সেপ্টেম্বর এর শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চের শেষ... বছরের মাত্র এই সময়টুকুই বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে। তাই বাকি সময় বেকার বসে থাকা হোটেল-মোটেল-রেস্তরাঁ সহ পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল সবাই ব্যবসা করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে এসময়।

আপনি যদি বছরে একবার ঘুরতে বের হন আপনার জন্য বর্ধিত মূল্য হয়ত কোন সমস্যা হয়ে দেখা দেবেনা, কিন্তু ঘুরতে না গেলে যাদের রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়না তাদের জন্য এটুকু মূল্য চোকানোও একটু ঝামেলারই!

প্রবাল দ্বীপে সূর্যাস্ত প্রবাল দ্বীপে সূর্যাস্ত

যাহোক, টাকা পয়সা ছাড়াও আরো অনেক ব্যাপার থাকে। প্রবাল দ্বীপ ভ্রমণ ঝামেলা মুক্ত, সুন্দর ও অপেক্ষাকৃত কমখরচে করতে চাইলে দেখে নিতে পারেন আমার সাজেশন গুলো।


* বাসের টিকিটঃ

ঢাকা থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন যেতে চাইলে বাসের কোন বিকল্প নেই। এমনকি চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনে যেয়ে তারপর যদি বাসে যেতে চান তাহলেও ঝামেলার। মেইল ট্রেন বা আন্তঃনগর ট্রেন যেভাবেই যান না কেন সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সকালের মধ্যে টেকনাফ পৌছুতে পারবেন না। আপনার হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে আলাদা কথা!

 
সরাসরি বাসের টিকিট কেটে নিতে পারেন ফকিরাপুল, পান্থপথ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে। সেন্টমার্টিনে শ্যামলি, ইয়ার ৭১ ও সেন্টমার্টিন পরিবহণের বাস এর টিকিট পাবেন shohoz.com বা busbd.com এ। বাসের কাউন্টার থেকে আপনার বাসা দূরে হলে অনলাইনেই কেটে ফেলতে পারেন টিকিট। সহজ আপনাকে ডেলিভারি চার্জের বিনিময়ে টিকিট বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবে, আর বাসবিডির ক্ষেত্রে যাত্রার দিন কাউন্টারে মোবাইলে আসা মেসেজ টি দেখালেই চলবে।

* শিপের টিকিটঃ

জাহাজজাহাজ

সর্বনিম্ন ৫৫০ টাকায় কেয়ারি সিনবাদ এর টিকিট পাবেন। ৬৫০ টাকায় পাবেন টিপু সুলতান এর টিকিট। দুটোই স্ট্যান্ডিং। তবে আমার মতে ১০০ টাকা বেশি দিয়ে টিপু সুলতান এ যাওয়া ভালো। এটা মূলত ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চ যা বেশ দ্রুত গতি সম্পন্ন। প্রচুর সিট আছে তাই স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটেও বসেই যেতে পারবেন। আর সবার শেষে ছেড়েও প্রথমেই পৌঁছে যায় এটি। অপরদিকে কেয়ারি সিনবাদ সবথেকে দেরীতে পৌঁছায়।

* হোটেলঃ

সেন্টমার্টিনে আগে থেকে হোটেল ঠিক করে না যাওয়াই ভালো। এমনকি সবথেকে রাশ এর সময়েও আপনি কিছু হোটেল ফাঁকা পাবেন।  গতবছর জেটির একদম কাছেই হোটেলে ছিলাম ৫০০ টাকায়। এবছর বৃহস্পতিবারে যেয়ে পশ্চিম বীচে একদম সমুদ্রের ধারে চমৎকার রুম পেয়েছি মাত্র ৬০০ টাকায় (আরেকটু দামাদামি করলে হয়ত ৫০০ তেও দিত), যা পরদিন ১২০০-১৫০০ টাকায় ভাড়া হয়েছে।

সমুদ্রের ঠিক পাশেই কটেজ সমুদ্রের ঠিক পাশেই কটেজ

জেটি তে নেমে কোন হোটেলে বসে মালামাল রেখে সঙ্গীদের মধ্যে যেকোন একজন যেতে পারেন হোটেল খুজতে। অথবা অন্যরা সবাই খাওয়া শুরু করার আগেই আর্লি লাঞ্চ সেরে নিয়ে তারপর সদলবলে খুজতে যেতে পারেন হোটেল।

* খাবারঃ

সেন্টমার্টিনে খাবারের দাম তুলনামূলক বেশি। ভাত আপনি কোথাও প্লেট হিসেবে পাবেন না, ৩০ টাকায় পেটচুক্তি। আবার মাছ ভাজি করে দেয়া হয় সাথে, আলাদা ডাল সবজি বা ভর্তা কিনতে হয় যা খুব একটা ভালো না খেতে।
মাথাপিছু ১৩০-১৪০-১৫০ টাকার মাছ-ভাত-ডাল-সব্জি-ভর্তার বিভিন্ন প্যাকেজ খেতে পারেন। তবে সবথেকে ভালো হয় মাছ দামাদামি করে কিনে পেয়াজ ও টমেটো দিয়ে ভুনা করে দিতে বললে। এটা খেতে অসাধারণ লাগবে ও আপনার আলাদা করে সবজি ভর্তা কিনতে হবেনা। সেন্টমার্টিন ভাত ঘরে এরকম সামুদ্রিক স্যালমন মাছ ভুনা গরম ভাতের সাথে খেয়ে আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ট সুখাদ্য খাচ্ছি! ট্রাই করে দেখতে পারেন আপনিও!

রান্না সহ এই মাছের দাম ১২০ টাকা, যে প্লেট এ মাছটি আছে তা প্রমান সাইজের ভাতের থালা থেকে বড়, বুঝতেই পারছেন মাছের সাইজ! রান্না সহ এই মাছের দাম ১২০ টাকা, যে প্লেট এ মাছটি আছে তা প্রমান সাইজের ভাতের থালা থেকে বড়, বুঝতেই পারছেন মাছের সাইজ!

* সাইকেলঃ

সমুদ্র পাড়ে দেখবেন অনেকেই সাইকেল চালাচ্ছে। প্রচুর সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। ৫০ টাকা ঘণ্টা চাইবে, দামাদামি করে ৩০ টাকায় নামানো যায়, তবে সবাই ৪০ এই নিয়ে নেয়।
সাইকেল ভাড়া নেয়ার আগে দেখে নিন ঠিকমত কাজ করছে কিনা, বেশিরভাগ সাইকেল এই সমস্যা থাকে।

ছবি- ফাহমিদুল হান্নান রূপক ছবি- ফাহমিদুল হান্নান রূপক

* ছেড়াদ্বীপঃ

ছেড়াদ্বীপ যেতে পারবেন তিনভাবে- নৌকা, স্পীডবোট আর হেটে। নৌকায় ২০০ জনপ্রতি, স্পীডবোট এ ৩০০ টাকা খরচ পড়বে। এর বাইরে সাইকেল বা ভ্যান নিয়েও যেতে পারবেন। সেক্ষেত্রেও হাঁটতে হবে একটা ভালো অংশ। সাইকেল এ গেলে ক্যারিয়ার ওয়ালা সাইকেল নিতে পারেন, তাহলে পালাক্রমে চালাতে পারবেন দুজনে, আবার খরচ টাও কম হবে। যাওয়ার আগে অবশ্যই জোয়ার ভাটার সময় জেনে নিন।

 

ছেড়াদ্বীপ এ আমার সঙ্গী ছেড়াদ্বীপ এ আমার সঙ্গী

ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার ক্ষেত্রে আমি বলব খুব সকালে বা একদম বিকেলে যেতে। দুপুরের রোদ আপনার পানি দর্শনের আনন্দের ১২টা বাজিয়ে দিতে পারে। সাথে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি রাখুন।

* অন্যান্যঃ

১। ভালো মানের সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন, নাহলে ফিরে এসে নিজেকে চিনতে পারবেন না। সাথে ছাতাও রাখতে পারেন। 

২। সেন্টমার্টিনে বোতলজাত পানির দাম অনেক বেশি। ওখানকার ঈষৎ নোনতা পানি যদি খেতে সমস্যা হয় তবে টেকনাফ থেকেই জনপ্রতি কমপক্ষে দুই লিটার পানি কিনে নিয়ে যান।

৩। হোটেল গুলোতে বার্বিকিউ করার জন্য বেশ উচ্চমূল্য চাওয়া হয়। দলে লোকসংখ্যা কম হলে বার্বিকিউ না করে সমুদ্রের একদম পাড়ে বসে ভাজা মাছ কিনে খেতে পারেন। সন্ধ্যার পর জেটি থেকে শুরু করে পশ্চিম বীচ পর্যন্ত কিটকট ও ছোট ছোট দোকান পাবেন মাছ বিক্রির। এতে করে বিভিন্ন মাছের স্বাদ নেয়া হবে, ঝামেলা আর খরচ ও কম হবে। 

স্বল্পমূল্যে সুস্বাদু বাহারি মাছের মেলা। স্বল্পমূল্যে সুস্বাদু বাহারি মাছের মেলা।

৪। অভন্ত্যরীন যাতায়াতের জন্য ১২-৩ টা এই সময়টায় ভ্যানে না চড়াই ভালো, জাহাজ আসা যাওয়ায় এসময়ে ২০ টাকার ভাড়া ১৫০-২০০ চাইবে। স্বাভাবিক ভাড়া- জেটি থেকে হোটেল অবকাশ পর্যন্ত ভ্যানে জনপ্রতি ২০ টাকা।

৫। নীল সমুদ্রের পাশে ভালো ছবির জন্য গাঢ় রঙ এর পোশাক পরুন।

গাঢ় রঙের পোশাকে ছবি সুন্দর আসবে। গাঢ় রঙের পোশাকে ছবি সুন্দর আসবে।

৬। পাখিকে চিপস খাওয়াবেন না, নিজে খেতে পারেন। খেলে প্যাকেট সমুদ্রে নয়, ডাস্টবিনে ফেলুন।