সাগরের স্বচ্ছ, শীতল, নীল পানিতে আমরা দুজন ভেসে আছি তিন-চার ঘন্টা হল। ডুবে যাওয়া বোট আঁকড়ে ধরে পা দিয়ে সাঁতার কেটে দক্ষিণ-মুখো যাওয়ার ক্ষীণ চেষ্টা করছি। আরব-সাগরের ‘ক্রস-কারেন্ট’ আমাদের বোট ঠেলে দিচ্ছে কখনও দক্ষিণে, কখনও পশ্চিমে। বোটের ডানে আমি, বামে সার্জেন্ট সাত্তার; নৌকাডুবির অসহায় শিকার আমরা শৌখিন ‘সেইলর’। করাচি নগরীর প্রান্তে কোরাঙ্গি-ক্রিক সেইলিং ক্লাব থেকে বোট নিয়ে আমরা সাগরে নেমেছিলাম। শুরু থেকেই ঝোড়ো হাওয়া ছিল। পাল খাটিয়ে এক ঘন্টা চলার পর তুফান আমাদের কুপোকাত করল; বোট ‘ক্যাপসাইজ’ হয়ে গেল। নায়ের খোলে ‘বয়া’ লাগান থাকে বলে ডুবে গেলেও সেইল-বোট কখনও একেবারে তলিয়ে যায় না, মরা মাছের মতো পেট ভাসিয়ে রাখে। এই মরা-বোটের কানা ধরে আমরা ভেসে আছি। দক্ষিণ-মুখী ঢেউয়ের বিপরীতে সাঁতার দিয়ে তিন কিলোমিটার উত্তরে ফেলে আসা কূলে ফেরার কোন আশা নাই।

এপ্রিলের উষ্ণ দুপুর। মাথার ওপর রৌদ্রজ্জ্বল নীল আকাশ। মনে হচ্ছে, ধরা-খাওয়া  বোটের পাশে আমাদের দু-জনের হাবুডুবু খাওয়ার বুঝি শেষ নেই। নোনা পানির ঝাপটায় চোখ জ্বলে ছারখার। রোদে মুখ পুড়ে অঙ্গার। তবে, বানে ভাসা বাংলার গাঁয়ে বড় হওয়া মানুষ আমরা; দমে যাওয়ার পাত্র নই। আশা আছে, বোট ধরে এভাবে সাঁতরে আর আধ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে পূর্ণ-ভাটায় এক সারি ডুবো-চরের নাগাল পাব। ডুবো চরে পা রাখতে পারলে পানি থেকে বোট উদ্ধার করে,  গুটিয়ে রাখা মাস্তুল উঠিয়ে পাল টানিয়ে দেব। জোরদার উত্তুরে বাতাসে দু-ঘন্টায় কোরাঙ্গি ফেরা সম্ভব হবে। এখন শুধু প্রার্থনা, ঢেউ যেন আমাদের বেশি পশ্চিমে না নিয়ে যায় এবং ঠান্ডায় কারও হাত-পা যেন অবশ না হয়। পশিমে সরে গেলে আট শত কিলোমিটার দূরে ওমানের উপকূল ছাড়া আর কোথাও মাটি মিলবে না; এবং হাত-পা অবশ হয়ে গেলে সাগরের তলে অতি দ্রুত আমাদের মাটি মিলবে।  

বন্ধুরা বলতেন, সেইলিং ক্লাবে গেলে সাগরের নেশা হয়। আমার জন্য কথাটা সত্য হয়েছিল। সাগরে নামার পথে বাধা তো কম নয়; খারাপ আবহাওয়া আছে, রেসকিউ-বোটের বৈকল্য আছে, অশুভ দিন-ক্ষণ আছে, যাত্রাপথে পিছু ডাকার লোক আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একজন নভিস, নবীন সেইলর ওসব কি আর কেয়ার করে! ছুটির দিনে আবহাওয়া ভাল থাক কি খারাপ থাক, আমি সেইলিং ক্লাবের পথ ধরতাম। সার্জেন্ট সাত্তার বলতেন, ‘দরিয়া যারে টানে, আউল-ফাউল নিয়া সে কি আর ঘরে বইসা থাকতে পারে’! কথা সত্য, সাগরের টানে তীব্রতা আছে, কোথায় যেন একটা সম্মোহনী ব্যাপার আছে। নোনা পানিতে পর্যুদস্ত নাকের ডগায় মৃত্যুদূতকে বসিয়ে সারাদিন দিক-চিহ্নহীন দরিয়ায় সাঁতার দেওয়ার পরেও সাগরের সে আকর্ষণকে আমি অশুভ মানতে রাজি নই।

সেইল-বোট নিয়ে আরব সাগরের পানিতে মৃত্যুদূতের সাথে কিছু সময় কাটানোর বিরল সে অভিজ্ঞতাটি হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তারপর সাগরের অনেক পানি বাষ্প হয়ে গেছে, দরিয়ার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। কিন্তু সুযোগ আবার এল ১৯৯৭ সালে। অ্যান্টার্কটিকা-অভিযানের জন্য পক্ষকালব্যাপী সমুদ্র ভ্রমণের আমন্ত্রণ পেলাম। কোন ভাগ্যে না জানি হঠাৎ করে এই দুর্লভ সুযোগ আমার মুঠোয় ধরা দিল! সার্জেন্ট সাত্তার থাকলে খুশি হয়ে হয়তো বলতেন, ‘দরিয়া যারে টানে......’। আর্জেন্টিনার বন্দর উশুআইয়া থেকে আমাদের সমুদ্র-ভ্রমণ শুরু হবে এবং অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা ঘুরে ফকল্যান্ড দ্বীপে গিয়ে তার সমাপ্তি ঘটবে। আমাদের নিয়ে টেরা-ডেল-ফুগো পেরিয়ে জাহাজ যাবে আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মিলনস্থলে। তারপর, ভয়ংকর ড্রেক-প্যাসেজ পার হয়ে জাহাজ প্রবেশ করবে দুর্গম অ্যান্টার্কটিক বলয়ে। এক সফরে আর কত চমক মানুষ আশা করতে পারে!

জানুয়ারির এক কুয়াশামোড়া বিকেলে উশুআইয়া বন্দর থেকে নোঙর ওঠাল আমাদের জাহাজ। একশত যাত্রীর জন্য তৈরি অত্যাধুনিক জাহাজ, নাম ‘অ্যান্টার্কটিক এক্সপ্লোরার’। চালানোর ভার নিয়েছেন ক্যাপ্টেন ডেমেল ও এক ক্রু। জাহাজে ১০ দেশের অভিযাত্রী এসেছেন। অ্যান্টার্কটিকা সফরের নানা তথ্য জানানো ও করণীয়-বর্জনীয় সম্বন্ধে তাদের তালিম দেওয়ার জন্য পাঁচ জন গাইড আছেন। যথানিয়মে অভিযাত্রী, ক্রু ও গাইডের পরিচয়-পর্ব এবং স্বাগত-ডিনার শেষ হল। তখনও সূর্য ডোবেনি, রাত দশটা বাজে। ‘বিগল-চ্যানেল’ ধরে জাহাজ ‘কেপ-হর্নের’ দিকে এগিয়ে চলছে। ‘বিগল’ নামের এক জাহাজে তরুন ‘চার্ল্‌স ডারউইন’ এখানে এসেছিলেন ১৮৩২ সালে। অজ্ঞাত এ অঞ্চলের বিচিত্র উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সিল, সিন্ধুঘোটক ও বিচিত্র পাখির প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে অঞ্চলটি এখন সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

তেমন প্রশস্ত নয় বিগল-চ্যানেল; মাত্র পাঁচ-দশ কিলোমিটার চওড়া। চ্যানেলের উত্তরে  আর্জেন্টিনা এবং দক্ষিণে চিলি। ডুবো-পাহাড়ের জন্য এ চ্যানেলে জাহাজ চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। উপকূল হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের জাহাজ চলছে। চ্যানেলের কালচে পানি আর কুহেলি-মোড়া দিগন্ত ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না। আমরা এগিয়ে চলেছি টেরা-ডেল-ফুগোর দক্ষিণ অঞ্চল দিয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার শেষ প্রান্তে দুই মহাসাগর দিয়ে ঘেরা জনহীন দ্বীপপুঞ্জের নাম টেরা-ডেল-ফুগো। এর উত্তর দিয়ে বয়ে গেছে ‘স্ট্রেইট-অব-ম্যাগেলান’। অনন্য, অদম্য এক নাবিকের নাম ‘ফার্ডিন্যান্ড ম্যাগেলান’। তিনি এখানে এসেছিলেন আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে। ১৫১৯ সালে পর্তুগালের এই নাবিক স্পেনের জাহাজ-বহর নিয়ে এক অসাধারণ অভিযানে নেমেছিলেন। পৃথিবী যে গোল তা প্রমাণ করা ছিল সে অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। পথে পথে নব-আবিষ্কৃত জমিনে উপনিবেশ স্থাপন করার আকাঙ্ক্ষাটাও কম জোরদার ছিল না।

পৃথিবী যে গোল সে তথ্যটা তখনও নতুন ও বিতর্কিত। ঐ তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য ক্রিস্টোফার কলম্বাসও অভিযানে নেমেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার পূর্ব উপকূলের গিয়েই সে অভিযান ক্ষান্ত হয়েছিল। পরে অন্যান্য নাবিক উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলের আংশিক মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। কিন্তু দুই আমেরিকার বিশাল ভূখন্ড পার হয়ে প্রশান্ত-মহাসগরে কোন পথে যাওয়া যায় তা কারও জানা ছিল না। কয়েকটি কাঠের-জাহাজে পাল তুলে ক্যাপ্টেন ম্যাগেলান নেমে গেলেন সেই পথ আবিষ্কারের কাজে। ১৫২০ সালের পহেলা নভেম্বর ম্যাগেলানের জাহাজ ‘ভিক্টোরিয়া’ এই চ্যানেলে প্রবেশ করল। আন্দিজ-পর্বতের দক্ষিণ প্রান্ত কেটে আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে এই জলপথ। সে সময় কারও জানা ছিল না এটা শেষ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরে পড়েছে কি না। জানা ছিল না এর কোথায় কত ডুবো-পাহাড় আছে। কানাগলির মতো চ্যানেলটি হঠাৎ শেষ হলে সেখান থেকে ফিরে আসার বাতাস মিলবে কিনা তাও অজানা। একদল নাবিক বিদ্রোহ করল। সামনে যেতে তারা অনিচ্ছুক। কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করলেন ম্যাগেলান। বিদ্রোহী নেতাকে হত্যা করা হল। দুর্ঘটনার বিরাট ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ অনিশ্চিতের পথে এগিয়ে চলল। তারপর সেই ভয়ংকর চ্যানেল দিয়ে এক দিন ‘ভিক্টোরিয়া’ সত্যি সত্যি এক উন্মুক্ত সাগরে প্রবেশ করল। এই সেই প্রত্যাশিত প্রশান্ত-মহাসাগর। সাগরের গর্জন ছাপিয়ে বেজে উঠল জাহাজের ভেরি ও শঙ্কামুক্ত ক্রুদের অট্টরোল।

টেরা-ডেল-ফুগোর ঝোড়ো বাতাসের হুংকার আমার কানে কি এখনও ক্যাপ্টেন ম্যাগেলান ও ক্রুদের উল্লাস বয়ে আনছে! না কি এটা সেই বিদ্রোহ নেতার অন্তিম আর্ত-চিৎকার! বিদ্রোহ ও হত্যার স্মৃতি ছাড়াও স্ট্রেইট-অব-ম্যাগেলান ভয়াবহ এক পথ। ও পথে কোন জাহাজ আজ আর আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাতায়াত করে না। ছোট ছোট জাহাজ পাহাড়ের ওপর দিয়েই যায়। পাহাড়ের গায়ে ধাপে-ধাপে কাটা সরু এক খালের ভিতর দিয়ে জাহাজ টেনে নেয়া হয়। আজব সে খাল ‘পানামা-ক্যানাল’ নামে পরিচিত। এ খাল দিয়ে বড় জাহাজ চলতে পারে না। বড় জাহাজকে পুরো দক্ষিণ-আমেরিকা ঘুরে আসতে হয়। বড় বড় জাহাজ দক্ষিণে নেমে ‘ড্রেক-প্যাসেজ’ দিয়ে চলাচল করে।   

চলবে.....................