ব্যাকপ্যাকার কাকে বলে?? এই সংজ্ঞা নিয়ে আমি প্রায়ই দ্বিধায় ভুগি। তাবু গেড়ে রূটি কলা খেয়ে কম খরচে ঘুরে আসা মানুষও নিজেকে ব্যাকপ্যাকার বলে। আবার ৪০-৫০ জনের গ্রুপ কম খরচে ঘুরে এসে নিজেদের ব্যাকপ্যাকার বলে। আমার কাছে ব্যাকপ্যাকিং এর মানে হচ্ছে উদ্দ্যেশহীন ভাবে ঘুরা। কোন প্ল্যান থাকবে না যেখানে রাইত সেখানেই কাইত। পুরা পুরি স্বনির্ভর ট্যুর। এই রকম একটা ২দিনের ব্যাকপ্যাকিং এর ইতিকথা নিয়েই হাজির হলাম।

১ম দিনঃ নাপিত্তাছড়া-খৈয়াছড়া-মহামায়া লেক

ঢাকার মত এক্টি চিপা শহরে কিছুদিন থাকলেই দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়। বেশ কিছুদিন খাচায় বন্দি থাকার পর মনটা আকুপাকু করতেছিল বের হবার জন্য। প্ল্যান ছিল মহেশখালীর সেইটা শেষ মূর্হুতে চেঞ্জ হয়ে মিরসরাইতে টার্ন নিল। যাবার আগের দিন পর্যন্ত ডেস্টিনেশনের কোন ঠিক ছিল না। শুধু জানতাম বের হব। যথারীতি ফেনী হয়ে যাব বলে সিদ্ধান্ত হল।২৮শে এপ্রিল রাত ১১,৪০ এ যখন ফেনীর বাস ছাড়লো তখন পর্যন্ত জানতাম না কি থ্রিলিং রাইড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ভ্রমণ সংগী ছিল ঈসমাইল ও মুন ভাই। ফেনীর গাড়ী স্টার লাইনে উঠার পর আমি এনা শ্যামলী হানিফ পরিবহনের ড্রাইভারদের মাফ করে দিছি। আমি আধ্যাত্মিক জগৎতে চলে গিয়েছিলাম। পৃথিবী মহাকাশের মাঝখানের কোন শূন্যতায় আমার আত্মা চলে গিয়েছিল। এমন রাফ ড্রাইভ করে গাড়ীর সাথে ড্রাইভার নিজেও কাপে। এনা, শ্যামলী, হানিফ সবাইকে ক্রস করে ফেলছে স্টার লাইন। নিজের জাত ভাই এসি স্টার লাইনকেও ছাড় দেয় নাই। কোন হালার পুত কইছে এনা রাফ চালায়। এনা অনেক ভাল। ওই দিন জ্যাম না থাকলে স্টার লাইন আমাদের রাত ৩টা বাজে ফেনী নামাইয়া দিত। দেড় ঘন্টা জ্যামে গেছে। আর আড়াই ঘন্টায় ফেনী আসছে। আমরা ফেনী এসে পৌছালাম রাতে ৪টায়। এতক্ষন বসে থাকার মানে হয় না। আমরা আমাদের এক বড় ভাই কে ফোন দিলাম। উনি মেইল ট্রেন করে সীতাকুন্ডু আসছেন। আমাদের ইনিসিয়াল প্ল্যান ছিল খৈয়াছড়া ঝর্নায় আগে যাওয়া। মোহাম্মদ ইউসুফ রানা ভাইয়ের বয়ান শুনে সেইটা ৩৬০ ডিগ্রি এংগেলে ঘুরে গিয়ে নাপিত্তাছড়ায় ঠেকলো। ঢাকা থেকে ৮ এর অধিক ভ্রমণ গ্রুপ খৈয়াছড়ায় যাচ্ছে। এত প্যারা এত ভীড় ভাল লাগে না। আমরা ভোর ৬টা বাজে নদুয়ারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সড়ক দূঘর্টনার জন্য বেশ লেট হল। নদুয়ার গিয়ে পৌছালাম সকাল ৮টায়। ঢাকা থেকে আর একটা ছোট গ্রুপ এসেছিল তারা অপেক্ষা করছিল অন্য একটা গ্রুপের সাথে যোগ হতে। আমরা আসার পর ৭ জনের বেশ বড় একটা গ্রুপ হয়ে গেলাম। গাইড ঠিক করে নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে হাটা শুরু করলাম। কখনও ঝিরিপথ কখনও টিলা পথ এভাবেই হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম এই ট্রেইলের প্রথম ঝর্না বান্দুরীখুমে।

এতক্ষনে আমার তেল বের হয়ে গেল কারন জুতায় ভাল গ্রিপ ধরছিল না। এইটা আমার প্রথম ট্রেকিং তাই ওত ভাল ধারনা ছিল না জুতার ব্যাপারে। ঝর্না দেখে পানি পান করে রওনা হলাম এই ট্রেইলের দ্বিতীয় ঝর্না মিঠাছড়িতে। যাবার পথে সুন্দর একটা ক্যাসকেড (বাংলায় যাকে ছড়া বলে) পড়লো, এখানে কিছুক্ষন ফটো সেশন করার পর হাটা ধরলাম। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম মিঠাছড়ি। মাথার তালু ততক্ষনে জ্বলতেছিল। একবার পা হড়কাইয়া পড়তে গিয়ে ব্যালেন্স করে ফেলেছিলাম।কিন্তু পায়ের রগে এমন টান পড়লো পুরা ট্রেইল ব্যাথা নিয়ে হাটতে হল। তবে সুখের খবর সবাই খইয়াছড়ায় যাওয়ায় এই ট্রেইল ছিল পুরা জন মানবহীন। আর এই ট্রেইলের ঝর্না গুলাও বেশ সুন্দর। তবে সিজন না থাকায় বেশি পানি নাই। বর্ষায় নিশ্চয় দানবীয় রূপ ধারন করে। এটা দেখা শেষ করে এই ট্রেইলের শেষ ঝর্না কুপিকাটাকুমের দিকে রওনা হলাম।

কুপিকাটাকুম যাবার পথেই আমাদের গাইড রুহুল আমিন ভাই বলতেছিল গত বছরে এই ঝর্নায় আসার সময় শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মারা যায়। এখানকার ঝিরি পথ বেশ পিচ্ছল। তাই আমাদের টিলা পথে নিয়ে এসেছে বান্দুরাখুম থেকে। কথা বলতে বলতে এসে পড়লাম কুপিকাটাকুম। মা শা আল্লাহ অনেক সুন্দর ঝর্না ঝর্ণাতে পানির পরিমাণও ভালোই। ঝর্ণাটির সামনের পানির অংশটি কিছুটা গভীর। তাই একেবারে ঝর্ণার সামনে যেতে হলে আপনাকে সাঁতার কেটে যেতে হবে। এই রকম ন্যাচরাল সুইমিং পুল পেলে নিজেকে ধরে রাখা দায়। কিছুক্ষন পানিতে ঝাপাঝাপি করে আবার নদুয়ার বাজারের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম। এখানে একটা হোটেল আছে চা পর্ব শেষ করে মেইন রোডের দিকে হাটা ধরলাম। মিশন খৈয়াছড়া।

নদুয়ার থেকে বড়তাকিয়ায় সিএনজি করে গেলাম। বড়তাকিয়া আসার পর আবার সিএনজি। সিএনজি যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে হাটার পথ শুরু। গ্রামের হাটা পথ ধরে হাটার কিছুদূর পরেই ঝিড়ি পথ আসবে। ঝিড়ি পথ পারি দিয়েই খৈয়াছড়া ঝর্না। এত মানুষের সমাগম এই ট্রেইলে পুরা রাস্তা গোসলের পানি দিয়ে পিচ্ছলা করে ফেলছে। ভাগ্য ভাল বাশ নিয়েছিলাম একটা। জ্বী ইহা গণ ট্রেইল। দাদী নানী খোকা খুকি আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই এই ট্রেইলে আসে। বাংলাদেশের একমাত্র ৮ স্টেপের ঝর্না। গুটি গুটি করে হেঁটে হেঁটে এক সময় এসে পড়লাম খৈয়াছড়ায়। বেশ সুন্দর ঝর্না। তবে উপরের স্টেপ গুলাতে উঠতে হলে দড়ি বেয়ে উঠতে হয় দেখে আর আগ্রহ দেখলাম না। রগের টানের কারনে পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা। খামাখা জানের রিস্ক নেওয়ার কোন মানে হয় না। আমার সফরসংগীরা সবাই উপরে উঠলো শুধু আমি আর মুন ভাই বাদে। খৈয়াছড়া অভিযান শেষে ঝর্না হোটেলে দুপুরের খাবার(খেতে খেতে বিকাল হয়ে গেছে) সেরে নিলাম। এরপর পা বাড়ালাম মহামায়া লেকের দিকে। মেইন রোডে আসার পর দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছুক্ষন পর লেকে যাবার লেগুনা পেয়ে গেলাম। ভাগ্যবসত লেগুনার সব যাত্রী লেকে যাবে বিধায় আমাদের সবাই কে লেকের গেটের সামনে নামিয়ে দিল। টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। মায়া ভরা মহামায়া লেক। ট্রেকিং এর ক্লান্তিতে আমার দুই নয়ন জুড়িয়েছিল মহামায়া লেক এবং এর আশে পাশের পাহাড় বন জংগল। সত্যই অদ্ভুত সুন্দর আমাদের পার্বত্য অঞ্চল। ফটো সেসন শেষ করার পর আমাদের প্রথম দিনের ট্যুর এখানেই সমাপ্তি দিলাম। মহামায়া লেক থেকে আমরা ডাইরেক্ট এসেছিলাম চট্টগ্রাম রিয়াজউদ্দিন বাজার। এখানে আমাদের এক বড় ভাই খোরশেদ থাকে। উনার ব্যাচেলার বাসায় রাতটা স্টে করবো। পরের দিন যাব কাপ্তাই লেক, শেখ রাসেলেভেয়ারী এন্ড ইকো পার্ক।

২য় দিনঃ কাপ্তাই লেকে কায়াকিং - শেখ রাসেল এভিয়ারী এন্ড ইকো পার্ক

সকাল ৮টা বাজে ঘুম থেকে উঠার পর শরীরটা বেশ ঝড়ঝড়ে লাগছিল। সকালের নাস্তা রিয়াজউদ্দিন বাজারে আজাদ হোটেল সারলাম। এরপর খোরশেদ ভাই আমাদের ১ নাম্বার বাসে উঠাইয়া দিল ওখান থেকে কোন জায়গায় নামলাম মনে নাই তবে সেখান থেকে কাপ্তাই লিচু বাগানের সিএনজি ডাকছিল। সিএনজি করে লিচু বাগান আসার পর ঠিক করলাম আগে রাসেল পার্কে যাব। ক্যাবল কারে চড়ার পর যাব কায়াকিং করতে। কিন্তু এখানে এসে হতাশ হলাম। যান্ত্রিক গোলাযোগের কারনে ক্যাবল কার বিকাল ৪টার দিকে চালু হবে বললো। আমরা দেরি না করে চলে আসলাম কাপ্তাই জুম রেস্তোরায়। জুম রেস্তোরার পাশেই কায়েক ক্লাব। কায়েক ক্লাবে গিয়ে টীম লিডারের নাম উঠানোর পর আমাদের নীতিমালা পড়িয়ে শুনানো হল। কিন্তু মূল সমস্যা হয়ে গেল আমাদের ৩ জনের টীম। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম ৪৫ মিনিট চালানোর পর একজন মেম্বার চলে আসবে আর একজন গিয়ে উঠবে। কায়াকিং এখন হালের ক্রেজ। আর কায়াক ক্লাব এই ভাইরাস সুন্দর ভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে তরুণদের মধ্যে। কায়াকে উঠানোর আগে পড়ানো হয় লাইফ জ্যাকেট। সেফটি ফাস্ট।

কায়াক চালানো বেশ সোজা ডানে সুইপ করলে বামে যাবে, বামে সুইপ করলে ডানে যাবে। পিছে টানলে সামনে যাবে, সামনে টানলে থেমে যাবে। মজার এই কায়াকে উঠার পর বুঝলাম মাঝির কত কস্ট। হিল ট্রেকিং এর ফলে আমাদের পায়ে আগের দিন এমনেই চাপ গেছে এখন চাপ পড়ছে হাতে। এরপরও আশে পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কাপ্তাই লেকের পানি শান্ত কোন ঢেউ নাই। ৪৫ মিনিট পর আমাদের আর এক মেম্বার কায়াকে উঠলো আমি বসলাম। কায়াকিং শেষ করার পর চলে আসলাম পাশের ফ্লোটিং প্যারাডাইস রেস্তোরায়। দেশী মুরগী, চাপিলা মাছ, আলু ভর্তা ভাত দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এখান রেস্ট নিয়ে ফটো সেশন পর্ব যখন শেষ হল তখন ঘড়ির কাটায় ৩,৩০।

এবার রওনা দিলাম রাসেল পার্কের উদ্দ্যেশে। এখানে আসার পর শুনতে পারলাম ক্যাবল কার ৫টার আগে ছাড়বে না। আশে পাশে ঘুরা শুরু করলাম। নাম দিচ্ছে এভিয়ারী এন্ড ইকো পার্ক। এইটা ঠিক চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের মাঝখানে পড়েছে। এই পার্কে বিভিন্ন জাতের পাখি, হরিণ ছাড়াও রয়েছে একটি কৃত্রিম লেক। দেখতে দেখতে বেশ ভাল সময় কাটছিল। ইতিমধ্যে দূর থেকে দেখতে পারলাম ক্যাবল কার ছাড়া শুরু করছে। দেরি না করে সেখানে দ্রুত চলে আসলাম। ক্যাবল কারে চড়ার পর আমাদের ঈসমাইল ভাই ব্যাপক ভয় খাইলো। খিচ মেরে কিছুক্ষন থাকার পর আকাশ থেকে পাহাড় দেখার পর স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। ক্যাবল কার চলছে আর আমার মনে পাখিনূভুতি হচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস এ যেন প্রাকৃতিক এসি। পুরা রাইডটা ছিল ২০ মিনিটের। ক্যাবল কারে চড়ে উপর থেকে পাহাড়ে ঘেরা কৃত্রিম লেক, পাহাড়, পাখি, গাছগাছালি দেখতে দেখতে ২০টা মিনিট ঘোরের মধ্যে চলে গেল। এখানে তৈরি ক্যাবল কার রাইড এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং বাংলাদেশে সর্ব প্রথম। পার্ক থেকে যখন বের হলাম সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ইচ্ছা ছিল নেভাল যাবার। কিন্তু চট্টগ্রাম আসতে আসতে ৯টা বেজে গেল। খোরশেদ ভাই কে বিদায় দিয়ে রাতের বাসে উঠলাম। এখানেই আমাদের এডভেঞ্চার ট্যুরের সমাপ্তি হল।

ট্যুর শেষে হিসাব করে দেখলাম আমাদের পার পারসন খরচ হইছে মাত্র ২০৪৮ টাকা।

জয় হক ব্যাকপ্যাকারদের। হ্যাপিং ট্র্যাভেলিং। :)