লেখা ও ছবি- নুরজাহান মোস্তফা শাকুরা 

ঘটনার শুরু না যাবার পরিকল্পনা থেকে!!
এরপর কী থেকে যেন কী কী হয়ে গেলো, যাবার দিন সকালে নিশ্চিত হলাম ‘আমি যাচ্ছি’ 
জীবনে প্রথম ক্যাম্পিং করবো, তাই অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছিলো।
ভ্রমনসঙ্গীরা আমার পূর্ব পরিচিত, তাই নিশ্চিন্তে পা বাড়ালাম পথে...


মিরপুর-সদরঘাটের অসহ্য যাত্রা শেষ করে চড়ে বসলাম রাঙাবালি যাওয়ার লঞ্চে। ডেকে বসে আমজনতার লঞ্চ যাত্রা স্টাইল দেখার মাঝে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা অর্জন হচ্ছিলো। সাথে আকাশে প্রাক পূর্ণিমা চাঁদ, নদীর জল, হিম শীতল ঠান্ডা বাতাস, ব্যাপক খাইদাই আর অনাবিল আড্ডায় কীভাবে কীভাবে যেন রাত কেটে গেলো। সকালের সূর্যোদয়ে ঘুম ভাঙলে দেখলাম শান্ত নদীর দুই পাড়ের হৃদয়হরা প্রকৃতি। একদম স্নিগ্ধ এক পরিবেশের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন ঘাটে ভিড়তে ভিড়তে সাড়ে এগারো নাগাদ চলে গেলাম গন্তব্যে।


তখন আমাদের জন্য ঘাটে অপেক্ষা করছিলো স্থানীয় রুটে চলা দোতলা একটা লঞ্চ। দলের অনেকে মিলে ক্যাম্পের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহে ব্যতিব্যস্ত, কেউবা তেতুলিয়া পাড়ের সৌন্দর্য্য আস্বাদনে অথবা কাছের তরমুজ ক্ষেতের আবাহনে ফটোশ্যুটে তৎপর। পানি, লাকড়ি, হাঁড়ি-পাতিল, রান্নার মসলা, ইলিশ মাছ, মুরগি সব লঞ্চে ওঠার পর চটজলদি লাঞ্চ সেরে আমরাও প্রস্তুত। গন্তব্য সোনারচর। 


নদী পেড়িয়ে ছোট খালে প্রবেশ করা মাত্রই মনে হলো সুন্দরবনে আসলাম।
একদম সোনারচর বন বিভাগের বিট অফিসের ঘাটে গিয়ে লঞ্চ ভিড়লো,
বিট অফিসারের আপ্যায়ন গ্রহন করে তাদের প্রদত্ত ছোট ট্রলারে (ভাটা এসেছে বিধায় আমাদের লঞ্চ খালে প্রবেশ করতে পারবে না) করে চলে এলাম স্বপ্নের সোনারচরে।

সূর্য প্রায় অস্তগত, খুব দ্রুত তাঁবু তৈরি আর রান্নার বন্দোবস্তে সবাই হাত লাগালো। খুব আমোদপূর্ণ ছিলো সেই পরিবেশ। অতঃপর সাগর দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো...
ক্যাম্প ফায়ার জ্বলে উঠলো, সাথে প্রতিটা তাঁবুতে টেন্ট ল্যাম্প।
আর আকাশে রূপোর বিশাল এক থালা সদৃশ পূর্ণিমার চাঁদ!
আমরা তো ঝালমুড়ি খেতে খেতে আনন্দে মশগুল, তখনো জানিনা সামনে কী আছে!

জোয়ার আসার পরপরই সাগরের পানি হুহু করে বাড়তে লাগলো, আচমকা আকাশ ঘনকালো মেঘে ছেয়ে জ্যোৎস্নার আলোকেও কালো করে দিলো।
মুঠো ফোনের বার্তায় জানলাম সারাদেশে ব্যাপক কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে।
আমরা তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়। কিন্তু সবার মাথা ঠান্ডা। কিছুক্ষন পরেই আবার আকাশ পরিষ্কার, ভয় কেটে গেলো।


কিন্তু না, ক্ষনিক পরেই আবার কালো মেঘের ঘনঘটা, সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানি, এদিকে রান্নাও চলছে সমানতালে। এক পর্যায়ে চুলা ডুবে গেলো, তাঁবু পর্যন্ত পানি চলে এলো। দুইটা তাঁবু স্থানান্তর করতে হলো, আর বাকিগুলো পানি ছুঁই ছুঁই অবস্থায়। প্রকৃতি আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছিলো। ঝড়-বাতাস-বৃষ্টি, সব হবে হবে করেও হচ্ছিলো না, যদিও ৩ শিশু, ৫ নারী সহ ২২ জন সদস্যের দল সকল পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। আমরা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি প্রয়োজনে নিরাপদ স্থলে যাবার জন্য।

আনন্দের বিষয় ছিলো, সাগর পাড়ের ক্যাম্পের পাশেই এক খালে আমাদের লঞ্চ চলে এসেছে। মাঝখানে এক ঘন ঝাউবন। আমরা এটুকু নিশ্চিন্ত, লঞ্চে ফিরে যেতে আমাদের ১০ মিনিট লাগবে, তারপরেই আমরা নিরাপদ। তাই কেউই ভয়ে আক্রান্ত নই কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত। এক ফাঁকে ডিনারে খিচুড়ি খেয়ে নিলাম, এখানেও মজার অভিজ্ঞতা, সাগরের পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে খিচুড়ি খাওয়া। গরম খিচুড়ি মুখে দিচ্ছি আর ঠান্ডা জলের ঢেউ এসে পায়ের উপর আছড়ে পড়ছে। আহা! সে কী অনুভূতি।
একে একে ইলিশের বারবিকিউ হয়ে গেলো, চিকেন বারবিকিউ তৈরি হচ্ছে। 


একবার আকাশের দিকে আরেকবার সাগরের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চলছে। রাত সাড়ে এগারো নাগাদ যখন বোঝা গেলো পরিস্থিতি নিরাপদ, নিশ্চিন্তে সবাই ঘুমাতে চলে গেলো...
পরেরদিনের সকাল এলো নতুন বার্তা নিয়ে,
সূর্যোদয়ের পর ফ্রেশ হয়ে চললো চর ভ্রমন, স্যুপ-ন্যুডুলস খাওয়া আর ফটোসেশন। রোদ বাড়ার আগেই ক্যাম্প সাইট গুটিয়ে লঞ্চে ফিরে যাওয়া।
ও হ্যাঁ, আমরা কিন্তু সকল আবর্জনা বিশেষ করে অপচনশীল ও প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য আগুনে পুড়িয়ে ও নোংরা কুড়িয়ে মাটিচাপা দিয়ে এসেছি।
লঞ্চে চড়ে রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্যে। 


আবহাওয়ার চূড়ান্ত খারাপ অবস্থায় তেতুলিয়া নদীতে পড়লাম ভয়াবহ রোলিং এর মুখে, বিশাল বিশাল ঢেউ আর স্রোতের পাক কেটে লঞ্চের নাবিক দক্ষতার সাথেই চালাচ্ছিলো। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে আমরা লাইফ জ্যাকেট পড়ে ও বয়া হাতে নিয়ে সবাই প্রস্তুত। লঞ্চ দুলছিলো ব্যাপক আকারে সাথে আমরাও মজা করে দুলছিলাম আর ব্যাপক খাইদাই করছিলাম। মাঝে চর মন্তাজে ছিলো চা পানের বিরতী। সেখানে দেখলাম জেলেদের জীবন, শুটকি পল্লী ও সাধারন চরবাসীদের মানবেতর জীবনযাপন।


যাই হোক, অনেক পরে যাত্রার সমাপ্তি।
এরপর লোকাল ভটভটি, খেয়ানৌকা, বাস, ইজিবাইক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে পটুয়াখালি থেকে ঢাকার ফিরতি লঞ্চ ধরলাম।
জীবনের প্রথম ক্যাম্পিং ছিলো কল্পনার চাইতেও বেশি এডভেঞ্চারাস।
এক ট্রিপে যতো অভিজ্ঞতা সম্ভব তার সবই ছিলো এখানে।
পুরো প্যাকেজ ট্রিপ, জীবনের জন্য খুব ভালো রকম শিক্ষামূলক।
সকল ভ্রমসঙ্গীদের সাহচর্য, সহযোগিতায় প্রতিটা মুহুর্ত ছিলো উপভোগ্য।
ইনশা’আল্লাহ!ভবিষ্যতে আবারও এমন কোন ট্রিপে যাবার ইচ্ছে আছে।

এই ট্রিপে আমাদের জনপ্রতি খরচ হয়েছিলো মাত্র ৩৫০০ টাকা।
ভ্রমন রুট ছিলো ঢাকা-রাঙাবালি-সোনারচর-গলাচিপা-পটুয়াখালি-ঢাকা।

** প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনে দুশ্চিন্তার কিছু ছিলোনা। আমাদের লঞ্চে একটা টয়লেট ছিলো। আর লঞ্চ ছিলো ক্যাম্পসাইট থেকে হাঁটা দূরত্বে। প্রয়োজনে সেখানেই যাওয়া হয়েছে।
** যেখানেই ভ্রমন করতে যাই, পরিবেশ-প্রকৃতি নষ্ট না করে পরিষ্কার রাখতে চেষ্টা করি। সকলেরই করা উচিত।