বাস থেকে যখন মুন্নারে নেমেছি তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে, সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আর তাছাড়া পাহাড়ে তো এমনিতেই সন্ধ্যা একটু আগে আগে নেমে থাকে। বাস স্ট্যান্ডের রেলিং ঘেরা যাত্রী ছাউনিতে ওদের বসিয়ে রেখে হোটেল খুঁজতে গেলাম। ১৫-২০ মিনিটে মনের মত লোকেশন, বাজেট আর হোটেল একটাও না পেয়ে ফিরে এলাম।

২০০০ রুপীর নিচে কোন হোটেল নেই। আবার কিছু হোটেলে রুম পর্যন্ত খালি নেই জেনে অবাক হলাম। আমার অবাক হওয়া দেখে একজন বলল এটা মুন্নারের পিক সিজন। এখন সব হোটেল বুকড থাকে আগে থেকেই। এটা শুনেই ভয় পেয়ে গেলাম অনেকটা। তারাতারি ওদের কাছে ছুটে গেলাম, সন্ধ্যা হয়ে এলো বলে আর দ্রুত একটা হোটেল খুঁজে পেতে।

আসলে হয়েছে কি মুন্নারটা আমার প্রথম ট্যুর প্ল্যানে ছিলোনা বলে এটা নিয়ে কোন রকম স্টাডি করা হয়নি, যেটা আমি সাধারনত করে থাকি। যেটা যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সাহায্য করে। তাই রুম না পেয়ে অনেকটা চিন্তায় পরে গিয়েছিলাম, যেহেতু যায়গাটা একদম অচেনা, কোন রকম স্টাডি করা নেই।

দোকানে সাজানো নানারকম কফিদোকানে সাজানো নানারকম কফি

যদিও বন্ধু আকাশের পরিচিত এক রিসোর্ট এ কথা বলা ছিল। কিন্তু সেখানে যেতে হলে দিনের আলো থাকতে যেতে হবে, মুন্নার থেকেও প্রায় ১ থেকে ১:৩০ মিনিটের পথ! সেই পথে যাবার ঝুঁকি এড়াতেই মুন্নার শহরে হোটেলে খুঁজে ফেরা।

যাত্রী ছাউনিতে ফিরে একটা অটো নিলাম যে হোটেল খুঁজে দেবে, ভাড়া নেমে ৩০-৫০ রুপী। কাছেই অনেক হোটেল আর কটেজ আছে। কিন্তু অচেনা আর উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা বলে নিজেদের মত করে খুঁজে নেয়া অসম্ভব। তার উপর একাধিক ব্যাগ, সুটকেস আর সন্ধ্যা নেমে গাড় অন্ধকার হয়ে গেছে বলে। একটু এগিয়ে একটা পাহাড়ি ছোট্ট নদী পেরিয়েই তিনটি হোটেল পেলাম একই যায়গায়। যার কোনটির ভাড়াই ১৬০০ রুপীর নিচে নয় সেটাও জিএসটি বা ট্যাক্স ভ্যাট ছাড়া। ওগুলো ধরে ২০০০ রুপী!

অনেক চেষ্টা করে আর উপায় না দেখে শেষ মেশ ২০০০ রুপী দিয়ে এক রুম নিলাম। তাও যে দুটো হোটেলে পছন্দ হয়েছে সেগুলো নেয়া সম্ভব হয়নি তাদের নতুন হোটেল এখনো সিএসআর ফর্ম নেই, যে কারনে এখনো তারা বাংলাদেশী নিতে পারছেনা, পুলিশ সমস্যা করে। অবশেষে উপায় না দেখে কম পছন্দের হোটেলেই রুম নিতে হয়েছিল। তাই দু রাত না করে এক রাতের জন্যই ঠিক করেছিলাম। পরদিন সারাদিনে মুন্নার যতটা সম্ভব ঘুরে বিকেলে কোচিন এর বাসে করে কেরালা চলে যাবো।

পেস্তা, আমন্ড, এলাচি সহ নানা মসলা পেস্তা, আমন্ড, এলাচি সহ নানা মসলা

রুমে উঠে, ফ্রেস হয়ে, চেঞ্জ করে বেড়িয়ে পরলাম নীরব রাতের মুন্নারের পাহাড়ি পথে। আহ কি অদ্ভুত যে লাগছিল সেই সন্ধ্যাটা। গরম পানিতে গোসল করে, পাট ভাঙা গরম কাপড় পরে, মুজা আর কেডস পরে তিনজন হাতে হাত ধরে পাহাড়ি অন্ধকার কিন্তু শতভাগ নিরাপদ পথে হেঁটে চলেছি রাতের মুন্নার দেখতে। ঝলমলে শপিং মল, চা কফি আর চকলেটের শোরুম দেখে ডিনার করে ফিরবো বলে। রাত ৮:৩০ থেকে ৯ টা পর্যন্ত সবকিছু খোলা থাকে। এরপর হুট করেই সবকিছু বন্ধ হয়ে অন্ধকার হয়ে যায়, হোটেল থেকে জানিয়ে দেয়া হল। তখন সন্ধ্যা ৭:৩০, এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় আছে। এর মধ্যে ডিনার শেষ করতে হবে।

অন্ধকার পাহাড়ি পথে একে অন্যেকে ধরে থেকে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন ঝমঝম করে ঝরে পরা বা গড়িয়ে যাওয়া জলের শব্দ শুনতে পেলাম। একটু এগোতেই দেখি সামনে একটা ছোট্ট ব্রিজ। যেটা একটু আগে পেরিয়ে এসেছি। যানবাহন চলছে নিয়মিত। গাড়ির আলো পাহাড়ের ঢালে পরতেই চোখে পড়লো দুই পাহাড়ের মাঝে ছোট্ট এক খরস্রোতা নদী। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এই নদীর উৎস যে ঝর্না থেকে সেটা খুব বেশী দূরে নয়। একটু পাহাড়ে উল্টো পাশে গেলেই তার দেখা মিলবে এবং সেটা বেশ বড়ই হবে। ইস যদি এই রাতেই একদল রোমাঞ্চ প্রিয় সঙ্গিসহ বেড়িয়ে পরা যেত, ওই ঝর্না বা এই নদীর শুরুর কাছে! সেই ইচ্ছা নিজের মাঝে রেখেই ব্রিজ পেরিয়ে গেলাম।

দারুণ ব্যাস্ত কাবাবের দোকানদারুণ ব্যাস্ত কাবাবের দোকান

বাজারের কাছে গিয়েই খোলা ভ্যানে করে নানা রকম খাবার বিক্রি করতে দেখলাম। ওখানেই অর্ডার করলে বানিয়ে দিচ্ছে একদম ফ্রেস। আমরা পরাটা আর ওমলেট অর্ডার করলাম। খাওয়ার শেষ পর্যায়ে এসে জানলাম এখানে বিফ কাবাব পাওয়া যায়! শুনেই তো জিভে জল আর ছেলের ইচ্ছামত নিলাম একটা বিফ কাবাব। দারুন ভিন্ন স্বাদের টেস্ট ছিল সেই বিফ কাবাবের। এতোই ভিড় ছিল সেই ভ্যানের চারপাশে যে তিনজন মিলে খাবার দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছিলনা। অন্যপাশে তো একাধিক ভ্যান তো ছিলই একই রকম খাবারের সাপ্লাই দিতে। তিনজন মিলে ১৭০ রুপী খাবারের বিল দিয়ে উঠে পরলাম যতক্ষণ খোলা থাকে মুন্নার শহর দেখে বেড়াতে।

কি ঝলমলে এক একটা দোকান, চায়ের ফ্যাক্টরি আউটলেট, কফির বিক্রির দোকান, চকলেটের নানা রকম দোকান আর ভিন্ন রকম চকলেটের বিকিকিনি। এক একটা দোকানে ঢুকি আর চা, কফি, চকলেটের গন্ধে প্রান ভরে যায়। এতোই বিশুদ্ধ সেই গন্ধ, মনে হচ্ছিল মুখ হা করে রাখি আর বুক ভরে বিশুদ্ধ খাটি কফি আর চকলেটের গন্ধ নিয়ে নেই যতটা পারি। আর চোখে পড়লো অন্য রকম এক সাবানের আয়োজন, পাতা আর কোন একটা গাছের বাকলের মধ্যে আয়ুর্বেদিক সাবানের সমারোহ।

আয়ুর্বেদিক সাবান আয়ুর্বেদিক সাবান

চা, কফি, সাবান আর বহু রকমের চকলেটের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল এক একটা বর্ণিল দোকানে নানা রকম বর্ণিল চকলেট দেখাটা। সেটাও চকলেটের প্যাকেট নয়, একেবারে র চকলেট। কেজি ধরে বিক্রি হচ্ছে। সাদা, লাল, কফি, আর রঙ বেরঙের নানা রকম চকলেট। গামলায় গামলায় সাজিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। দেখেই মন ভরে গেছে। আর মানুষ কিনেছেও দেদারছে!

বেশ অনেকক্ষণ ধরে এসব ঝলমলে দোকানে ঘুরে ঘুরে, দেখে দেখে যখন দোকান গুলো বন্ধ হবার পথে তখন আমরাও ফেরার পথ ধরেছিলাম। আবারো সেই পাহাড়ি পথ, রাতের অন্ধকার, নদীর কলরব, অরন্যে জোনাকি, রাত জাগা পাখির ডাক, জমে থাকা বৃষ্টি ফোঁটার ঝরে পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে, যে যার মত করে একে অন্যের হাত ধরে, গান গাইতে গাইতে।

কেজি দরে বিক্রি হয় এই খোলা চকলেট কেজি দরে বিক্রি হয় এই খোলা চকলেট

ছেলে গুনগুন করছিল ওর মত করে, আর আমি ছেলের মায়ের সাথে, পাহাড়ের গায়ে, অরন্যের আড়ালে, চাঁদের জ্যোৎস্না দেখে হেঁড়ে গলায় সুর ধরেছিলাম,

এমনি করে যায় যদি দিন যাকনা.....