আমাদের অবস্থান সাউথ গোয়ার কোলভা বীচের কাছে। আজ আমরা নর্থ গোয়া যাবো। হোটেল থেকে একটি এসি টুরিস্ট গাড়ি যাবে নর্থ গোয়ার বিভিন্ন স্পটে। সারাদিনের জন্য এসি গাড়ির একটি সিটের ভাড়া ৩০০ রুপী। বিভিন্ন বীচ, ডলফিন পয়েন্ট, স্নো আইস ল্যান্ড, দুর্গ আর ক্রুজ সাফারি।

এই সব গুলোর মধ্যে আমি দুইটা জিনিষের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত হয়েছি। প্রথম গভীর সমুদ্রের মাঝে বোটে করে নীল জলের মাঝে ডলফিনের দলের ছুটে চলা দেখা আর দ্বিতীয়টা হল, বহু বছরের পুরনো দুর্গ দেখা আর দুর্গ থেকে সমুদ্রের মাতাল বাতাস উপভোগ করা।

সমুদ্র থেকে দেখা দূর্গ সমুদ্র থেকে দেখা দূর্গ

সকাল ৯ টায় আমাদের গাড়ি ছেড়েছিল সাউথ গোয়া থেকে। ফিরবে সেই রাত ৮:৩০ মিনিটে। দীর্ঘ প্রায় ১২ ঘণ্টার নর্থ গোয়ার বিভিন্ন স্পট দর্শন। এদের মধ্যে সবচেয়ে দুরের হল ডলফিন পয়েন্ট। তাই সবার আগে সেখানেই যাবে বলে ড্রাইভার ঘোষণা দিল। সাথে আরও নানা রকম নির্দেশনা ও পরামর্শের মধ্যে অন্যতম একটা ছিল কোন কিছুতেই গাড়ির জানালা থেকে কোন রকম ময়লা, কোন কাগজ, কোন উচ্ছিষ্ট, কিছুর প্যাকেট এসব ফেলা যাবেনা। কোন রকম ময়লা ফেললেই জরিমানা। আর কোন যায়গার জন্য নির্ধারিত সময়ের বাইরে মাত্র ১০ মিনিটের বেশি কারো জন্য অপেক্ষা করা হবেনা। সুতরাং এই দুটো ব্যাপারে সবাইকে নিজ নিজ থেকে সাবধান আর সচেতন থাকতে বলা হল।

এরপর আমাদের গাড়ি ছুটে চলতে শুরু করলো শহর ও গ্রামের মিশ্রণের এক অন্য রকম পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। রাস্তাঘাট সব আধুনিক, পিচ ঢালা, মসৃণ, ট্র্যাফিক ব্যবস্থা, পুলিশ আর অন্যান্য নিয়ম কানুন। কিন্তু চারপাশের প্রকৃতি অনেকটাই আদিম আর একেবারে প্রাকৃতিক। পুরনো, সেকেলে আর প্রায় ভঙ্গুর বাড়িঘর, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা গাছপালা, জঙ্গল, জলাশয়, যত্ন আর অযত্নে সেজে ওঠা বাগান আর বাগানের মধ্যে মধ্যে গ্রামীণ রুপ ধরে রাখা ছোট ও মাঝারী বাড়ি।

সত্যি বলতে কি গোয়ার বীচ, দুর্গ আর সমুদ্রের পাশাপাশি এই গ্রামীণ আলোছায়া আর প্রকৃতির মাঝে অনেক আধুনিক সুযোগ সুবিধার সমন্বয় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আপনি যা চাইবেন সব পাবেন সাধ্য অনুযায়ী আবার চাইলে থাকতে পারবেন একবারে গ্রামীণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশে। এটাই সবচেয়ে দারুন ব্যাপার।

২০ বা ২৫ মিনিট পরে ছোট রাস্তা পেরিয়ে হাইওয়েতে উঠতেই রাস্তার দুইপাশে সারিসারি নারিকেল গাছের বাগান মুগ্ধ করে দিল মুহূর্তেই। দ্রুত গতির ছুটে চলার মাঝে যতদূরে চোখ যায় শুধু নারিকেল গাছের সারি সারি দাড়িয়ে থাকা আর চারদিকে সবুজের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা। অদ্ভুত একটা ভালো লাগায় মনটা শান্ত হয়ে যায়, কাচের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে চুপচাপ দুরের অবারিত সবুজের পানে তাকিয়ে থেকে এক অদ্ভুত প্রশান্তির পরশ পাওয়া যায় যেন।

পুরো রাস্তা জুড়ে এই নারিকেল গাছের সারি আর সবুজের রুপ দেখে দেখে প্রান ভরে গেছে। মাঝে পরেছে বিশাল বিসৃত নিয়ে টলটলে গভীর জলের নদী, যা কাছের সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত। অনেক পুরনো সেই ভাসকো দা গামা। গোয়ার প্রান কেন্দ্র ও প্রাচীন সমুদ্র বন্দর। 
দেখেছি গভীর সমুদ্রের সাথে লাগোয়া নদীতে ভেসে আছে রঙ বেরঙের ক্রুজ আর ক্যাসিনো জাহাজ। মাছ ধরার পাল তোলা নৌকা আর ভেসে থাকা বর্ণিল স্পীড বোট।

প্রায় ১:৩০ মিনিট পরে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের প্রথম ও আমার কাছে প্রধান আকর্ষণ ডলফিন পয়েন্টে। ৩০০ রুপী করে টিকেট কেটে আমাদের গাড়ির ১০ জন উঠে পরলাম ইঞ্জিন চালিত বোটে। গভীর সমুদ্রের লেজের মাঝে আমাদের বোট। চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা বলে এখানে সমুদ্রে ঢেউয়ের আছর তেমন একটা নেই। তবে নীল পানির ছোট ছোট তরঙ্গ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে অনেক গভীর সমুদ্রের পানিতে আমাদের অবস্থান। সবাইকে বাধ্যতামুলকভাবে লাইফ জ্যাকেট পরতে হল।

আমাদের বোট এগিয়ে চলেছে পাহাড়ের বাঁক আর আবাসিক ভুমি থেকে গভীর সমুদ্রের দিকে। আমাদের বোটের সাথে, আগে, পরে আরও কয়েকটা বোটের অবস্থান রয়েছে। সবাই ছুটে চলেছে ডলফিনের নতুন রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে। দুইপাশে সবুজ আর উঁচু নারিকেল গাছের সারি, সমুদ্রের হুহু বাতাস, নীল জলের ছোট বড় তরঙ্গ, সমুদ্রে ডুবে থাকা প্রাচীন স্থাপনা পেরিয়ে ১০/১৫ মিনিট পরে আমরা সামনের বোটে হঠাৎ করে চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম।

ডলফিনডলফিন

সেদিকে তাকাতেই দেখি আমাদের বোটের অনেকেই আনন্দের চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। ব্যাপারটা বুঝতে সমুদ্রের অন্যপাশে চোখ রাখতেই দেখলাম দুই তিনটা ডলফিন নীল সবুজ পানিতে সাতার দিয়ে সামনের দিকে ছুটে চলেছে! অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম। নতুন আর একদম প্রথম এমন কিছু দেখার অভিজ্ঞতায় কিছুটা চুপ হয়ে গিয়ে শুধু দেখছিলাম।

এরপর আবারো দুটো ডলফিনের উঁচুতে উঠে লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখেই যেন উপভোগ করতে শুরু করলাম। তখনই মনে পড়লো আরে ক্যামেরায় তো ধরে রাখা দরকার। ক্যামেরা বের করতে করতেই তারা পানিতে ডুবে গেল! একটু সামনে আবার তাদের লম্ফঝম্প দেখা গেল, সাথে সবার উচ্ছ্বসিত চিৎকার। এবার ক্যামেরা বাদ দিয়ে মোবাইলে চেষ্টা করলাম কিছু ছবি তোলার। তবে ক্ষণিকে উত্থান পতনের কারনে তেমন করে তাদের ছবি আর তোলা হলনা। হুট করে দেখি বোটের অন্যপাশের দিকে সবার দৃষ্টি। মানে ডলফিনের দল এবার বোটের অন্যপাশে দেখা দিয়েছে। এবার আর মিস করিনি মোবাইলের ক্যামেরায় অল্প কয়েক সেকেন্ড এর ভিডিও ধারন করতে সক্ষম হলাম।

এমন করে বোট চলতে চলতে প্রায় ২০ মিনিট অল্প অল্প করে, ভেসে থাকা, ডুবে থাকা, সাতার কাটা, লাফ দিয়ে সামনে ছুটে চলা গভীর সমুদ্রে ডলফিনের ছুটে চলা উপভোগ করলাম। এবার আমাদের বোট ফেরার পথ ধরলো উল্টো দিকে। যদিও একদম ফিরে আসতে ইচ্ছা করছিলনা, কিন্তু প্যাকেজে গেলে এই এক বিশাল সমস্যা, নিজেদের ইচ্ছামত কোন কিছু উপভোগ করার কোন উপায় থাকেনা। বেশ খারাপ লাগছিল ডলফিন পয়েন্ট থেকে ফিরে আসতে। কি যে ভালো লাগছিল গভীর সমুদ্রের ঢেউ, নীল সবুজ জলের স্পর্শ, ঝিরঝিরে আবার কখনো মাতাল বাতাস, দূরে সবুজের হাতছানি। কিন্তু কিছুই করার নেই বলে ফিরতেই হল।

ফেরার পথে দেখলাম গোয়ার এক বিখ্যাত হীরা ব্যাবসায়ির বাড়ি। যার অবস্থান সমুদ্রের সাথে সবুজ পাহাড়ের গায়ে। অদ্ভুত স্বর্গীয় এক পরিবেশে তিনি লক্ষ্য কোটি ডলার খরচ করে পুরো গোয়া বাসির কাছে রহস্যময় করে রাখা এক প্রাসাদ গড়ে রেখেছেন। যেখানে যাওয়া বা দেখার অনুমোদন কারো নেই। তবে দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কি অদ্ভুত সুন্দর, আকর্ষণীয় ডিজাইন, দুর্লভ কারুকাজ আর দামি পাথরের সমন্বয়ে গড়ে তোলা সেই প্রাসাদ।

হীরা ব্যবসায়ীর বাড়ি হীরা ব্যবসায়ীর বাড়ি

আরব সাগরের পারে যেন এক টুকরো নীল-সবুজ হীরার অবস্থান! প্রাসাদের সিঁড়ি এসে পৌঁছেয়ে সমুদ্রের পানিতে। ছোট বড় ঢেউ আছড়ে পরছে সেখানে। ইচ্ছে হলেই বসে বসে নিজের প্রাসাদে বসে, সমুদ্রের বাতাস, সবুজ পাহাড়ের ছায়া, নারিকেল গাছের কলতান আর সমুদ্রের ঢেউ উপভোগের দুর্লভ সকল ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

দূর থেকে শুধু দেখলাম আর ক্যামেরা জুম করে কিছু ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। একেবারেই অন্যরকম কিছু দেখার আর উপভোগ করার সুখ সাথে করে নিয়ে তীরে ফিরে এসেছিলাম। এরপর গোয়ার অন্যতম আকর্ষণ আঞ্জুনা বীচে যাবো তার আগে প্রাচীন দুর্গ অ্যাগোনডা দর্শন।