সাগর মাপা, মহাদেশ আবিষ্কার করা এবং সেখানে আধিপত্য বিস্তার করার বিপজ্জনক অভিযানে নামাই সে আমলের উচ্চাভিলাষী ইউরোপীয় যুবক, নাবিক, রাজপুত্র ও সম্রাটের স্বপ্ন, সাধ ও সংকল্প ছিল। গোলাকার পৃথিবী ঘুরে আসার অভিলাষে ২৫১ নাবিক নিয়ে ক্যাপ্টেন ম্যাগেলান সাগরে নেমেছিলেন। তিন-চার বছর ধরে ঝুলে থাকা সেই অভিযানে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। অভিযান শেষ হওয়ার আগেই তিনি নিহত হয়েছিলেন। পৃথিবী ঘুরে আসতে হলে কতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে তার নির্ভুল হিসাব কারও জানা ছিল না। হিসাবে ১১,০০০ কিলোমিটারের ভুল থাকায় রসদের অভাবে প্রশান্ত-মহাসাগরে অনাহারে নাবিক মরতে থাকে। তার ওপর স্কার্ভি রোগ তো ছিলই। সব ক্ষয়-ক্ষতির পরও কিন্তু অভিযানটি সাফল্যের মুখ দেখেছিল, পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে একটি জাহাজ স্পেন ফিরতে পেরেছিল। অভিযানের শুরুতে যোগ দেয়া সেই ২৫১ নাবিকের মধ্যে তখন মাত্র ১৮ জন বেঁচে ছিলেন।

স্পেনের সে সাফল্যের ৫৫ বছর পর পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার অভিযানে নামেন ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল ‘ফ্রান্সিস ড্রেক’। স্ট্রেইট-অব-ম্যাগেলানে না ঢুকে তিনি প্রশান্ত-মহাসাগরে যাওয়ার বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। টেরা-ডেল-ফুগো ডানে রেখে জাহাজ ক্রমাগত দক্ষিণে চলতে থাকে এবং এক সময় বাত্যাবিক্ষুদ্ধ, উত্তাল, গভীর ও আদিগন্ত বিস্তৃত সাগরে নেমে আসে। সে ১৫৭৮ সালের কথা। এখানেই মিশেছে আটলান্টিক আর প্রশান্ত এ দুই মহাসাগরের পানি। ঝোড়ো হাওয়া আর বিশাল ঢেউ থাকলেও এ পথে স্ট্রেইট-অব-ম্যাগেলানের চেয়ে বিপদ অনেক কম। পালের জাহাজের ক্যাপ্টেন তো জোর-হাওয়াকে ভয় পায় না। তার কাছে ভীতিকর হল বাতাসের অভাব বা ‘ডোলড্রাম’। আর সাগর গভীর হলেই তো নাবিক খুশি; অগভীর হলেই সে প্রমাদ গণে। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে চলাচলের জন্য আজও এটাই জনপ্রিয় পথ। এ পথের আবিষ্কারক ও পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী সেই নাবিকের নামে এর নাম হয়েছে ‘ড্রেক-প্যাসেজ’।

ভোর হতে না হতে বিগল-চ্যানেল ছেড়ে আমাদের জাহাজ ড্রেক-প্যাসেজে নেমে এল।  চারদিক বিক্ষুব্ধ নীল পানি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। কুয়াশা-ঢাকা ঝাপসা আকাশে তাকিয়েও চোখ তুষ্ট হচ্ছে না। প্রচণ্ড দুলুনির জন্য জাহাজের মধ্যে হাঁটা-চলা করা প্রায় অসম্ভব। ঝড়-বাদলে আরব সাগর অশান্ত হলে সার্জেন্ট সাত্তার বলতেন, ‘দরিয়া গরম’। তার কথায় আমরা হাসতাম। আরব সাগরের পানি শীতল; ঝড়-বাদলের সময় আরও শীতল হতো। আজ মনে হচ্ছে, ড্রেক-প্যাসেজ সত্যি গরম। সাগরের পানি ফুলে উঠে জাহাজটাকে নিয়ে এক শত মিটার ওপরে উঠছে। পর মুহূর্তে তা আবার একশো মিটার নিচে নামছে। ইংরেজিতে এমন ঢেউয়ের নাম ‘সোয়েল’। বাংলা কোন শব্দ দিয়ে একে বোঝান যায় তা আমার জানা নেই। ‘গরম’ বললে বোধ হয় কিছুটা ইঙ্গিত দেয়া হয়। বছরের পর বছর স্বেচ্ছায় যারা এমন সাগরে ভেসে থাকতেন তারা না জানি কোন ধাতুতে তৈরি ছিলেন।

ভয়ংকর শীতল পানির এমনই এক গরম দরিয়ার টানে ঘর ছেড়েছিলেন ক্যাপ্টেন জেমস কুক। আড়াই-শত বছর আগের কথা। ব্রিটিশ সরকার তাকে এক অভিযানে পাঠিয়েছিল। সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল যে তিনি প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে মেপে দেখবেন সূর্যের সামনে দিয়ে চলে যেতে শুক্র-গ্রহের কত সময় লাগে। বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের ঐ প্রকাশ্য ‘মিশন’ ছাড়াও সে অভিযানের একটা গোপন মিশন ছিল। তা হল নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করা। অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার অস্তিত্ব তখনও অজানা। প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে অতিকায় এক মহাদেশ থাকার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সবে শুরু হয়েছে। পৃথিবী যে গোল তার নিশ্চিত প্রমাণ হাতে আছে; যে কোন দিকে জাহাজ চালিয়ে দিতে নাবিকের তাই দুশ্চিন্তা নাই। দক্ষিণ-গোলার্ধে নতুন মহাদেশ পাওয়া গেলে নতুন উপনিবেশ হবে। অপর ঔপনিবেশিক শক্তিকে সজাগ না করে কাজটা করতে পারলে মন্দ কি!

১৭৬৮ সালে প্লেমাউথ-পোর্ট ছেড়ে ক্যাপ্টেন কুক সাগরে নামলেন এবং যথাসময়ে তাহিতি গিয়ে শুক্র গ্রহের গতিবিধি মাপলেন। তারপর তিনি শীতল সাগরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। দীর্ঘদিন সমুদ্র-বাসের বড় শত্রু ছিল স্কার্ভি রোগ। সে রোগ প্রতিরোধের জন্য তিনি একটা রেসিপি বানিয়েছিলেন। সে টোটকা রেসিপিটা কার্যকর হয়েছি; তার জাহাজে কোন স্কার্ভি ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে অজানা সাগরে তার জাহাজ নয়া-মহাদেশ খুঁজে বেড়াল। অনেক নতুন দ্বীপ আবিষ্কৃত হল। কিন্তু তার ‘মিশন’ সফল হল না। নিউজিল্যান্ড আবিষ্কার করে তিনি আশান্বিত হয়েছিলেন; ভেবেছিলেন এই সেই কাঙ্ক্ষিত মহাদেশ। কিন্তু ভাল করে দেখে হতাশ হলেন; এ তো দুটি বড় দ্বীপ ছাড়া কিছুই না। তিনি বুঝলেন, দক্ষিণ গোলার্ধে অতিকায় মহাদেশ থাকার থিওরিটা ভুল।  তবুও সে দুঃসংবাদ দিতে তখনই তিনি দেশের পথ ধরলেন না। সাগরে থাকার একটা নেশা আছে তার। তিনি স্থির করলেন সযত্নে অজানা সাগরের ম্যাপ তৈরি করে যাবেন। তা করতে যেয়ে এক সময় তিনি আরও বড় এক দ্বীপে গিয়ে উঠলেন। সে দ্বীপটিকে আমরা আজ অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ বলে জানি।  

ক্যাপ্টেন কুকের অভিযানে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কৃত হলেও দক্ষিণ গোলার্ধে আর একটা মহাদেশ অনাবিষ্কৃত রয়ে গিয়েছিল। মহাদেশটির নাম অ্যান্টার্কটিকা। বরফের তলে লুকিয়ে থেকে এবং চার পাশে ভাসমান বরফের বেষ্টনী গড়ে মহাদেশটি ক্যাপ্টেন জেমস কুকের মতো অনুসদ্ধিৎসু মানুষকে ধোঁকা দিতে পেরেছিল। দক্ষিণের ষাট ডিগ্রি বলয়ের মধ্যে কি আছে তা আবিষ্কারের চেষ্টা তিনি করেছিলেন একাধিকবার। কিন্তু বরফ-বেষ্টনীতে ঢুকে আস্ত বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তার জাহাজের ছিল না। তাই ঐ সীমাহীন তুষার সাম্রাজ্যের রহস্যভেদ তিনি করে যেতে পারেননি।

আমাদের জাহাজ আজ অ্যান্টার্কটিকার ‘গেরলাশ’ প্রণালী ছেড়ে ‘এরেরা’ চ্যানেলে প্রবেশ করছে। পৃথিবীর মানুষের নাগালের বহু দূরে লুকিয়ে থাকা সবর্তভাবে শুভ্র এক জগতের নাম অ্যান্টার্কটিকা। এখানে পানি, মাটি, আকাশ, সবই সাদা। কাল আমরা জাহাজ ছেড়ে উপকূলের বরফে পা রাখব। আমাদের হাতে অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলার  ডিলেইলড ম্যাপ আছে। কিন্তু আবিষ্কারযোগ্য বস্তু বা বিষয়ের কোন তালিকা আমরা করিনি। আমাদের জন্য কেবলই অবলোকন, উপলব্ধি ও উপভোগ; বিনোদন ছাড়া কিছু নয়। গত আড়াই শত বছরে এই শীতল সাগর আর অ্যান্টার্কটিকার বরফ-বেষ্টনীর বড় কোন পরিবর্তন হয়তো হয়নি। কিন্তু যে চোখে ক্যাপ্টেন জেমস কুক এ সব দেখেছিলেন তা আমাদের নাই। তাই তিনি যে এখানে আসেননি সে কথা আড়াই শত বছর পরেও আমরা ভুলিনি; কিন্তু আমরা যে এসেছিলাম ভুলেও কেউ তা স্মরণ করবে না।   

দরিয়া যারে টানে (পর্ব-১)