এই বিখ্যাত দুই বীচ বা সমুদ্র তীরবর্তী শহরের সুযোগ, সুবিধা আর তাদের তুলনা নিয়ে প্রথম লেখাটা যারা পড়েছেন তারা জানেন, যে মাত্র এক বেলায় চোখে পরা পার্থক্য গুলোই আমাদের সাধারন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, যে কেন আমাদের দেশে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত থাকা সত্ত্বেও গোয়ার চেয়ে যোজন দূরত্বে পিছিয়ে আছে। আজকে কক্সবাজারের সাথে গোয়ার আরও কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তুলে ধরবো।

সন্ধায় মাছ ভাত খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা বীচে বেড়াতে যাবো। হোটেলের রিসেপশনে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন সমস্যা আছে কিনা? কত দ্রুত হোটেলে ফিরতে হবে, কোন নিরাপত্তাঝুঁকি আছে কিনা? যেহেতু পরিবার নিয়ে যাচ্ছি আরও সন্ধার বেশ পরে।

আমার কথা শুনে হোটেলের লবিতে দাঁড়ানো দুই তিনজন যেন আকাশ থেকে পড়ল! সৈকতে কোন সমস্যা? সেটা আবার কি জিনিষ! আর কত রাতে ফিরব সেটা একান্তই আমাদের ব্যাপার। হোটেল সারারাত খোলা, শুধু এখানে খেতে হলে ১১:৩০ এর মধ্যে অর্ডার করতে হবে। যখন চাইবো রুমে পৌঁছে দেবে। ব্যাস বেড়িয়ে পরলাম সাহস নিয়ে। অনেক ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও বেশ গভীর রাতে রুমে ফিরেছিলাম উত্তাল সৈকতের গর্জন শুনে শুনে।

কারন ছিল। গোয়াতে এখন অনেক বেশি গরম বলে, আমরা আগেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম যে খুব ভোঁরে বীচে যাবো, সকালের রোদের উত্তাপ শুরু হতেই রুমে ফিরে বিশ্রাম নেব, আবার শেষ বিকেলে গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বীচে থাকবো। তাতে করে আরাম করে সমুদ্র উপভোগ করা যাবে আর রোদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। আর হোটেলে তো সুইমিং পুল আছেই। সুতরাং সকাল থেকে বিকেল সেখানেও কাটানো যেতে পারে অনায়াসে।

দারুন জ্যোৎস্না রাতের সমুদ্রের তীরে ধরে হাটা বা বসে বসে সমুদ্রের রুপালি ঢেউ দেখার মজাই আলাদা। আমরাও অভিভূত হয়ে তাই দেখছিলাম। একটা সময় জোয়ারের পানি একদম পায়ের কাছে চলে আসাতে উঠতেই হল। কিন্তু রুমে কেউই এখন যেতে চাইছিলামনা। কি করি, কি করি? একটু উপরেই রয়েছে সারি সারি চেয়ার টেবিল পাতা আর রয়েছে শত শত আরাম কেদারা বা নরম হেলান দিয়ে বসার মত ব্যবস্থা। কিন্তু কক্সবাজারের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এসবে বসতে হলে ৩০-৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয় ঘণ্টা প্রতি।

কিন্তু এই বাড়তি খরচের পক্ষপাতি আমরা কেউই ছিলামনা। তাই একটু ওসবের পাশে ঘুরঘুর করে ফেরার পথ ধরবো বলে উঠেছি। একজন বলে উঠলো, চাইলে বসতে পারি, কোন সমস্যা নেই। জিজ্ঞাসা করলাম কত করে ঘণ্টা? আমার জিজ্ঞাসায় যেন বেশ অবাক হল, বলল বসতে পারি যতক্ষণ খুশি কোন টাকা লাগবেনা। শুধু যদি ওদের ওখান থেকে কিছু খাই তবেই সেটার বিল দিতে হবে। শুধু বসার জন্য কোন টাকা নেই।

এবার ভাবুন আমাদের কক্সবাজার হলে কি হত? ঘণ্টা প্রতি ৩০-৫০ স্বাভাবিক আর যদি হয় কোন দম্পতি বা সদ্য বিবাহিত কেউ বা সাথে থাকে একটি ছেলে আর একটি মাত্র মেয়ে, তাতে সম্পর্ক যাই হোক না কেন, মনে হয়না ৫০ টাকায় ছাড়া পাবেন! আর যদি দুজনে বসে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস, উত্তাল ঢেউ আর মায়াবী চাঁদের আলো আধারিতে আবেগে উত্তাল হয়ে ওঠে মনপ্রান, যদি আসেন একে-অন্যের একটু কাছাকাছি, হতে চান কিছুটা অন্তরঙ্গ তবে তো আপনাকেই ওরা খুঁজছে, ওদের স্বীকার বানাতে!

কেন ভাই, তা কেন হবে? সমুদ্রের তীরে, ভেজা বালুতে, নরম বীচে, রুপালি রাতে, উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের কাছে একটি ছেলে একটি মেয়ে, সদ্য বিবাহিতা দুজন নারী পুরুষ বা দুজন বন্ধ হোক সে ছেলে বা মেয়ে শুধু কি ঢেউ দেখতে এসেছে, শুধু কি পাশাপাশি বসে থাকতে এসেছে? মোটেই তা নয়। এমন প্রকৃতির কাছে গিয়ে ওদেরও ইচ্ছে হতে পারে, হাতে হাত রাখার, একে অন্যের কাঁধে মাথা রাখার, একটু কাছে টানার, কথা দেয়ার, কথা নেয়ার, একে অন্যকে নিবিড় ভাবে বোঝার।

কিন্তু আমাদের এখানে কি সেটা আদৌ সম্ভব বা বাস্তবসম্মত?

এখন আপনি বলবেন, অত যদি ইচ্ছা জাগে তার জন্য তো রুম আছে, হোটেল আছে, নিজের বাড়ি আছে, বীচে কেন ভাই এতো কাছাকাছি আসা লাগবে? আমি বলবো কি যাদের অমন ইচ্ছা হয়না, হয় তাদের আবেগ বলে কিছু নেই, অথবা তারা জড় পদার্থ! স্বাভাবিক মানুষ মাত্রই এমন প্রকৃতির কাছে গেলে একটু আবেগে ভাসতে ইচ্ছে করবেই।

আর এতেই আপনাদের গেল গেল রব উঠবে। এমন করে ভাবলে বিদেশী কেন, কদিন পরে দেশি পর্যটকই আর যাবেনা ধীরে ধীরে। যেখানে প্রকৃতি যেমন তাকে সেখানে তেমন করেই উপভোগ করা উচিত আর তেমন পরিবেশ রাখা উচিৎ। কিন্তু সেটা কি আমাদের কক্সবাজারের আদৌ সম্ভব?

চলুন বীচ থেকে এবার হোটেলের সুইমিং পুলে যাই। কক্সবাজারের কোন সুইমিংপুল সম্পন্ন হোটেলে আপনি কি পারবেন, সুইমিং কস্টিউম পরে, আপনার বান্ধবী, বউ বা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ইচ্ছেমত ভিজতে, সাতার কাটতে বা নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটাতে?

কারন সুইমিং কস্টিউম তো দুরের কথা, ঘরের বা বাইরের একদম শালিন বা গা ঢাকা পোশাক পরে নামলেও শত শত চোখ সেই মেয়েকে গিলে খাবে! আপনার বান্ধবীর, বউয়ের, বোনের বা আরও অন্য কারো নিদারুণ অস্বস্তির জন্য অন্যদের দুটি চোখই যথেষ্ট! আর কিছুর দরকার নেই। আর তো আছেই আমাদের সবার কাছে একদম আধুনিক ক্যামেরা সম্পন্ন মোবাইলে ফোন। আপনি না চাইলেও কখন আপনার কোন ছবি কে তুলে কিভাবে মজা করছে, ভাবতেই শিউরে উঠবেন।

অথচ দুইদিন ওদের সুইমিং পুলে ইচ্ছামত ডুবে ছিলাম। ছিল হোটেল এর অন্যান্য অনেক ছেলে মেয়ে, বউ বাচ্চা, বন্ধু-বান্ধবীসহ অনেকে, কই কাউকে দেখিনি কোন কিছু নিয়ে অসস্থিতে থাকতে, কাউকে দেখেনি আড় চোখে কেউ কাউকে দেখছে, কোন রকম মজা করছে বা দেখিনি কারো দিকে কারো নোংরা বা গা ঘিনঘিনে কোন দৃষ্টি।

সবাই একই সুমিং পুলে যে যার মত করে সময় কাটাচ্ছে, সাঁতরাচ্ছে, ভেসে আছে, ডুবে আছে। যখন ইচ্ছে হয়েছে কোন রকম জড়তা ছাড়াই উঠে চলে গেছে। তেমনই পরিবেশ আর মানসিকতার সবাই সেখানে গেছে বা ছিল। এমনটা কি আমাদের কক্সবাজারের সুইমিংপুল গুলোতে সম্ভব? আমার তো মনে হয়না। তাহলে কিভাবে বিদেশী পর্যটক আসবে, এখানে? কদিন পরে দেশি পর্যটকরাই মুখ ফেরাবে।

বিকেলে হাঁটতে বেড়িয়ে ছিলাম। সৈকত, পাশের খুচরা মার্কেট, স্যুভেনির শপ, নানা রকম চকলেট, আইসক্রিম আর অন্যান্য স্থানীয় বাজারের দিকে, যেদিকে আরও হোটেল আছে। একটু খোঁজ নিতে অন্যান্য হোটেলের ভাড়া কি রকম আর আমরা ঠকলাম না জিতলাম পরখ করতে। ঘুরতে গিয়ে আর হোটেলের খোঁজ নিতে গিয়ে আমার তো মাথায় হাত!

কেন কি কারনে?

দেখলাম আইসক্রিম যেটা সব যায়গায় ২০ টাকা সৈকতেও ২০ টাকা! শর্মা যেটা অন্যান্য দোকানে ৫০ টাকা, বীচের ধারেও ৫০ টাকা, ডাব যেটা বাজারে ৩০ টাকা, বীচের পাশেও সেই ৩০ টাকাই! এটা তো আমি ভাবতেই পারিনি। ভেবেছিলাম এসবের দাম বীচের পাশে তিনগুন না হোক অন্তত দিগুন তো হবেই! কিন্তু একই? একই যে দাম? কিভাবে সম্ভব? আমাদের কক্সবাজারে কি সব যায়গায় একই জিনিষের দাম একই রকম সম্ভব?

আর হোটেল খুঁজতে গিয়ে তো পারলে নিজের মাথায় নিজেই বাড়ি দেই! কারন কি জানেন? দেখি বড় করে সাইনবোর্ড দেয়া আছে সকল সুবিধাসহ সিঙ্গেলদের জন্য ডরমেটরি ২৫০ রুপী! হায় হায় করলাম মনে মনে। ইস যদি একা আসতে পারতাম তাহলে ১৫০০ এর পরিবর্তে মাত্র ২৫০ থাকতে পারতাম!

আহা! তার মানে ১৫০০ টাকায় এক প্রায় সপ্তাহ থাকা জেত! আর খাবার সেখানে সকালের নাস্তা ৩০, দুপুরের লাঞ্চ ৫০ আর ডিনারও ৫০! মানে প্রায় ১৫০ টাকায় খাওয়া আর ২৫০ টাকায় থাকা! ৪০০ টাকায় থাকা খাওয়া! আর পানীয় সহ একটু আজে বাজে মিলিয়ে ৫০০ টাকায় দিন পারি!

এবার আপনি বলুন, সম্ভব কি আমাদের কক্সবাজারে ৪০০/৫০০ বা ৬০০-৭০০ টাকায় কারো পুরো একদিন সবকিছু মিলিয়ে পারি দেয়া? তাহলে কক্সবাজার কিভাবে এগোবে? ওরা অল্প দামে বেশি বিক্রি করে কাড়ি কাড়ি ডলার কামাবে আর আমাদের এখানে দিন দিন পর্যটক কমবে, খরচের ভয়ে, হয়রানির কারনে, সুযোগ সুবিধা আর সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে।

এইসব দেখে ফিরছিলাম আর মনে মনে ওই ডরমেটরির কথা ভেবে বলছিলাম...

ও মোর খোদা এইয়া তুমি মোরে কি দেহাইলা! গোয়াতে তো একবার একটা ব্যাচেলর ট্যুর না দিলেই নয়। কত কম খরচে, কতদিন থাকা যায় সেটা দেখতে? চুপিচুপি ভেবে রাখলাম ছেলে আর ছেলের মায়ের সাথে শেয়ার না করেই।

ওমা একটু পরে দেখি ছেলের মাই আমাকে দেখাচ্ছে, দেখ তুমি একা এলে আরও কত কম খরচে গোয়া ট্যুর করতে পারতে!

আর আমি মনে মনে বলি,

কাশ এইসি হতি...!!