ইতিহাসকে ইতিহাসের মত দেখতে হয়, সময় নিয়ে যেতে হয়, থাকতে হয়, বুঝতে হয়, অনুভব করতে হয়। তবেই হয়তো ইতিহাসে সাথে কিছুটা মেশা হয়, ইতিহাসকে কিছুটা জানা হয়। ইতিহাসকে বা ঐতিহাসিক যে কোন কিছু দেখতে, জানতে, বুঝতে বা উপলব্ধি করতে খুব বড় গবেষক বা ইতিহাসবিদ হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। একটু সময় নিয়ে ইতিহাসে চোখ রাখলেই অনেক কিছু দেখতে পাওয়া যায়।

যদি ধীর লয়ে হেটে হেটে চোখ রাখা যায়, কোন ঐতিহাসিক স্থাপনার দেয়ালে, পাথরে, মাটিতে বা মেঠো পথে, তবে ইতিহাসের নানা কিছু আপনার কাছে এসে বসবে, কথা বলবে, নিজেকে জানান দেবে। দেখবেন ঠিক ইতিহাসকে আপনি স্পর্শ করতে পারছেন, দেখতে পারছেন, বুঝতে পারছেন, অনুভব করতে পারছেন। 
কিন্তু আমরা আজকাল এমন ভাবে ভ্রমণ সূচী ঠিক করে থাকি যে, কত কম সময়ে কত বেশী যায়গা কভার করা যায়, সেদিকেই বেশী মনযোগী থাকি।

আর বিশেষ মনোযোগ থাকে সব লোকেশনে এক বা একাধিক ছবি তুলে বন্ধু মহলে নিজেকে জাহির করার যে কত কত যায়গায় গিয়েছি, সেটা দেখানোর! তাই এসব লোক দেখানো ভ্রমণে গিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনার সাথে ছবি তোলা হলেও, ইতিহাসকে আর জানা, বোঝা বা অনুভব করা হয়ে ওঠেনা। সেই সময়ই যে পাওয়া যায়না আজকাল।

আমাদের সর্বশেষ শান্তিনিকেতন, চুরুলিয়া আর মুর্শিদাবাদ ভ্রমণও অনেকটা এমনই ছিল। যদিও এই ভ্রমণের শুরুতে মুর্শিদাবাদ ছিলোনা তালিকায়। ছিল রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নজরুলের কবি তীর্থ চুরুলিয়া অভিযান। কিন্তু বাবুদার বিশেষ আবদার ফেলতে না পেরে অবশেষে শেষ দিনে দিয়েছিলাম একটি ঝটিকা সফর, আসানসোল থেকে মুর্শিদাবাদ। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীরজাফর আর জগতশেঠদের জলজ্যান্ত ইতিহাসের নগরী মুর্শিদাবাদ।

বেশ ঝটিকা একটা অভিযান, কিন্তু তারপরেও একদম না দেখার চেয়ে অল্প হলেও তো দেখা হয়েছে, আর তৈরি হয়েছে একটা অদম্য আগ্রহ কোন এক সময় বেশ সময় নিয়ে ওইসব ইতিহাসের নানা স্থাপনাকে অনুভব করতে আর একবার যাবার অদম্য ইচ্ছা। আর সেজন্য বা এই আগ্রহ তৈরি করে দেবার জন্য ভ্রমণসঙ্গী বাবুদাকে বিশেষ ধন্যবাদ। কারন তার অদম্য ইচ্ছা না থাকলে এখানে গিয়ে ইতিহাসের লোভে পড়া হতোনা এতো সহজে।

বিকেল প্রায় ৫ টায় দুর্গাপুর থেকে বাসে রওনা হয়ে, ৫ ঘণ্টার জার্নি শেষে রাত ১০:৩০ এর দিকে মুর্শিদাবাদের মুল শহর বহরমপুরে পৌঁছে, গ্রেভি চিকেনের দুঃখ-কষ্ট বোনাস পেয়ে, রাতে কমদামী একটা হোটেল রুমে গোসল করে ঘুম দিলাম। আগের রাতেই স্টেশনটা দেখে এসেছিলাম রুমে ঢোকার আগেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে, বাইরের স্টল থেকে চা আর বিস্কিট খেয়ে সোজা স্টেশনে। ১০ রুপীর টিকেট কেটে বহরমপুর থেকে মুর্শিদাবাদ মাত্র ১৫ মিনিট আর তিনটা স্টেশন। ভাড়াটা বেশ বেশীই মনে হল! অবশ্য এটাই সর্বনিম্ন ভাড়া বলে আর কিছুই করার নেই।

ট্রেন থেকে নেমে আগে ঐতিহাসিক যায়গা, মুর্শিদাবাদ স্টেশনের সৃতি স্বরূপ কিছুক্ষণ ছবি তোলা হল। তারপর বাইরে বেরিয়ে ১০+১০=২০ রুপীর ভাড়ায় একটা রিক্সা নিয়ে হাজারদুয়ারীর গেটে। গিয়েই দুঃসংবাদ! সেদিন শুক্রবার সকল স্থাপনা বন্ধ! শুনেই মাথায় হাত, গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম স্থাপনার ভিতরে যাওয়া যাবেনা তবে বাগানে ঢুঁকে দেখতে আর ছবি তুলতে কোন বাঁধা নেই। ব্যাস এতেই চলবে আপাতত। একটু ঘুরে ঘুরে বাইরে থেকে দেখে কিছু ছবিই নাহয় তুলে নিয়ে যাই এবারের মত। তাই বেশ আয়েশ করে কিছু ছবি তুলতে লাগলাম দুজন মিলে।

এক যায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়াবার সময় আমাদের ছিলোনা। সময় তখন সকাল ৯ টা। ১১:৪০ আমাদের কলকাতা যাবার ট্রেন ধরতে হবে, তাই সময় খুব কম। এই দুই আড়াই ঘণ্টায় যতটুকু সম্ভব ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে নিতে হবে। যে কারনে হাটার ইচ্ছা থাকলেও, সময় বাঁচাতে ঝটপট একটা টোটো ভাড়া করে নিলাম ১৫০ রুপী দিয়ে। যেটা আমাদের যতগুলো স্থাপনা সম্ভব ঘুরিয়ে দেখাবে।

একে একে আমরা ঘুরে দেখলাম কাঠ গোলা, গোলাপ গার্ডেন, নবাবের বাগান বাড়ি, মীরজাফরের বাড়ি, সমাধি, নবাবের কন্যাদের সমাধিক্ষেত্র, নবাবের পারিবারিক মসজিদ, মীরজাফরের মসজিদ, বিশাল আম বাগান, মাঝে ছুঁয়ে গেলাম ভাগিরথী নদীর পাড়। আরও দেখলাম সেসময়ের রাজাদের নারী নর্তকী নিয়ে নানা রকম কীর্তি কলাপ! সেসব গল্প পরে বলবো, আস্তে-ধীরে, রয়ে-সয়ে আর রসিয়ে রসিয়ে।

এসব একটু করে দেখতে আর সৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলতে তুলতেই ১১:৩০ কখন বেজে গেছে বুঝতেই পারিনি। টোটো ড্রাইভারের কাছে ট্রেন ধরবো বলা ছিল তাই সে মনে করিয়ে দেয়াতে এক ছুটে স্টেশন সময় তখন ১১:৩০। ভাবলাম কত না যেন টিকেটের দাম হবে, মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা? গিয়ে দেখি টিকেটের দাম মাত্র ৪০ রুপী, ভ্রমণ সময় ৪-৫ ঘণ্টা। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। অথচ ভেবেছিলাম বেশ লম্বা পথ বলে হয়তো একটু ভালো গা এলিয়ে দেয়ার মত ট্রেন হবে। ভালো ক্লাসের একটা টিকেট কাটবো। সেটা আর না হওয়াতে ৪০ রুপী করেই টিকেট কেটে, ঠিক ১১:৪০ স্টেশনে এসে থামা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠে পরলাম। সিট পেলেম দুজন দুই পাশে।

অল্প সময়ে আর অল্প দেখা হলেও, বাবুদাকে ধন্যবাদ জোর করে হলেও আমাকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে গিয়ে লোভ ধরিয়ে দেয়ার জন্য। কারন আমি যেভাবে দেখতে চাই সেভাবে না পারলেও, ইতিহাসের অনেক কিছু দেখার, ছোঁয়ার, স্পর্শ করার, অনুভব করার মত অনুভূতি তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। তাই ঠিক করেছি। একবার অন্তত দুইদিন থাকার জন্য হলেও মুর্শিদাবাদ যেতে হবে। ধীরে ধীরে ইতিহাসের অনেককিছু অনুভব করবো বলে।

যেখানে প্রতিটি ইট, পাথর, খসে পরা পলেস্তারা, জং ধরা কার্নিশ, ভাঙা বেলকোনি, ক্ষয়ে যাওয়া ছাঁদ সব যায়গায় ইতিহাসের অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। যারা কথা বলতে চায়, কিন্তু আমাদের ব্যাস্ততায় বলার সুযোগ পায়না। তাই এরপর একবার শুধু ওদের ইতিহাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে, শুনতে, বুঝতে, ভাবতে আর স্পর্শ করে অনুভব করতে যাবো, বেশ সময় নিয়ে। যাবই।