কিছুদিন আগে ভিসাটা শেষ হয়ে যাবারা পূর্ব মুহূর্তে, ভিসাটার পূর্ণ আর পর্যাপ্ত ব্যবহারের জন্য হঠাৎ করেই পরিকল্পনা করে ফেললাম অনেক হয়েছে পাহাড়, নদী, বরফ আর অরন্যে ঘুরে বেড়ানো। এবার তবে একটু সমতলের কোন যায়গায় যাবো। কোথায় যাই, কোথায় যাই?

সময়ও ভীষণ অল্প, বাজেট তার চেয়েও ঢের কম আর তার চেয়েও কম পারিবারিক ভিসার মেয়াদ আর অফিসের ছুটি তো নেই বললেই চলে! তাহলে? কোথায়, কিভাবে আর কতদিনের জন্য? একটু এদিক-ওদিক ভেবে খুঁজে পেলাম আরে সময়, অর্থ, ছুটি, সাধ আর সাধ্যর সবকিছু মিলিয়েই তো নতুন একটি বা দুটি যায়গায় ঘুরে আসা যায়! তবে কোথায় সেটা?

খুঁজে পেলাম রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর আমার বরাবরের একটু বেশি ভালোলাগার দরিদ্র নজরুলের জন্মস্থান কবিতীর্থ চুরুলিয়ার সন্ধান। খুঁজে পেতে দেরি আছে, কিন্তু আমার যাবার প্রস্তুতি নিতে আর দেরি নেই। অফিসে একদিন, বাসায় তিনদিন আর অন্যদেশে ভ্রমনের জন্য বলতে গেলে প্রায় বাজেটহীন একটি ভ্রমনে বেড়িয়ে পরলাম, আমার মতই আরও একজন উন্মাদ ভ্রমণগ্রস্থকে নিয়ে! কোথায়, কিভাবে, কত খরচ করে, আর কোথায়, কিভাবে ধরা খেয়ে এই ভ্রমণ শেষ করেছি সেই গল্প তো ইতিমধ্যেই বলা হয়ে গেছে। তাই আজকে শুধু সুখী রবীন্দ্রনাথ আর দুঃখী নজরুলের গল্প বলবো।

একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রশান্তির শান্তিনিকেতন আর একদিন নজরুলের চুরুলিয়া ঘুরে তার সারমর্ম যদি আমাকে করতে বলা হয় তো আমি বলবো, “সুখ যদি হয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তবে দুঃখ!” সত্যিই তাই। দুজনের জন্ম, বড় হওয়া, বেড়ে ওঠা, সামাজিক, পারিবারিক আর আর্থিক ইতিহাস তো আমরা সবাই কম বেশি জানিই। কিন্তু তাই বলে যে এই সময়ে এসেও সেই ইতিহাস একই রকম থেকে যাবে সেটা ভাবতেই পারিনি। এই যেন সেই শতেক বছর আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যের দুই কিংবদন্তীর সামগ্রিক অবস্থান। হোক সেটা সামাজিক, আর্থিক আর বর্তমান প্রেক্ষাপটের অবস্থান বিবেচনায়।

আমরা সবাই কম বেশি, এখনো মনে একটু সুখ সুখ অনুভুতির আবেশে পরলেই গুনগুন করে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাই। পারিবারিক ভাবে খুব সুখী যারা, সময় পেলেই, ঘুমের আগে, আধো আলো আর আধো অন্ধকার ঘরে ক্ষীণ রবীন্দ্র সংগীতের সুর বাজিয়ে দেই। প্রেমে পরলে, কাউকে ভালো লাগলে, বা গোপনে ভালোবাসে ফেললে, সকাল, দুপুর, সন্ধায় বা রাতে রবীন্দ্র সঙ্গীতে হারিয়ে যাই, নিজের অজান্তেই। যাদের পড়ার অভ্যেস এখনো আছে সময় পেলেই সংগ্রহে থাকা রবীন্দ্র রচনাবলীতে চোখ বুলাই, হয় গল্প, নয় উপন্যাস আর কবিতা যাদের ভাললাগে তাদের তো ক্ষণে ক্ষণে তার কবিতা থাকেই ঠোঁটে।

আর যাদের আরও সময় আছে, আছে ইচ্ছে হলেই একটু বেড়িয়ে যাবার উপায়, আছে পারিবারিক আর আর্থিক সঙ্গতি তাদের তো একটু প্রশান্তি মানেই শান্তিনিকেতন! শান্তিনিকেতনর আকাশে-বাতাসে, গাছের পাতায়-পাতায়, সবুজে-শিশিরে, ঘাসে-ঘাসে, লতায়-পাতায়, মাঠে-ঘাটে, নতুন-পুরনো স্থাপনায়, আমের মুকুলে, বকুলের গন্ধে, গাঁদা, আর হাসনাহেনার ঘ্রাণে, পাথরে-মাটিতে, ধুলোয়-কাঁদায়, বর্ষায়-বসন্তে, শীতে-শরতে, প্রতিটি ঋতুতে, ক্ষণে আর কোণে যেন সুখ আর সুখ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।

তাই তো বাঙালির সময়-সুযোগ আর সাধ্যে মিলে গেলেই ছুটে ছুটে শান্তিনিকেতনে যায়, একটু শান্তি আর কিছুটা প্রশান্তির খোঁজে। মোট কথা কারো অপার্থিব কোন সুখের বা শান্তির প্রয়োজন হলেই কোন না কোন ভাবে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে। ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম সুখ আর শান্তি মানেই বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু এবার যদি বাংলা সাহিত্যের আর এক কিংবদন্তির দিকে তাকাই, যদি যাই মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে আর এক অবিস্মরণীয়, বরন্য সাহিত্যিক নজরুলের দ্বারে? কি দেখতে পাবেন জানেন? যদি দেখতে যান, যদি সময় দেন আর যদি একটু অনুভব করেন, তবে দেখতে পাবেন সেখানে শুধু দুঃখ আর দুঃখ, কষ্ট আর কষ্ট, অবহেলা আর অপমান, হেলায় হারানো দিনক্ষণ। দেখতে পাবেন নজরুলের জন্মের সময়ে সেই যায়গার যে দরিদ্র অবস্থায় ছিল, যে সামাজিক আর পারিবারিক দৈন্যতা ছিল, এখনো যেন ঠিক তেমনই আছে! বরং সেই সময়ের চেয়েও দুঃস্থ, দুর্দশাগ্রস্থ, অবহেলিত আর অবর্ণনীয় অবস্থায় সবকিছু পরে আছে।

চুরুলিয়ার বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, মানুষের জীবন-যাপন, রুক্ষ রুগ্ন গ্রাম, দৈন্যতায় ভরা চারদিক, গাছপালা, রাস্তা, পুকুর, ধুলোবালি, ভঙ্গুর অবকাঠামো, জরাজীর্ণ নজরুলের বাড়ি, সংগ্রহশালা, দেখাশোনা, পরিচর্যা, সবকিছুতেই অনাদর, অবহেলা আর অজস্র অনাহূত সৃতির উপস্থিতি যেন! যাকে কেউ চায়না তবু জোর করে টিকে থাকা, যাকে কেউ দেখেনা, তবুও যেন অনিচ্ছায় সৃতিদের বেঁচে থাকা! জোর করে বেঁচে থাকার চেষ্টা। কোথাও কোন যত্ন নেই, কোন আদর বা আহবান নেই, নেই কোন ভালোবাসার স্পর্শ নেই এতোটুকু। চারদিকে শুধু অভাব, অনটন, অনাদর, অবহেলা আর অথৈ কষ্টের হাহাকার!

এখানে গেলে ভালো মন নিমিষেই বেদনায় বিলিন হয়ে যাবে, মনের মধ্যে যদি কোন সুখ থেকে থাকে তবে সেটা দুঃখে পরিণত হবে, যে আশা নিয়ে যাবেন সেটা নিরাশায় রুপ নেবে নিমেষেই। মনের অজান্তেই মনের মধ্যে গুমরে উঠবে, অজান্তেই বুক ভরে কষ্টের দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসবে, নিজের অবচেতন মনেই একটা হৃদয় ভার হয়ে থাকা অনুভুতি আপনাকে গ্রাস করবে। ইচ্ছে করবে যেন ছুটে পালাই, ক্ষণিকের মধ্যেই! কিন্তু আপনি পালাতে চাইলেই পালাতে পারবেন না।

চুরুলিয়ার গ্রাম, গ্রামের ভাঙা রাস্তা ঘাট, ধুলো, আবর্জনা, হত দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অনুন্নয়নের হাহাকার তোলা আকাশ, বাতাস, প্রকৃতি, পুকুর, নদী আর যানবাহন সবকিছু আপনাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে। আপনি চাইলেও সেই দুঃখ, কষ্ট আর অনন্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন না। সেটা সম্ভব নয়।
এখানে শুধু দুঃখ আছে সুখ নেই কোন, কষ্ট আছে আনন্দ নেই, বিষাদ আছে উচ্ছ্বাস নেই, অন্ধকার আছে আলো নেই, যন্ত্রণা আছে তার কোন প্রলেপ নেই, শুধু মনের মধ্যে একটা অনন্ত কষ্ট বয়ে নিয়ে ফিরতে হবে।

ঠিক যেখানে এক দমই উল্টো অনুভুতি দেবে আপনাকে প্রশান্তির শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথের সৃতি বিজড়িত সবকিছু। এখানে শুধু সুখ ছড়ানো, হাসি আর আনন্দ এখানে সেখানে, উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা প্রতিটি কোণে, ভালোলাগা আর ভালোবাসা সবখানে, প্রেমের আকর্ষণ যেন সমস্ত শান্তিনিকেতনের সবকিছু জুড়ে!

শেষমেশ বলতে ইচ্ছে করে, হায় একই বাংলার দুই সাহিত্যিকের কি উল্টো ধারার চিত্র আঁকা, একজনের সুখে ভাসে তো অন্যজন দুঃখে কাঁদে, একজন জ্যোৎস্না দেখে তো অন্যজন রোদে পোড়ে, একজন সুখের স্রোতে তো অন্যজন অনন্ত ভাটায়।

তবুও আমি বলি কি প্রশান্তির শান্তিনিকেতনে যারা যাবেন, একটি দিন রাখুন না দরিদ্র, অনাদর আর অবহেলায় পরে থাকা নজরুলের জন্য, ঘুরে আসুন না একটু কবিতীর্থ চুরুলিয়ায়। শোধ হোক কিছুটা দায়ের, যদি থেকে থাকে।

তাই আমার কাছে এই দুজনের সৃতি, সৃষ্টি আর জীবন-যাপনের সারমর্ম এমনই, দুজনের সৃতি বিজড়িত দুই যায়গায় ঘুরে এসে...

সুখ যদি হয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তবে দুঃখ!!