আজকাল একটা ব্যাপার খুব ঘটছে, বিশেষ করে যখন তুমুল বৃষ্টি ঝরতে শুরু করে। তিন সময়ের তিনটি  স্মৃতি আমাকে সেই সময়ের সুখ, দুঃখ আর অপার্থিব অনুভূতির কাছে নিয়ে যায়। তিন সময়ের তিন রকমের বৃষ্টির সৃতির মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়, একটা বৃষ্টি স্বপ্ন পুরনের, একটা বৃষ্টি দুঃস্বপ্নের আর একটা বৃষ্টি অপার্থিব সুখের, কল্পনার চেয়েও বেশী বাস্তবে ধয়া দেয়ার।

আজকাল টিপটিপ করে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলেই আমি কালিম্পং এর লাভার চূড়ায় চলে যাই যেন! যেদিন শেষ বিকেল আর সন্ধ্যাটা আমার কাছে ছিল অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের হাতে ধরা দেয়ার মত। বেশ আগে থেকেই, বিশেষ করে যখন থেকে পাহাড়ে যাওয়া শুরু করেছি, তখন থেকে এই স্বপ্নটা চুপিচুপি বহুবার দেখেছি, একদিন শেষ বিকেলে কোন এক পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িয়ে থাকবো, পুরো পাহাড় জুড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরবে, পাতায় পাতায়, পাহাড়ে পাহাড়ে, গাছে গাছে তার টুপটাপ শব্দ একটা মূর্ছনা ছড়িয়ে দেবে। 

একটা হালকা জ্যাকেট গায়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে দাড়িয়ে থাকবো বৃষ্টি ভেজা আর বৃষ্টি ঝরা পাহাড়ের চূড়ায়, কোন কোন পাহাড়ের গায়ে গায়ে ভেসে বেড়াবে টুকরো টুকরো সাদা মেঘের ভেলা, কোন কোন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ঠাই নেবে সন্ধ্যাকালের ধোঁয়া ধোঁয়া ঘন কুয়াসা, আর যেখানে বৃষ্টি শেষ হয়ে গেছে দূরের কোন পাহাড়ে সেখানে একত্রে আলিঙ্গনাবদ্ধ হবে মেঘ-কুয়াসা আর শেষ বৃষ্টির ছোঁয়া। সবকিছু মিলে একাকার হয়ে যাবে। সবুজ, স্নিগ্ধ, ভেজা ভেজা, বিশুদ্ধ পার্থিব পৃথিবী হয়ে উঠবে অপার্থিবতায় ভরা। 

ঠিক তেমনই এক অপার্থিব শেষ বিকেলের সেই বৃষ্টিস্নাত পাহাড় চূড়ায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবো মেঘ-পাহাড়-কুয়াসা আর গাছের লতায় পাতায়, জানালায়, গ্রিলে ঝুলে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা, হাতে থাকবে গরম ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, তেমন অপার্থিব মুহূর্তে ধোঁয়া ওঠা কফির মগের সাথে নিজেকে হারিয়ে ফেলবো পুরনো স্বপ্ন সত্য হবার আনন্দে, আকুলতায় আর অজানা সুখে। 

ঠিক ঠিক আর ঠিক এমন স্বপ্নের মত করেই, এমন ভাবনা আর কল্পনার মত করেই পেয়েছিলাম লাভায় পাহাড় চূড়ায় এক বৃষ্টি ভেজা, কুয়াসা ঘেরা, মেঘে ভেসে বেড়াবো আর ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ কফির মগ হাতে নেয়া একটা বিকেল। এক স্বপ্ন সত্য হওয়া শেষ বিকেল। এক অপার্থিব জগতের পার্থিবতায় ধরা পরে যাওয়া সন্ধ্যা।    

এরপর যখনই ঝিরঝিরে বৃষ্টির ধারা গুলো বড় বড় ফোঁটা হয়ে, মুষলধারে ঝরতে শুরু করে, ভীষণ ভীষণ বেগে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়, আকাশের ঘন কালো অন্ধাকার মেঘে মেঘে ঘর্ষণে যখন বিদ্যুৎ চমকায় তখন একটা অজানা আনন্দের সাথে একটা দুঃসহ সৃতি চোখের সামনে এসে পরে। শরীরের সমস্ত রোমকুপ গুলো ভয়ে, রোমাঞ্চে আর নিজেকে নিয়ে বেঁচে ফিরতে পারার আনন্দে আত্মহারা করে দেয়। 

এই ঘটনা ঘটেছিল সান্দাকুফু থেকে ফেরার সময়। সান্দাকুফুর স্মরণীয় সকাল শেষে যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যখন সান্দাকুফুর শেষ মানুষটি পর্যন্ত চলে গেল তার আপন উদ্দ্যেশ্যে, যখন পুরো সান্দাকুফু প্রায় জনমানবহীন হয়ে পরলো, আর সেই সাথে ঝকঝকে আকাশ হুট করে ঢেকে গিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো, তখনই মনের মধ্যে উথাল পাতাল শুরু হয়ে গেল, আমাকে ফিরতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব টুমলিং হয়ে মানেভাঞ্জন গিয়ে রাতে থেকে সকালে শিলিগুড়ি পৌঁছে, বাংলাবান্ধা যেতে হবে, বাড়ি ফিরতে হবে। 

ব্যাস একা একাই শুরু হল পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, বৃষ্টিকে সাথে করে নিয়ে এক নিঃসঙ্গ পথচলা। যে পথ চলা নীরব আর নিরীহ নিঃসঙ্গতার পরে রূপ নিয়েছিল বিভীষিকায়। সান্দাকুফু থেকে কালোপোখারি হয়ে পরের গাইরিবাসের পথ ধরতেই শুরু হয়েছিল তুমুল, তুমুল আর পৃথিবীর সবকিছু ভেঙেচুড়ে ফেলা ঝড় আর বৃষ্টি। যে তুমুল বৃষ্টিতে নিজের সামনে হাত বাড়ালে সেই হাতকেই দেখা যাচ্ছিলোনা! 

রাস্তা দেখতে পারা তো অনেক দূরের ব্যাপার আর সেই সাথে তুমুল ঝড়ো বাতাস। আর এই ঝড় বৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের মাটিতে পা না দিয়ে পা দিয়েছিলা খাঁদে! এরপর ব্যাস, উড়ে গিয়ে কোথায় পরেছিলাম বৃষ্টিতে কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু মনে পরে বেঁচে ছিলাম আর তারপর ধীরে ধীরে পাথর, পাহাড় আর গাছের লতাপাতা শিকর ধরে উপরে উঠেছিলাম। শেষ পর্যন্ত বেঁচে বাসায় ফিরতে পেরেছিলাম। 

আর বৃষ্টি যদি রাতে হয়, যদি শুরু হয় মাঝরাতে সাথে যদি থাকে দমকা হাওয়া, কালবৈশাখী ঝড় আর যদি থাকে বিদ্যুৎ চমক তাহলে আমি নিজের অজান্তেই হারিয়ে যাই, সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে পরে গিয়েই বেঁচে ফেরা সেই রাতের কাছে। যে রাতে টুমলিং ফিরে, ওদের সেবা আর আপ্যায়ন পেয়ে, অনেক রাত পর্যন্ত ওদের রান্না ঘরের চুলার কাছে বসেছিলাম সাধের উডল্যান্ড সুকাতে আর নিজের শরীরে কাঠের আগুনের উত্তাপ নিয়ে ভিতর থেকে উষ্ণ হয়ে স্বাভাবিক হতে। তখনও বৃষ্টি ঝরছিল অনবরত, অবিরত আর বিরামহীন। 

কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার পরে যখন কাঠের দোতালার রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ডাবল কম্বলটা টেনে দিয়েছিলাম। আর বাইরের বৃষ্টি টিনের চালে ঝরে পরায় রিমঝিম গান শুনছিলাম। হুট করেই রিমঝিম বৃষ্টির সাথে দুমদুম করে শিলাবৃষ্টি, সাথে ঝড় আর মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। সেই যে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল, সারারাত ধরে একই ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো। একই ছন্দে আর একই রকম অবিরাম ধারায়। যেন সারা পৃথিবীর বৃষ্টি সেদিন রাতে শুধু টুমলিং এর পাহাড়ের জন্যই বরাদ্দ ছিল! হায়রে সে কি বৃষ্টি, এমন বৃষ্টির ফোঁটা, এমন অবিরাম ঝরে যাওয়া আর এমন করে একা একা বৃষ্টির সুখ উপভোগ করা যায় আগে কখনো অনুভব করিনি।

কি যে একটা অব্যাক্ত আনন্দ হচ্ছিল সেদিন টুমলিং এর পাহাড় চূড়ায়, পাহাড়ি ঘরে, টিনের চালে, তুমুল বৃষ্টির ছন্দে বলে বা লিখে বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। ছোট্ট কাছের জানালায় কতক্ষণ যেন হাত দিয়ে ছিলাম বৃষ্টিকে আলতো স্পর্শ করে দেখতে, বুঝতে আর অনুভব করতে। বাইরে ঝরে যাওয়া বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা দেখতে, জানালার কাছে জমে যাওয়া বৃষ্টির রেশে আঁকিবুঁকি করতে। সে এক অনন্য অনুভূতি, আগের সন্ধ্যায় নতুন জীবন পাওয়ার অব্যাক্ত সুখ, আর এমন করে আবার বৃষ্টি উপভোগ করতে পারছি সেই বিস্ময়! 

ইচ্ছে হচ্ছিল যদি এমন বৃষ্টি ঝরতে থাকতো, কয়েকদিন ধরে, যদি এই টুমলিং এর পাহাড়ের চূড়ায়, টিনের চালার বাড়িতে অবিরত ঝরতে থাকা বৃষ্টিতে থেকে যাওয়া যেন আরও কয়েকটা দিন! বৃষ্টিযে এতো আনন্দের, এতো সুখের আর এতো এতো উপভোগের হতে পারে সেদিন বুঝেছিলাম, উপলব্ধি করেছিলাম আর অনুভব করেছিলাম। টুমলিং এর পাহাড় চূড়ায়, রাতভর ঝরে যাওয়া বৃষ্টি দেখে, গান শুনে আর উপভোগ করে।  

তাই আজকাল বৃষ্টি এলেই মনে পরে যায়, সৃতির জানালার কপাট খুলে যায়, একটা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়, কখনো লাভার বৃষ্টি ভেজা পাহাড় চূড়ায়, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে, কখনো সান্দাকুফু থেকে ফেরার সময় তুমুল বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসে পাহাড় থেকে পরে গিয়ে ফিরতে পারার বিস্ময়ে আর কখনো টুমলিং এর সেই অবিরত ঝরতে থাকা মুষলধারার বৃষ্টিভেজা রাতের কথা মনে পরে। 

বৃষ্টি আর কতশত সুখ-দুঃখ-বিস্ময় আর অনন্য অনুভূতির স্মৃতির ডালি।