সম্প্রতি শামীম হাসান ভ্রমণ করেছেন ভারতের কাশ্মীরে। ভ্রমণ মানেই টক-ঝাল-মিষ্টি স্মৃতি আর বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। কাশ্মীর ভ্রমণে শামীম হাসানের ভান্ডারে জমা হয়েছে মধুর কিছু স্মৃতি, কিন্তু পোহাতে হয়েছে কিছু বিড়ম্বনাও! অনুভ্রমণ এর পাঠকদের জন্য লিখেছেন তিনি সেইসব অভিজ্ঞতা, যাতে বিদেশ বিভুইয়ে আপনাকে না পড়তে হয় একই পরিস্থিতি তে।

শামীম হাসানের জবানী তে সেই নানা স্মৃতিতে উজ্জ্বল কাশ্মীর ভ্রমণের ১ম কিস্তি পড়ুন এখানে।  

লেখাঃ শামীম হাসান 

মার্চ ২৫, ২০১৮: এইদিনেই শুরু হয় আমাদের কাঙ্ক্ষিত কাশ্মীর ভ্রমণ এর। অফিস শেষে সপরিবারে চিত্রা এক্সপ্রেসে সরাসরি যশোরের ঊদ্দেশ্যে যাত্রা করি। আমার স্ত্রী বাসা থেকেই রাতের খাবার সাথে নিয়েছিল, ফলে রাতের খাবারের জন্য বাড়তি কোন খরচ করতে হয়নি। ট্রেনের ভাড়া ছিল ৳ ৮৯৪ করে জন প্রতি। আমার ৬ বছরের ছেলে আড়িলের ভাড়া আরও কম লেগেছিল।

মার্চ ২৬, ২০১৮: রাত প্রায় ৩টায় যশোর এ ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে বাসে উঠি, উদ্দেশ্য বেনাপোল গমণ-ভাড়া জন প্রতি ৬০ টাকা। ভোরে বেনাপোল নেমে ৫০ টাকা রিজার্ভ ভাড়ায় অটোরিক্শায় বেনাপোল স্থলবন্দর যাই । ট্রাভেল ট্যাক্স জন প্রতি ৳৫০০.০০ সোনালী ব্যাংক , মতিঝিল শাখায় আগেই জমা করে ও ইমিগ্রেশন ফরম পূরন করে নিয়েছি। এখানে শুধু অপেক্ষা কখন বাজে ৭ টা....।

কোন সমস্যা ছাড়াই বাংলাদেশ এর ইমিগ্রেশন শেষ করে ইন্ডিয়া যেয়েই পড়লাম ভেজালে। এখান থেকে শুরু হল আমার আক্কেল সেলামী দেওয়া।

আক্কেল সেলামী নম্বর- ১ ঃ আমাদের তিনজনের পাসর্পোট এ তিনটা এন্ডোস এ মোট ৬০০ ডলার এন্ডোর্স করা , আর সাথে রয়েছে ৩৫০ ডলার। কিছুতেই বুঝাতে পারলাম না যে আমার পাসর্পোটে আর ভিসা কার্ডে  ৫০০০ ডলার এন্ডোস রয়েছে। যিনি বুঝবেন না বলে সিদ্ধান্তে নিয়েছেন তাকে বোঝানো অসম্ভব! ওদের দিলাম ৪০০ টাকা আর যেখানে ফর্ম ফিল আপ করে বেতালে ওখানে দিয়ে দিলাম ১০০ টাকা অথচ ১০ দিলেই হতো। শিখলাম: ডলার এন্ডোস করলে সমপরিমান ডলার ক্যাশ অবশ্যই সাথে রাখতে হবে।

বআক্কেল সেলামী নম্বর- ২ ঃ হরিদাসপুর ইমিগ্রেশন শেষ করে গেটে কাছে আসতেই ‘দাদা শুনুন, এদিকে আসুন দেখি পাসর্পোট’  বলে পাসর্পোট কেড়ে নিয়ে, চলুন আমার সাথে - এন্ট্রি করে দিচ্ছি । মনে হল কোন অপরাধ করেছি। তারপর ডলার ভাংগালাম, রিসিট নিলাম ও ২০০০ টাকা ধরা খেলাম । শিখলাম: সকালে একা ইন্ডিয়া ইমিগ্রেশন গেইট থেকে বের হওয়া নিরাপদ না। ইমিগ্রেশন গেইট এর ভিতর/কলকাতা থেকে ডলার ভাংগানো ভালো।

তারপর অটো নিয়ে বনগাঁ রেল স্টেশন ভাড়া ১০০ টাকা। অনাকাংখিত ২টি ভেজাল এর পর সবুজ স্নিগ্ধতায় ভরপুর সকাল- যশোর রোডে অটো চলছে আর অসহায় আমি ছেলেকে অভয় দিয়ে বলি দেখ কি সুন্দর! বউকে স্বান্ত্বনা দেই, বলি- ওরা এমনি করে থাকে। বাংগালরা অসহায় ও বোকা এদেশে।

আক্কেল সেলামী নম্বর- ৩ ঃ ষ্টেশনে ৬০ রুপি দিয়ে রুটি, ডিম, আলুরদম ও চা খেয়ে পরের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আমরা। যাবো অনেক দূর, থামলে চলবে না। ৫০ রুপি দিয়ে উঠে পরলাম বনগাঁ এক্সপ্রেসে লোকাল ট্রেনে। উঠে লাগেজ গুলি সীটের নীচে ঢুকিয়ে রাখলাম যাতে অন্যদের বিরক্তি না ঘটে। লক্ষ্য দমদম স্টেশন, সময় লাগবে ২ ঘন্টা কিন্তু না, নামবো শিয়ালদহ স্টেশনে। পরিকল্পনা মাফিক এগুচ্ছি কিন্তু পারছি না। আমাদের দেশে ব্ল্যাকহোল খ্যাত তুরাগ ট্রেনে যারা উঠেন তারা অনেক চাপাচাপি করে যাতায়াত করেন কিন্তু মুখামুখি সিটের মাঝে ফাঁকা থাকে-কখনো মহিলারা দাড়ান বটে। আর এখানে এই জায়গায়টুকুতে কমকরে হলেও ১০ জন দাড়িয়েছেন আর সবার হাতে ডিব্বা (লাঞ্চ) আর তা রডে ঝোলানোর জন্য ছোট রডের এংকর । এই ভীড়ের মধ্যে দাদারা প্রাণ খুলে হাসছে , কথা বলছে, মুখে থেকে মধু বের হচ্ছে - City of Joy এমনি এমনি হয়নি ! কিন্তু এক বিন্দু ছাড় রাজী নন দাদাবাবুরা। “ওদাদা ওখানে কি !- আরেক জন বলছে কম করে হলেও ২ জন দাড়াতে পারতো ওখানটায়!- আরেক জন বলছে ও দাদা আমিতো পা রাখতে পারছি না! ....“ ভালকরে তাকিয়ে দেখি আমার ব্যাগের কোনা বের হয়ে আছে।

সবশেষে তো সিট থেকেই উঠিয়ে দিল- বলেকিনা ‘ওদাদা উঠুন এবার একটু বসি’ । উঠে দাড়ালাম আরেক জন বসল - কাঁচুমাচু বউটার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আড়িল পা সোজা করতে পারছিল না - চুপ করেছিল কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম ওর কষ্ট হচ্ছে। শিখলাম: এই ট্রেনে অফিস সময় ভীড়ের সংজ্ঞা হয় না। এ পথে আর বাড়ী ফেরবো না । তাই দমদম না নেমে, নামলাম শেয়ালদহ আর নেমে সরাসরি ফেয়ারলি ষ্ট্রীট রেল ভবন। মৈত্রী এক্সপ্রেস এ ফেরার টিকেট কনফার্ম করে হোটেলে যাবো।

একটা ভূল আরেকটা ভূল তৈরীতে মূখ্য ভুমিকা পালন করে। পরিকল্পনা ছিল হরিদাসপুর থেকে সিমে (পুরনো সিম ছিল সাথে) এ টাকা ঢুকিয়ে ইন্টারনেট চালু করে Ola ডাউনলোড করে নাস্তা করে রওনা হবো কিন্তু দুইটা ভেজালে পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যতদ্রুত সম্ভব হোটেলে যেয়ে তারপর সিম চালু করবো। তো শেয়ালদহ হতে ফেয়ারলি হাউজ পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া দিলাম ২২০ রুপি দিয়ে। কম না বেশী জানি না!

টিকিট কাটতে প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে গেল। প্রথমে ফর্ম দিতে গরিমসি, তারপর অপেক্ষা আর অপেক্ষা , যখন আমার টিকেট পাবার সময় হলো তখন কর্তার জানার মর্জি হলো পুরীতে বীচের ধারে ফেরী করে যে মিষ্টি বিক্রি করে উহার নাম কি? অনেক চেস্টা করে একে, ওঁকে , তাকে , বঊকে অবশেষে ছেলেকে ফোন করে নিশ্চিত হলেন উহার নাম ছিল লালমোহন। সবাইকে জ্ঞাত করে অতপর লালমোহন মহাশয় এর আজ্ঞা হলো আমার পাসর্পোট হাতে লইবার.......।

অবশেষে তিন খানি টিকেট প্রতিটি ১৩৪৫ রুপির বিনিময়ে খরিদ করিতে সক্ষম হইলাম। বাংলাদেশের তুলনায় কিঞ্চিত কম মনে হইল। ইতিমধ্যে আড়িলের পয়নিস্কাশনের বেগ পাইয়া ছিল কিন্তু নিস্কাশন ব্যাবস্থা দেখিয়া বেগ চলিয়া গিয়াছে। সে ফুটপাত হতে ব্রেডওমলেট খেয়ে রীতিমত মোচড়ামোচরী করিতেছে. বলিল

- বাবা হোটেল কখন যাবো?

- এইতো চল বের হই।

আক্কেল সেলামী নম্বর- ৪ ঃ ছেলের অবস্থা দেখে ভাবলাম সিম, ইন্টারনেট, Ola ইন্সটল পরে করবো আগে হোটেল যাই । বের হয়ে ট্যাক্সি নিলাম।

-রাজার হাট, হোটেল ব্লু নেস্ট যাবেন ?

-যাবো

-মিটারে যাবেন?

-ওকে চলুন।

প্রায় দুই ঘন্টাপর বুঝলাম আমাকে মুরগী বানানো হয়েছে। উল্টাপাল্টা ঘুড়ানো হচ্ছে।দ্রুত মোবাইল রিচার্জ করে গুগল দিয়ে হোটেল যেতে যেতে ৬০০ রুপি উধাও! ইয়ালো কারের দাদারা চিপে চিপে বের করেন আর আমার এক্ষেত্রে চুপসে চুপসে পড়ছে। শিক্ষণ: হরিদাসপুর যেকোন ভাবেই ইন্টারনেট চালু করা দরকার ছিল। যাই হোক হোটেলের রিসিপশন বলছে আপনি যে হোটেল বুকিং দিয়েছেন তা পিছনে ফেলে এসেছেন অনেকদূর, এয়ারপোর্টের কাছে। যাই হোক দুইটাই আমাদের প্রপার্টি, চাইলে আপনি এখানে থাকতে পারেন। অসাধারন হসপিটালিটি, সুন্দর একেবারে নিরিবিলি পরিবেশ, খাবারের অর্ডার দিয়ে রুমে এসে আমার বরফের দেশ ভ্রমনের প্রথম দিনের অভিযান সমাপ্ত করলাম।

আক্কেল সেলামী নম্বর ৫ ঃ  হোটেল এ চেকইন এর সময় ভোরে এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার এর জন্য সার্ভিস অনুরোধ করলাম। ভদ্রমহিলা বললেন-এত সকালে Ola নাও পেতে পারেন। আমাদের থেকে সার্ভিস নিলে ৫০০ রুপি লাগবে। রাজীব ভাইয়ের রেকমেন্ডেশন নিয়ে হোটেলেই কনফার্ম করলাম। রুমে এসে দেখি Ola  তে ১৮০ রুপি দেখাচ্ছে। শিখলাম: ওলা ওয়াজ দ্যা বেস্ট! আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখা যায়।