অজানা এক জগতে হারিয়ে যাওয়া।

শতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের অপরুপ সৌন্দর্যশতবর্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের অপরুপ সৌন্দর্য

 হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

 

ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করতে করতে সবাই যে কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো তা টের পেলাম ট্রেনে সবার আনন্দ দেখে। ট্রেনের ভেতর যেনো আনন্দের ফোয়ারা নেমেছে। কেউ সেলফি তুলছে, কেউ তা আপলোড দিচ্ছে। কেউবা আনমনে গুনগুন করে চলেছে। সকাল ৭ টা ১০ এ ট্রেন ছেড়েছিলো। তাই অনেকেরই নাস্তা করা হয়নি। ঈশ্বরদী জংশনে এসে রুটি আর কলা কেনা হলো। তাতেই যেনো জম্পেশ এক নাস্তা সারলাম সবাই।

দর্শনা জংশনে ট্রেন থামলো কিছুক্ষণ। এরপর হুড়মুড় করে একের পর এক যাত্রী উঠতেই থাকলো। নিমিষেই আমাদের বগি লোকে লোকারণ্য হয়ে গেলো। একটু পর জানা গেলো- ‘বরযাত্রী’ যাচ্ছে খুলনা। তারা সবাই মিলে ৪০ জন। আমাদের মধ্যে ফরিদ একটু বেশি ছেলেমানুষী টাইপের। ও তো বরকে ধরে নিয়ে আসলো আমাদের মাঝে। তারপর বরকে মাঝখানে রেখে শুরু করে দিলো সেলফি তোলা। ট্রেনে বরযাত্রী নিয়ে বিয়ে করতে যাওয়া আমাদের দেখা এটাই প্রথম। সবাই কিছুক্ষণ ঐ বরযাত্রী নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকলাম। আমরা কবে বিয়ে করবো, কোথায় করবো, কাকে কাকে দাওয়াত দিবো, কার বিয়েতে কে কি পারফর্ম করবো, আরো যে কতো গল্প। এ গল্পের যেনো শেষ নেই।

রাজশাহী থেকে খুলনা অনেক দূরের পথ। অনেকক্ষণ জার্নির পর সবাইকে কেমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তারপরও কেউ ঘুমিয়ে পড়েনি। কেউ তাস খেলছে। কেউ ফোনের গ্যালারি ঘেটে দেখছে। তবে কয়েক ঘন্টা জার্নির পর অপেক্ষার পালা শেষ হলো। খুলনা স্টেশনে পৌছে গেলাম। সবাই হুট করে ‘খুলনা’ ‘খুলনা’ বলে শ্লোগান দিতে লাগলাম কয়েকবার। বেশি এক্সাইটেড থাকলে যা হয় আরকি।

ট্রেন থেকে নেমে রুরুর সাবেকদের সাথে বর্তমান সদস্যরাট্রেন থেকে নেমে রুরুর সাবেকদের সাথে বর্তমান সদস্যরা

 

ট্রেন থেকে নেমেই রুরুর সাবেক বড় ভাইদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হলাম। এবার বড় ভাইদের সাথে সেলফি তোলার পালা। কতোদিন পর দেখা। কিন্তু সমস্যা বেধে যাচ্ছিলো এক জায়গায়। যেই ছবি তুলছে, সেই ছবি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। শর্টকাট বুদ্ধি- ক্যামেরার সেল্ফ টাইমার অন করে রেখে দেয়া হলো স্টেশনের বেঞ্চের হাতলে। ঝটপট কয়েকটা ছবি তোলা হয়ে গেলো।

এবার পেটকে শান্ত করার পালা। এতো ঘন্টা ট্রেন জার্নিতে সবাইকে কেমন ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছিলো। স্টেশনে আর দেরি না করে ঢুকে পড়লাম এক হোটেলে। হাত মুখ ধুতে যাবো আর তখনি একটু থমকে গেলাম। কেমন লবনাক্ত পানি। আগে শুধু শুনে এসেছি, এ অঞ্চলের  পানি লবনাক্ত। আজ তার প্রমাণ পেলাম। বাধ্য হয়ে বোতলের পানি কিনতে হলো। সবাই ইচ্ছামতো খাওয়া ধাওয়ার পর্ব সারলাম।

এরপরই অটোতে চেপে বসলাম। গন্তব্য সোনাডাঙা। সেখানেই আমাদের থাকার জন্য রুম ভাড়া করে রাখা হয়েছে। সাবেক বড় ভাইদের একটু বেশিই কর্মচঞ্চল মনে হলো। আমাদের জন্য সব কিছু কেমন রেডি করে রেখেছেন তাঁরা। আমরা শুধু আনন্দ করবো।

কয়েক মিনিটের মধ্যে সোনাডাঙা মোড়ে চলে আসলাম। আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করা হয়েছিলো এনজিও ফোরামে। প্রতি রাত দুই’শ টাকা করে দিতে হবে জনপ্রতি। প্রয়োজনীয় তথ্য এন্ট্রি করে যে যার রুম বুঝে নিলাম। এক রুমে তিনটা করে বেড। সবাই যার যার পছন্দ মতো রুমে উঠলাম। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অদম্য বাংলার পাদদেশে রুরুর সদস্যরাখুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অদম্য বাংলার পাদদেশে রুরুর সদস্যরা

 

ফ্রেশ হয়ে ঘন্টা খানিক বিশ্রাম নিয়ে রওনা দিলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে। কারণ মাত্র দুই দিনের ট্যুর। খুলনার কোনো স্পট বাদ দেওয়ার ইচ্ছা নেই। খুলনা বিশ্বদ্যিালয়ে পৌছে সবাই আবার ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ‘অদম্য বাংলা’র পাদদেশে গ্রুপ ছবি নিলাম। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েকজন ছোট ভাইয়ের সাথে আগেই ফেসবুকে কথা হয়েছিলো। ওদের সাথেও সাক্ষাৎ হয়ে গেলো। সাথে কয়েকটা ছবি। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাসটা ছিলো মনে রাখার মতো। এতো শীতল বাতাস। প্রাণ জুড়িয়ে আসে নিমিষেই। এরপর সবাই গেলাম শরবতের দোকানে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরবত নাকি খুব বিখ্যাত। অর্ডার দিয়ে গল্পে মেতে উঠলাম সবাই। কিছুক্ষণ পর একের পর এক শরবতের গ্লাস আসতে থাকলো। সত্যিই অসাধারণ খেতে। কেউ কেউ দুই গ্লাস শরবতও খেয়ে ফেললো। সব মিলে অসম্ভব সুন্দর একটা বিকেল কাটলো আমাদের। সারাদিন জার্নির পর এরকম একটা বিকেল খুবই দরকার ছিলো। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শরবতের দোকানে আমরা সবাইখুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে শরবতের দোকানে আমরা সবাই

তখন রাত হয়ে গিয়েছে। রাতের খাবার খেতে হবে। হঠাৎ করে, আনিসুজ্জামান উজ্জ্বল ভাই বলে উঠলেন, ‘রাতের খাবার নিয়ে কারো কোনো টেনশন করতে হবে না। সবাই আজ আমার বাসায় খাবে। তোমাদের ভাবী সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে।’ ভাই বেশ কয়েক বছর ধরে খুলনাতেই আছেন। এক সময় রাবি ক্যাম্পাসের তুখোড় সাংবাদিক ছিলেন।

অটোতে চেপে ভাইয়ের বাসার দিকে রওনা হলাম সবাই। যেতে যেতে সবার একই আলাপ। এতো জন মানুষের খাবার! ভাবী কিভাবে সব ম্যানেজ করবে! আমরা সদস্য ২২ জন। তার মধ্যে আমাদের কয়েকজন সাবেক বড় ভাই ভাইয়ের বাসাতেই উঠেছেন। সবাই আমাদের সাথে ট্যুরে ঘুরবেন। 

দেখতে দেখতে ভাইয়ের বাসায় পৌছে গেলাম। ভাবী খাবার রান্না করে আমাদের জন্যই বসে আছেন। সেখানে গিয়ে পরিচয় হলো আমাদের ডিপার্টমেন্টের সাবেক শিক্ষার্থী ন্যান্সি আপুর সাথে। উনিও খুলনাতেই আছেন। দারুন একটা খাওয়া দাওয়া হলো। খাসির মাংস, খিচুরি, দই সাথে মিষ্টি। আর কি লাগে?  

খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে এবার আমরা গল্পের হাটে পৌছে গেলাম। একই ডিপার্টমেন্টের সাবেক আর বর্তমানেরা এক জায়গায় হলে গল্পের বাঁধ কি আর ঠিক থাকে? নানা বিষয় নিয়ে গল্প। একটু পরপরই হাসির রোল পড়ে যাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা সময় এসে আমাদের থামতে হলো। রাত ১১টা বেজে গেছে। রুমে ফিরতে হবে। 

উজ্জ্বল ভাইয়ের বাসায় খাওয়া আর গল্পের ইতি টেনে এবার আমরা আবার এনজিও ফোরামে। যার যার রুমে। সারাদিনের ট্রেন জার্নি যেনো আমাদের একটুও দমাতে পারেনি। রাতে আরেক দফা আড্ডা হয়ে গেলো। সেই সাথে আগামীকাল কোথায় কোথায় ঘুরবো, কি কি করবো তার একটা প্লান করা হয়ে গেলো। যেহেতু খুলনার পানি লবনাক্ত তাই সবাই যার যার মতো বোতলের পানি আর স্যালাইন কিনে রাখলাম রাতেই।

সকাল হতে না হতেই সবার দরজায় নক করতে লাগলেন রুরুর সভাপতি শিহাবুল ইসলাম আর সাধারণ সম্পাদক হৃদয়। ট্যুরটা ভালোভাবে ম্যানেজ করার দায়িত্ব তাদের উপরই বর্তায়। সবাই যার যার মতো ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেলাম। রুম থেকে বের হয়েই চোখে পড়লো বাস। আমাদের জন্যই। এটাও বড় ভাইদের কারিশমা। আগে থেকেই ভাড়া করে রেখেছেন। সুন্দরবন যেতে হলে আগে মংলা পোর্ট যেতে হবে তাই। সবাই বাসে উঠে বসলাম।

বাসের সাইডে ট্যুরের ব্যানারটা টাঙিয়ে দেওয়া হলো। সাই সাই করের বাস চলতে লাগলো। খুলনায় যানজট কম, রাস্তাও নতুন। সব মিলিয়ে পঙ্খিরাজের মতো ছুটে চলতে লাগলো বাস। আর ভেতরে চলতে লাগলো সেলফি উৎসব। আমদের বড় ভাই মেহেরুল সুজন ভাইয়ের মতো রসিক মানুষ হয়না। বর্তমানে যমুনা টেলিভিশনের বগুড়া ব্যুরো প্রধান হিসেবে আছেন। ভাই আবার লালন সাঈজির খুব ভক্ত। লালনের একটা গান ধরে ফেললেন। সাথে গলা মিলালাম আমরা। সব মিলে জমে গেলো আসর।  একের পর এক গানের তালে তালে বাস এসে মংলা পোর্টে থামলো। সেখানে সবাই সকালের নাস্তা সারলাম।

মংলা পোর্টের উদ্দেশে চলতি বাসেমংলা পোর্টের উদ্দেশে চলতি বাসে

এবার নৌকায় চড়ে কাঙ্খিত স্পট দর্শনের পালা। এবারো বড় ভাইদের কারিশমা। নৌকা আগে থেকেই বুকিং করা ছিলো। উঠে পড়লাম নৌকায়। নদীর নাম পশুর নদী। ছোট বড় ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা এগিয়ে চললো। মূল নদীতে পৌছাতেই ঢেউগুলো যেনো দানবের আকৃতি নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছিলো।

এতো বড় বড় জাহাজ আমাদের অনেকেরই অদেখা ছিলো। দেখে নিলাম দুচোখ ভরে। এদিকে সেলফি উৎসব চলছেই। এর মধ্যে মেহেরুল সুজন ভাই ফেসবুক লাইভে চলে গেলেন। যেনো যমুনা টেলিভিশনে ভাইয়ের লাইভ রিপোর্ট চলছে সেই ভঙ্গিতে আমাদের ট্যুরের নানা রোমাঞ্চকর গল্পের বর্ণণা দিতে লাগলেন।

পশুর নদীর বাঁধভাঙা ঢেউ  পশুর নদীর বাঁধভাঙা ঢেউ  

নজরুলের তীরহারা সেই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিয়ে আমরা সুন্দরবনের পাড়ে এসে তরী ভিড়ালাম। যে জায়গাটায় আমরা নামলাম ওটার নাম করমজল পয়েন্ট। এক ঝাক বানর আমাদের সুন্দরবনে স্বাগত জানালো। বিনিময়ে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিলো পাউরুটি আর কলা। যা আমরা অবসরে খাবো বলে নিয়ে এসেছিলাম। সুন্দরবনে ঢুকতেই এমন অভ্যর্থনা পাবো ভাবিনি। বানরের কলা খাওয়া ভিডিও করতে করতে টিকিট কাটা শেষ হয়ে গেলো। দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছ থেকে পুরো সুন্দরবনের একটা সামগ্রিক ধারণা নিয়ে বনের ভেতর পা বাড়ালাম।

পশুর নদী থেকে সুন্দরবন দেখতে যেমনপশুর নদী থেকে সুন্দরবন দেখতে যেমন

করমজাল পয়েন্টে ঢুকে দেখলাম হরিণের খাঁচা। তাতে বেশ কিছু বন্দি হরিণ। এতো বড় বনে বন্দি হরিণ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উত্তর দিলেন, যেসব হরিণ অসুস্থ হয়ে পড়ে তাদের এখানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর একটা মস্ত বড় পুকুর।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি এবার নিজ থেকেই আমাদের কুমির দেখাতে চাইলেন। বেশ কয়েকবার হাত তালি দিলেন এবং ‘রোমিও’ বলে কয়েকবার ডাক দিলেন। ক্ষাণিক বাদেই রোমিও পুকুরের কিনারে চলে এলো। আস্ত একটা কুমির দেখে চোখ জুুড়িয়ে এলো। পাড়ে এসে কেমন হা করে রইলো। যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার না পাবে ততক্ষণ নাকি হা করেই থাকবে এই জলের রাজা।

সুন্দরবনের জলের রাজা ‘রোমিও’ সুন্দরবনের জলের রাজা ‘রোমিও’ 

একটা গল্প না বললেই নয়। আমাদের মাঝে মমিন একটু হিরো টাইপের। নায়কের মতো চেহারা তার। ছবি তোলার সময় পোজগুলোও তাই নায়কের মতোই। সুন্দরবনের মতো সুন্দর জায়গা পেয়ে তার ছবি তোলার যেনো কোনো কমতি না থাকে, সে জন্য একের পর এক নানা ঢঙে ছবি তুলেই যাচ্ছে।

খালের সাথে লাগোয়া একটা পুরনো গাছের গুড়িতে ঠেস দিয়ে ছবি উঠাচ্ছিলো। হঠাৎ করে পা পিছলে এক পা কাদাতে ডুবে গেলো। আমরা তো চোরাবালি ভেবে ভয় পেয়ে গেলাম। কি হবে এবার? আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনেকটা হিরোর স্টাইলে মমিন তার পা কাদা থেকে তুলে আনলো। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

কিন্তু, হিরোর হিরোগিরি বেশিক্ষণ টিকলো না। পা তুলতে পারলেও বেচারা জুতা তুলতে পারেনি। সুন্দরবনের কাদার কাছে এক হিরোর অসহায় পরাজয়ের দৃশ্য আমাদের একই সাথে ব্যাথিতও করলো আবার হাসির খোরাকও জুটালো। কিন্তু হিরোকে তো হারতে দেওয়া যাবেনা। সবাই নেমে পড়লাম জুতা উদ্ধার অভিযানে। হিরোকে সামনে রেখে আমরা সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলাম। দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। তবে আমরা হারিনি। বিজয়ের হাসিটা আমরাই হাসলাম। সফল জুতা উদ্ধার অভিযান শেষে আবার পা বাড়ালাম সুন্দরনের সুন্দরীদের (গাছ) দর্শনের উদ্দেশ্যে।

বন্ধু মমিনের জুতা উদ্ধার অভিযান বন্ধু মমিনের জুতা উদ্ধার অভিযান 


কাঠের তৈরি রাস্তা ধরে হাটতে লাগলাম সবাই। বেশি গভীরে যাওয়ার উপায় থেকেও নেই। সবাই একটু হলেও সতর্ক। তাই কাঠের রাস্তা ধরেই হাটতে লাগলাম আর নানা গাছ ও পশুপাখির গুনগান করতে লাগলাম। পুরো কাঠের রাস্তা ধরেই ছবি তোলার হিড়িক বয়ে গেলো। কাঠের রাস্তা থেকে নেমে বনের স্বাদ নিতে কয়েকজন অনেকটা ভেতরে চলে গেলাম। ‘বাঘ এলো, বাঘ এলো’ বলে চিৎকার করে মজা নিলাম সবাই।

আবার কাঠের রাস্তা ধরে হাটতে লাগলাম। লাল কাকড়াদের গুটিগুটি পায়ে হেটে চলা হৃদয় কেড়ে নিলো নিমিষেই। বনের ভেতর আরো কয়েকটা বানর খাবারের লোভে আক্রমণ করে বসলো। যেটুকু খাবার অবশিষ্ট ছিলো তাও ছিনিয়ে নিলো। ঘুরতে ঘুরতে আবার করমজল পয়েন্টে এসে থামলাম। 

এই কাঠের তৈরি পথ হেটেই ঘুরে দেখতে হয় সুন্দরবনএই কাঠের তৈরি পথ হেটেই ঘুরে দেখতে হয় সুন্দরবন

এবার শখ হলো বনের খাল ধরে ভেতরটা দেখার। যে নৌকা নিয়ে এসেছিলাম সেটা নিয়ে খালের ভেতরে ঢুকলাম। এবার নদীতে জোয়ার লাগলো। পানির স্তর কেমন আস্তে আস্তে উপরে উঠতে লাগলো। খাল, নদী কানায় কানায় পরিপূর্ণ হতে লাগলো। অনেকটা ভেতরে ঢুকে আবার সে পথেই ফিরে এলাম। আবার পশুর নদী ধরে মংলা পোর্টের দিকে যাত্রা আরম্ভ হলো। 

খালের দুই পাশের বনখালের দুই পাশের বন

 

মংলা পোর্টে নামতেই সবার যেনো ক্ষুধা পেয়ে বসলো। সুন্দরবন এলাম অথচ কিছু খেয়ে যাবোনা তাই কি হয়। একটা হোটেলে ঢুকে নদীর মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার মংলা পোর্টে আসলাম। এখানেই আমাদের বাস রাখা আছে।

সুন্দরবন ভ্রমনের পর্ব চুকিয়ে আমাদের বাস চলতে লাগলো চন্দ্রমহল ইকো পার্কের দিকে। ৫০ টাকা করে টিকেট কেটে সবাই ঢুকে পড়লাম পার্কে। অনেকটা গোছানো পার্ক। আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে বিভিন্ন মূর্তির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। সেই সাথে এ অঞ্চলের বিখ্যাত মানুষগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও প্রয়াস লক্ষ্য করা গেলো। মহান মুক্তিযদ্ধের বেশ কিছু মুহুর্ত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ফর্মে। পার্কের ভেতরে জাদুঘরে বেশ কিছু মূল্যবান স্মৃতিসংগ্রহও প্রশংসার দাবি রাখে।

 চন্দ্রমহল ইকোপার্কে চন্দ্রমহল ইকোপার্কে

এবারের গন্তব্য ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাস আবার সাই সাই করে চলতে লাগলো। মংলা পোর্ট থেকে বাগেরহাট। আনন্দের জোয়ারে অল্প সময়েই যেনো ষাটগম্বুজ মসজিদ পৌছে গেলাম। আমাদের সব সদস্যদের একরকম পাঞ্জাবি বানানো ছিলো আগেই। মসজিদে যাওয়ার আগে সবাই পাঞ্জাবি পড়ে নিলাম।

শুরুতেই ঢুকলাম বাগেরহাট জাদুঘরে। সেখানে মুসলিম ঐতিহ্যের নানা জিনিস মুহুর্তে যেনো সে সময়ে নিয়ে গেলো। এরপর ষাটগম্বুজ মসজিদে গেলাম সবাই। মসজিদের ভেতরটা এতই ঠান্ডা যে সারাদিনের সব ক্লান্তি এক নিমিষেই দূর হয়ে গেলো। বেশ কয়েকজন মসজিদের ছাদে উঠে গেলো গম্বুজ দেখতে। মসজিদের পেছনেই রয়েছে একটি সুবিশাল পুকুর। এতো বড় পুকুর যে ওপারে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

 

ছবি ১৪, ক্যাপশন: ষাট গম্বুজ মসজিদষাট গম্বুজ মসজিদ

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। খান জাহান আলীর মাজার দেখা এখনো বাকি। বাসে উঠে বসলাম। কয়েক মনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম মাজারে। মাজার জিয়ারত শেষে বিশাল পুকুরপাড়টায় বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম সবাই। কিছুটা সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই রওনা হলাম সোনাডাঙার উদ্দেশ্যে। রাত ১০টার দিকে এসে পৌছালাম। তবে একটা জিনিস কেমন অপূর্ণ অপূর্ণ লাগছিলো। খুলনা ঘুরে গেলাম অথচ ‘চুইঝাল’ খাওয়া হয়নি। এরকম বিখ্যাত খাবার তো কখনোই মিস করা যায় না। রাত্রি বেলা রুমে ফেরার আগে সবাই চুইঝাল খেয়েই রুমে ফিরলাম। 

ষাট গম্বুজ মসজিদ এ আমরা সবাইষাট গম্বুজ মসজিদ এ আমরা সবাই

আবার আড্ডায় বসে গেলাম সবাই। তবে এবার কেমন বিদায়ের সুর বাজতে লাগলো। স্বান্তনা এটুকুই যে সকালে কোনো ট্রেন নেই। বিকেলের ট্রেনেই ফিরতে হবে। অর্থাৎ, আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত ঘুরাঘুরির সময় পাওয়া যাবে। 

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে রুমে রেখে রওনা দিলাম হাদিস পার্কের উদ্দেশ্যে। যেটুকু সময় আছে তার একটুও অপচয় করতে চাই না। পুরোটাই উসুল করে নিতে চাই। পুরো হাদিস পার্ক ঘুরে দেখলাম। পার্কের পুকুরটা যেনো হৃদয় ছুয়ে যায়। অনেকটা বাইরের দেশের মতো ফিলিংস কাজ করে। পানির উপর ভর করে সগর্বে দাড়িয়ে থাকা শহীদ মিনারটা আরো বেশি আকর্ষণীয়। 

 শহীদ হাদিস পার্ক শহীদ হাদিস পার্ক

 

খুলনার এখনো একটা জায়গায় যাওয়া হয়নি। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। যেই ভাবা সেই কাজ। হাতে সময়ও অল্প। মাহেন্দ্রতে চড়ে কুয়েটের পানে ছুটে চললাম। হাদিস পার্ক থেকে ঘন্টা খানিকের মধ্যেই পৌছে গেলাম।

বেশ গোছানো ক্যাম্পাস। পুরো ক্যাম্পাসটা নিমিষেই ঘুরে ফেললাম। দুর্বার বাংলার সেই বীর সেনানীদের দেখে মনের ভেতর কেমন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। ভাস্কর্যটির ভালো ছবি তুলতে লাইব্রেরির তৃতীয় তলায় উঠে গেলাম। কয়েকটা ছবি আর সেলফি তুললাম।

কুয়েটের পুকুরে ফোটা পদ্মফুল যেনো সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। দেখতে দেখতে সময় ফুরিয়ে আসতে লাগলো। কুয়েটের ব্যতিক্রমী গেটে এসে বেশ কয়েকটা ছবি তুললাম সবাই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার রুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। 

 

আবার সবার কাধে যার যার ব্যাগ উঠে গেলো। তবে এবার আর ঘুরাঘুরির জন্য নয়। ক্যাম্পাসে ফেরার পালা। রেল স্টেশনে এসে বড় ভাইদের বিদায় জানিয়ে সবার সিটে বসে পড়লাম। অনেকটা ক্লান্ত বিবাগী পথিকের বেশে যেনো বাড়ি ফিরছি সবাই। কিন্তু কেউ আমরা অবসাদগ্রস্থ নই। সবার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয়েছে নানা রঙের বাহারী মণি মুক্তো যা আগামীর পথচলায় আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করবে।