বাটপার সব যায়গাতেই আছে। কম আর বেশী। আর সে যদি হয় জনপ্রিয় কোন টুরিস্ট স্পট তবে তো কথাই নেই। হোক সে দেশ আর বিদেশ। আর আমার বিদেশ বলতে তো শুধু মাত্র পাশের বাড়ির আঙিনা ভারত! তো গোয়ার অনেক অনেক সুনাম শুনে মনে করেছিলাম যাক, এখানে অন্তত দিল্লী, আগ্রা, কাশ্মির আর শিলিগুড়ির মত বাটপার নিশ্চই থাকবেনা। কিন্তু না আমার ধারনা ভুল প্রমান করে, ব্যাটা নর্থ গোয়া ট্যুরের ড্রাইভার ডলফিন পয়েন্ট থেকে ফেরার পরে বলে কিনা এখন স্নো আইল্যান্ডে যাবে।

আমি সাথে সাথে খপ করে ধরলাম। কেন আমাদের যে ফোরট এগোনডা বা প্রাচীন দুর্গ দর্শনে যাবার কথা ছিল ট্যুরের মধ্যে? ব্যাটা বলে কিনা সময় নষ্ট হবে। এখানে সময় নষ্ট না করে স্নো আইল্যান্ডে বেশী সময় কাটানো যাবে। রাখো মিয়া তোমার স্নো আইল্যান্ড, দরকার হয় যাবোনা ওখানে কিন্তু দুর্গ কিছুতেই মিস করা যাবেনা। আর তার চেয়েও বড় কথা সেই দুর্গ তো দূরে কোথাওনা। সমুদ্র থেকেই সেই দুর্গ দেখা গেছে, তাহলে পাড়ে এসে কেন ভাওতাবাজি? সাথে আরও একজন গলা মেলাতে দুর্গর পথ ধরলো।

ব্যাটা আমার সাথে বাটপারি? তোমার মত বহু বাটপার পারি দিয়েছি দিল্লী, সিমলা, মানালি, লাদাখ, কাশ্মীরে, লাইনে আসো। সোজা দুর্গে নিয়ে চল, যেমন কথা আছে। মাত্র ১০ মিনিটেই পাহাড়ের কিছুটা চড়াই পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম আরব সাগরের পাড়ে ১৬১২ শতাব্দীর এক প্রাচীন লাল দুর্গের দুয়ারে। পর্তুগিজরা এটা তৈরি করেছিল মূলত ডাচদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে, ভারত মহাসাগরের ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করতে।

 

 

যদিও কালের আবর্তে আর পরিস্থিতির বিবেচনায় এই প্রাচীন দুর্গ কখনো লাইট হাউজ, কখনো জেল, কখনো পানি শোধনাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন যেটা শুধু পর্যটক আকর্ষণ আর মাঝে মাঝে সমুদ্রের লাইট হাউজ হিসেবে ব্যাবহার হয়ে থাকে।

গোয়ার ৩৮ ডিগ্রী তাপমাত্রায়, লাল ভাঙা ইটের, ধুলো ওড়া পথ মারিয়ে দুর্গের মুল ফটকে প্রবেশ করতেই, প্রাচীন আমলের কয়েদখানা। যেটা দুর্গের মাঝের অংশ। এর নিচেও রয়েছে বিশাল আর একটা অংশ যেখানে মূলত পানি শোধনাগার বা পানি সংরক্ষণের কাজ করা হত, যুদ্ধ বা অন্যান্য সময়ে আরব সাগরে চলাচলকারী পর্তুগিজ জাহাজে পানি সরবরাহ করতে। এখনো হয় কিনা জানা হয়নি। তখন আমরা মাটির সমতল থেকে প্রায় একতলার সমান নিচে দাড়িয়ে, এর নিচে আছে একাধিক তলা আর উপরে তো আছেই।

নিচের দিকে আর যাওয়ার সুযোগ নেই, নেই সময়ও তেমন। তবে উপরের দিকে যাওয়ার জন্য একই রকম লাল ইটের এবড়ো থেবড়ো পথ রয়েছে। সেদিকে ছুটলাম অল্প সময়ে যতটা দেখে নেয়া যায়। সোজা উপরে উঠে গেলাম সিঁড়ি বেয়ে, যতটা উপরে ওঠা যায়। সিঁড়ি শেষ করে খোলা যায়গায় দাড়াতেই চমক! লোহার রেলিং দেয়া নিরাপত্তা বেষ্টনির ওপাশে চোখে যেতেই বিস্ময়ে হা হয়ে গেলাম! আরে পুরো আরব সাগর যে নীল হয়ে আছে নিচের দিকে! হু হু বাতাসে উড়িয়ে নেবার জোগাড় আমাকে আর পুত্রকে! কোন ভাবেই ছবি তোলার লোভ সামলাতে না পেরে, নিজেই নিজের মোবাইল দিয়ে ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। সবাই যাকে সেলফি বলেন আর কি?

ছেলেকে বললাম, বাবা আমার ছবি তুলে দে কয়েকটা? ছেলে আসলে গরমে অস্থির হয়ে গেছে। আঁকা, বাকা কয়েকটা ছবি তুলল ঠিকই, কিন্তু তাতে আমি তৃপ্ত হতে না পেরে, শেষে পাশের এক জুটির দ্বারস্থ হলাম হিন্দি আর ইংরেজির মিশ্রণে। বেশ, তারা কয়েকটা ছবি তুলে দেয়ায় একটু স্বস্তি পেলাম।

ভাবলাম রেলিং ধরে দাড়িয়ে একটু নিচের নীল সমুদ্র দেখি আর মাতাল করা বাতাস খাই। ওদিকে ফিরতেই দেখি ছেলে নাই! মেজাজটা কেমন লাগে? এই জন্যই, এই জন্যই মাঝে মাঝে একা, একদম একা বের হওয়া উচিৎ। নিজের মত করে পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজ উপভোগ করতে হলে। কি আর করার রেলিং এ হেলাম দিয়ে, আরাম করে সমুদ্রের বাতাস খাওয়া বাদ দিয়ে ছুটলাম ওর পিছে পিছে।

 

 

ভীষণ দুষ্টু আর দারুন চঞ্চল ছেলে কি আর এক যায়গায় থামে? একটু ছবি তুলবো দুর্গের সেই উপায় আর রইলোনা। তবুও হাটার মধ্যেই ক্যামেরা আর মোবাইলে ক্লিক ক্লিক করে চলেছি, যতটুকু যা ওঠে। ছেলের মা আগেই বলে দিয়েছে, সে উপরে উঠবেনা। তাই আমাকেই চোখে চোখে আর হাতে হাতে রাখতে হচ্ছে উড়ন্ত ছেলের লাগাম। দুর্গের কিনারা দিয়ে ক্ষীণ রাস্তা দিয়ে অপর পাশে যেতে যেতে চোখে পড়লো নিচের দিকে পুত্রের মাতা হাজির। নাহ আমাদের কাছে নয়, নিজের সেলফি তোলায় সে ব্যাস্ত! এতেই আমি কিছুটা স্বস্তি বোধ করলাম, কারন দুরন্ত ছেলে, উড়ে উড়ে মায়ের দিকেই যাচ্ছে। যাক আমি তবে একটু ছবি তোলায় মনোযোগ দেই।

ছেলে মায়ের হাতে পৌঁছে যাওয়াতে আমি বেশ ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম, চারদিকের দুর্গের ছবি তুলতে তুলতে। ভালো করে চোখে মেলে তাকালাম প্রথমবারের মত। আরে এ যে বিশাল এক মাঠের চেয়েও বড় ইট পাথরের ছাদ। নিচে একটা আলাদা উঁচু পাটাতনের মত, যার উপরে ছোট ছোট বেদী বা গুহার মত কোন কিছু। এমন ভাবেই করা যে, কোথায় যে শুরু আর কোথায় যে শেষ সেটা বোঝা মুশকিল। শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট ভালো ব্যবস্থা।

সরু ইটের পথ পেরিয়ে নিচের বিশাল পাথরের ছাদ বা লাইট হাউজের আঙিনায় চলে এলাম। সবাই যে যার মত করে ছবি তোলায় ব্যাস্ত। নানা আকার আর প্রকারে। কিন্তু আমার চোখ তখন আর একটু দূরে, ইটের দেয়ালের সাথে সারি সারি মানুষ দাড়িয়ে দূরে কি যেন দেখছে? ছুটে সেখানে চলে গেলাম, ছেলেকে তার মায়ের হাতে সপে দিয়ে। মানুষের ভিড় থেলে আবারো সরু ইটের পথের উপরে দাড়িয়ে, ইটের দেয়াল থেকে তাকাতেই দেখি হাওয়ার প্রলেপ লাগলো গায়ে! কোথা থেকে এলো এই গরমে, তপ্ত রোদে হুট করে ঠাণ্ডা হাওয়া?তাকিয়ে দেখি আরে সর্বনাশ এখানেও সমুদ্র! সেই নীল জলরাশি, রাশি রাশি, যতদূর চোখে যায় শুধু নীল নীল আর নীল জলরাশির আঁধার।

অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থেকে দেখছিলাম নিচের নীল জলে ছোট ছোট রঙিন পিঁপড়ার মত ধীরে ধীরে, ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চলেছে স্পীড বোট, বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা, যা দুরে একটা সবুজ দ্বীপে যাচ্ছে, যেটার নাম হানিমুন আইল্যান্ড। সময়ের অভাবে সেখানে যেতে না পারার আক্ষেপ সাথে করেই ফিরে আসতে হয়েছিল।

যেটুকু সময় ইট পাথরের ওই দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম, মনপ্রান ভরে শুষে নিয়েছি, উন্মুক্ত আরব সাগরের অপরূপ সৌন্দর্য। যা আপনার চোখ, চেতনা আর বোধকে বিলুপ্ত করে দেবে। আপনি অপলক তাকিয়ে থাকবেন সেদিকে।

 

 

চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করবেনা, কোন কথা বা শব্দ করতে ভালো লাগবেনা, কিছু শুনতে মন চাইবেনা। শুধু ইচ্ছে হবে অপলক তাকিয়ে থাকতে, প্রান ভরে নীল জলরাশি ছুঁয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস বুক ভরে নিতে,দুর্গ যে পাহাড়ের গায়ে দাড়িয়ে আছে, সেই পাহাড়ের সবুজের দিকে ইচ্ছে হবে হাত বাড়াতে, কখনো ইচ্ছে হবে দুর্গের রুক্ষতা ভেঙে, পাহাড়ের সবুজে গড়িয়ে, সমুদ্রের হাওয়ায় ভেসে, নীল জলে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে, ভেসে-ভেসে, ডুবে-ডুবে, নিজেকে হারাতে।

ফিরে আসার সময়, মনে মনে বলছিলাম ইস, ব্যাটা বাটপার ড্রাইভারের কথামত যদি এখানে না আসতাম, তবে কি মিসটাই না করতাম! আর আমার মনে সুর তুলেছিল এই গান...

যদি আর একটু সময় পেতাম...