যেহেতু আমাদের ট্রেন কেরালা পৌছাবে সেই সকাল ১০ টার পরে, তাই এটা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। পরিবার সাথে থাকলে যা হয় আর কি। ট্রেন থেকে নেমে, সারারাতের জার্নির ক্লান্তি ঝেড়ে একটু ফ্রেশ হওয়াটা খুব জরুরী হয়ে পরে। বিশেষ করে একটা ভালো গোসল দিতে না পারলে তো পরের জার্নি করাটা আরও মুশকিল বা কঠিন হয়ে যায়। তার উপর যদি হয়, জুনের ৩৬-৩৮ ডিগ্রী গরম আর সামনে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় ৪-৫ ঘণ্টার জার্নি।

একটা হোটেল কিছু সময়ের জন্য পাওয়া বেশ কঠিন। আবার অল্প সময়ের জন্য পাওয়া গেলেও বেশকিছু টাকা গুনতে হবে। কি করি, কি করি? ট্রেনে বসে বসেই ভাবছিলাম। এই ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতেই ট্রেন কখন যেন ঝড়ের গতিতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩০ মিনিট আগেই ইরনাকুলাম স্টেশনে এসে থেমে গেল! ট্রেন থেকে নেমে একটু ছায়ায় দাড়িয়ে চায়ের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানলাম এক নাম্বার প্লাটফর্মে এসি রেস্ট রুম আছে। এটা জেনে আর এক নাম্বার প্লাটফর্ম কোনদিকে জেনে নিয়ে সেদিকে টুকটুক করে হেটে যেতে শুরু করলাম।

 

ঝকঝকে ইরনাকুলাম স্টেশনঝকঝকে ইরনাকুলাম স্টেশন

চলমান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে অন্যদিকের এক নাম্বার প্লাটফর্মে গেলাম। এসি ওয়েটিং রুম কোথায় জানতে চাইলে, জিজ্ঞাসা করলো, পেইড না আনপেইড কমন ওয়েটিং রুম? দুটোই জেনে নিলাম আর দেখলাম পেইড যেটা সেটা একদম যেখানে নেমেছি সেখানেই। আগে একটু ঢুঁকে খোঁজ নিয়ে নেই আর দেখে নেই কেমন সেই ওয়েটিং রুম, যেখানে পে করে অপেক্ষা করতে হয়? এই ভেবে ওদেরকে বাইরে দাড় করিয়ে রেখে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুঁকেই তো অবাক!

একি? এটা কি কোন ওয়েটিং রুম? এটাতো কোন বনেদী বাড়ির ড্রইং রুম বা তার চেয়েও বিলাসবহুল ব্যাপার! কত না যেন দাম হবে এই যায়গায় অপেক্ষা করতে হলে কে জানে?

তবুও সামনে বিশাল টেবিল, একপাশে ছোট্ট লাইব্রেরী, আর দারুণ চেয়ারে বসা ভদ্র মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে অপেক্ষা করার সিস্টেমটা কি রকম আর কি কি সুবিধা আছে? মানে ওয়াশরুম, স্নানের ব্যবস্থা আছে কিনা আর সেজন্য কত কি পে করতে হবে? এসব। কিন্তু তিনি যেটা বললেন সেটা ঠিক বিশ্বাস হলনা বা আমি ঠিক শুনলাম কিনা বুঝতে পারলাম না! তাই আবারো জিজ্ঞাসা করলাম? এরপর তিনি আমাকে ছোট্ট চাট দেখিয়ে দিলেন, যেখানে সবকিছু লেখা আছে। যা দেখে আমার চক্ষু প্রায় চড়ক গাছে! ২৫ রুপীর বিনিময়ে এক ঘণ্টার হিমশীতল ঘরের নরম আর বিশাল সোফায় বসা বা ঘুমানো।

ওয়েটিং রুমওয়েটিং রুম

তবে এখানে বিশ্রাম নেবার একমাত্র শর্ত হল, ট্রেনের টিকেট কনফার্ম থাকতে হবে। হ্যাঁ আমাদের সেটা আছে। কোনটা লাগবে যেটায় এলাম সেটার না কি তিনদিন পরে যেটায় যাবো সেটার? একটা হলেই হবে ব্যাস। এটা জেনে খুশিতে আটখানা নয় শোল খানা হয়ে ঝটপট ওদেরকে বাইরে থেকে ভিতরে নিয়ে এলাম, সাথে আমাদের ব্যাগপত্র। তিনজনের টিকেট দেখিয়ে এক ঘণ্টার জন্য ২৫ রুপী করে জনপ্রতি দিয়ে টোকেন নিলাম।

হিম ঠাণ্ডা রুমে বসে একটু রেস্ট নিয়েই ছুটলাম ফ্রেস রুমে। মাঝে জেনে নিলাম এরজন্য কোন পে করতে হবে কিনা আলাদা করে? না করতে হবেনা, এমনকি গোসলও করা যাবে সাধ মিটিয়ে। ওয়াও! ফ্রেস হতে গেলাম বাপ-বেটা মিলে। ওরে বাপ কি ওয়াশ রুম, যেমন বড় তেমন ঝকঝকে আর আরাম দায়ক। সেই সাথে আলাদা শাওয়ার রুম, সাথে ঠাণ্ডা আর গরম পানির ব্যবস্থা। আহ আর কি চাই? ছেলেকে বসিয়ে ছেলের মাকে ঝটপট খবরটা দিয়ে এলুম! তখন মনে পরে গেল সেই প্রিয় উক্তি “অন্ধকারে যারা বাস করে, মৃদু আলোয় তাদের চোখ ঝলসায়!” আমাদেরও তাই হয়েছিল। না হয়েই বা উপায় কি? আমরা তো এমন করে ভাবতেই পারতামনা, যে একটা স্টেশনে এমন রাজকীয় ব্যাপার থাকতে পারে, তাও মাত্র ২৫ রুপীর বিনিময়ে!

ওয়েটিং রুমের ওয়াশরুমওয়েটিং রুমের ওয়াশরুম

যে যার মত করে ফ্রেস হয়ে, গোসল করে একদম সকল ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আরাম করে নরম সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। কিছু সময় নরম সোফায় এলিয়ে থেকে উঠলাম। কোথায় কি খাবার পাওয়া যায় খুঁজে দেখার জন্য। বাইরে বেরিয়েই বাম পাশে দেখি দারুণ এক অভিজাত রেস্তোরা কাছের দেয়ালের ভিতরে। দেখেই কিছুটা কুঁকড়ে গেলাম, এই রেস্তোরা তো আমার জন্য নয়। নিশ্চয়ই অনেক দাম হবে, যে ডেকোরেশন আর ভাবসাব। ভিতরে না ঢুঁকে ফেরত আসবো, তবুও ভাবলাম, নাহয় একবার ভিতরটা দেখেই আসি আর মেন্যু কার্ডটা দেখে আসি, কোনটার কত দাম? কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে ঢুঁকে পড়লাম। যা হোক আমার উপর দিয়েই হোক, ছেলে আর মায়ের কাছে অপদস্থ না হলেই বাঁচোয়া! আর এখানে তো আমাকে আর কেউ চেনেনা!

রেস্তরার ভিতরের পরিবেশরেস্তরার ভিতরের পরিবেশ

ভারী কাছের দরজা ঠেলতে গিয়েই, দেখি ওপাশের দারোয়ান সেটা খুলে দিয়েছে! কিছুটা ভয়ই পেয়ে গেলাম, এটার জন্য না আবার বিলটিল দেয়া লাগে, আল্লাহই জানে! একটু এদিক সেদিক তাকিয়ে সেই পুরনো ছালা দিয়ে হোটেলের সঙ্কোচ নিয়েই একটি মেন্যু কার্ড হাতে নিলাম। মেন্যু কার্ডে চোখ বুলিয়ে তো মাথা খারাপের জোগাড়! আমি কি ঠিক দেখছি না চোখে কোন গণ্ডগোল হল? মাছ-ভাত আর কারী মিলে ১২০ রুপী! একটা আণ্ডাকারী আর ভাত ৭০ রুপী (ডাবল ডিমের কারী), একটা খাবারেই দুজনের আরামে হয়ে যায়। সাথে দুইটি করে রুটি আছে! ঝটপট বেরিয়ে গেলাম, ওদেরকে নিয়ে আসতে।

৭০ রুপীর আণ্ডা কারী, রাইস মিল আর ১৩০ রুপীর চিকেন বিরিয়ানি৭০ রুপীর আণ্ডা কারী, রাইস মিল আর ১৩০ রুপীর চিকেন বিরিয়ানি

ব্যাগপত্র নিয়ে ইরনাকুলাম স্টেশনের উপরেই, লাগোয়া কাছের ঝকঝকে রেস্তোরায় ঢুঁকে পড়লাম। ছেলের জন্য চিকেন বিরিয়ানি ১৩০, আর আমাদের জন্য আণ্ডাকারী ভাতের প্যাকেজ অর্ডার দিয়ে রেস্তোরাটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। ইস কি সুন্দর ঝকঝকে, তকতকে, পরিচ্ছন্ন, চারদিকে কাছের দেয়াল, ভিতরের আসবাবএ আধুনিকতা আর আভিজাত্যের ছোঁয়া, দেখে, হেটে আর বসেই মন ভালো হয়ে যায়। টার উপর খাবারের দাম যদি হয় এমন সাধ্যের মধ্যে, তবে তো আর কথাই থাকেনা। খুশি আর মন ভালো হওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

১৩০ রুপীর ফিস কম্বো মিল! ১৩০ রুপীর ফিস কম্বো মিল!

কেরালায় এসেই, একটা স্টেশনেই এমন ব্যবস্থা, আর আরাম আয়েশের সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে, সবাই দারুণ খুশি হয়েছিলাম। যেটা আমাদের কাছে আতিথিয়তার মতই লেগেছে। স্টেশনের আতিথিয়তা। আমাদের কাছেই তো তাই-ই।

স্টেশনেই আতিথিয়তা।