প্রথমবার বৌ-বাচ্চা নিয়ে দেশের বাইরে গেলাম। আমার দেশের বাইরে বলতে ওই যা বোঝায় আর কি! ভারতবর্ষ পর্যন্তই আমার দৌড়াদৌড়ি আর লাফঝাঁপ, সে সবাই এতদিনে কমবেশী জানেন।

কারন কি?

কারন ও একটাই, বিমান ভাড়া দিয়ে কোথাও যাবার সাধ আর সাধ্য কোনটাই এখনো হয়নি বলে। তো বেশ গেলাম প্রথমবারের মত বৌ, বাচ্চা নিয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে। মন-প্রান স্বভাবতই বেশ খানিকটা উত্তেজনায় টগবগ করছে। তার উপর আছে ছেলের মায়ের নানা রকম টিপ্পনী। কলকাতায় আমার কে আছে না আছে! এতো শতবার আসি দুইদিন পরপর। সেসব কে আজকাল আর পাত্তা দেইনা, যা বলে বলুক গা। আমার কি আসে যায়, কেউ নিজের যায়গায় অন্যকে দার করিয়ে দেখলে!

তো কলকাতায় আসার বেশ কয়েকদিন আগে, নানা রকম কাপড়-চোপড়ের সাথে ছেলের সাথে মিলিয়ে একটা বেশ আরামদায়ক জিন্সের হাঁফ প্যান্ট কিনেছিলাম। বাসায় নিচে, যেতে আসতে, নানা রকম ঠুনকো কাজে সেই প্যান্টটা পরতে লাগলাম কয়েকবার করে। কারন আর কিছুইনা ট্রায়াল দেয়া আর কি?

মূলত ওটা ছেলের সাথে কলকাতার রাস্তায় হেটে বেড়ানোর জন্যও কেনা। গরমের দিন, বাতাসের ব্যাপার-স্যাপার আছে! আর আছে ছেলের মাকে নিয়ে নিউ মার্কেটে গিয়ে মাথা গরম হয়ে যাবার মত ব্যাপার-স্যাপার। মেয়েদের সাথে ছেলেদের নিউমার্কেটে গেলে যা হয় আর কি! তার উপর কলকাতা নিউমার্কেটের মাদকতা বলে কথা। ছেলেদের মাথাই ঠিক থাকেনা, মেয়েদের তো বদ্ধ উন্মাদ হবার জোগাড় হয়!

তো কলকাতা যাবার দুই একদিন আগে ছেলের মা, আমাকে ওই প্যান্ট পরতে দেখে বলেই ফেলল, এই প্যান্ট যেন আবার কলকাতায় নিয়ে না যাই। আমি চুপ, সময় হলে দেখা যাবে, মনে মনে ভেবে রাখলাম। আর কাপড় চোপড় গোছানোর সময়, চুপচাপ নিজের কাঁধ ব্যাগে সেই সাধের হাঁফ প্যান্টটা ধুঁকিয়ে রাখলাম।

কলকাতায় প্রথমবার, পৌছাতে পৌছাতে সেই সন্ধ্যা। আগেই ঠিক করে রাখা হোটেলে চেকইন। ফ্রেস হওয়া, হালকা বিশ্রামের পরে, প্রথমবার কলকাতার রাস্তায় ছেলের সাথে পা রাখা। ছেলে এমনিতেই শত শত প্রশ্নের করে যায় সব সময়, কিন্তু এখন সেই শত প্রশ্ন হাজার ছাড়িয়ে লাখে পৌঁছেছে! কলকাতা আর তার নানা রকম চকলেট, আইসক্রিম, কেক, বিস্কিট, পিঁজা, বার্গারের আকর্ষণে আর আছে মটু-পাতলুর দেশ বলে কত যে প্রশ্ন?

পরদিন। বেশ একটা হালকা দিন। আজকে শুধু ঘোরাঘুরি, একটু এদিক-সেদিক হেটে বেড়ানো, এখানে-সেখানে এটা-ওটা খাওয়া, ছবি তোলা আর ছেলের সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়া। কাল সন্ধ্যায় ফ্রেস হয়েই ডাক্তার দেখানোর প্রাথমিক কাজ শেষ করা হয়েছে। বেশ ভালো হয়েছে একদিন বেঁচে যাওয়াতে বা কম লাগাতে। তাই আজ শুধু কলকাতা দেখা।

তো ছেলে আর আর ছেলের মা রেডি হচ্ছে আর ছেলে আমাকে তাড়া দিচ্ছে কেন এখনো রেডি হচ্ছিনা? আমি কি তবে ঘুমিয়েই থাকবো নাকি? ছেলের ঝাড়ি আর তার মায়ের চোখ রাঙানি দেখে উঠতেই হল। হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হচ্ছি।

প্রায় রেডি আমি, শুধু প্যান্ট পরা বাকি আছে। নানা রঙের সাঁজের পরে, মিরপুর-১০ গোলচক্কর থেকে কার্টুনের মধ্যে থেকে কেনা সেই সাধের জিন্সের হাঁফ প্যান্ট বের করলাম কাঁধ ব্যাগ থেকে। ছেলের মাতো সেটা দেখেই জ্বলে উঠলো!

মানে কি তুমি এই প্যান্ট লুকিয়ে নিয়ে এসেছো?

আমি চপু।

এটা পরেই বাইরে যেতে চাও নাকি আমাদের সাথে?

লোকে দেখে কি ভাববে? কিভাবে তাকাবে? কি আলোচনা করবে ভেবেছ একবার?

আমি এবারও চুপ।

আরে এগুলো তো ফরেনাররা পরে, তুমি নিজেকে কি আরও খেলো করতে চাও সবার কাছে?

এইবার আমি মুখ খুললাম...

আচ্ছা সবই বুঝলাম, কিন্তু কারা যেন এই প্যান্ট পরে বললে?

ফরেনাররা মানে বিদেশীরা, বাংলায় কি বুঝলে?

এই তো এখানেই তো ভুল করলে তুমি।

আমি! আমি এখানে কি ভুল করলাম?

ওই যে বললে, কারা যেন পরে এই প্যান্ট আর একবার বল তো?

কেন ফরেনাররা, বিদেশীরা।

আচ্ছা, তাই যদি হবে তবে তো ঠিক-ই আছে। আমি এই প্যান্ট পরে বাইরে যেতেই পারি।

কিভাবে? তুমি কি ফরেনার?

নয় তো কি!? ভেবে দেখ!

হোয়াট ডু ইউ মিন?

ইউ প্লিজ ট্রাই টু রিয়ালাইজ, হোয়াট আই মিন, নট ইনডিড, হোয়াট আই আম নাউ?
আমি তো এখন এই দেশে ফরেনারই, নাকি?

এরপর আমার দিকে হতভম্বের মত তাকিয়ে থেকে বলিল, পর যা খুশি, আমার কোন আপত্তি নাই।

আমিও সেই জিন্সের হাঁফ প্যান্ট পরে ছেলের হাত ধরে হেলেদুলে বেরিয়ে পরলাম।

তবে, তবে, তবে...

আমার এই হাঁফপ্যান্ট পরার পিছনে আর একটা অন্যতম কারন আছে, সেটা কেউ যানেনা, কাউকে বলিনি!

কি সেটা?

সেটা হল...

আমার এক বন্ধু সদ্য কলকাতা এসেছিল। তো সে নাকি পুরো কোলকাতাজুড়ে শুধু ছেলেদের আন্ডারওয়ার পরা বিল বোর্ড-ই দেখেছে আর কিছু নাকি সে কোলকাতাতে দেখতে পায়নি! বা তার চোখে নাকি আর কিছু পড়েনি কোলকাতাতে!

সে নাকি যেখানেই গেছে, চোখে শুধু সুন্দর সুন্দর ছেলে আর তাদের আন্ডারওয়ার পরা বিলবোর্ডই দেখেছে তাকিয়ে তাকিয়ে! কি জানি তার কি সমস্যা ছিল জানিনা। তাই আর কি আমার ছেলের মায়েরও যেন সেই অবস্থা না হয়, আর তার সাথে সাথে আমাকেও বিব্রত হতে নাহয় সেজন্য এই ব্যাবস্থা আর কি?

কারন আমি জানি, আমার এই প্যান্ট পরা দেখলে সে এতই বিরক্ত থাকবে যে আর কোথাও ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারবেনা, সেই সময় আর মানসিকতাই তার থাকবেনা।

সেজন্যই এই বিদেশী ফরেনারের বেশ আর জিন্সের হাঁফ প্যান্ট এর অবতারণা আর কি?