আচ্ছা আপনি বিমানে কোন এক জায়গা থেকে আর এক যায়গায় যাচ্ছেন। আপনি কি ভাবতে পারেন যে বিমানের মত সবচেয়ে বিলাস বহুল আর ব্যায়বহুল একটা দারুণ জার্নি শেষে আপনার ঠিকানা হতে পারে সরাসরি কোন ফুটপাথে? নাহ ফুটপাথে মানে এই নয় যে হেঁটে যাবেন বা কিছু সময় অতিবাহিত করবেন।

মোটেই তেমন নয়। ফুটপাথে আপনি অবস্থান করবেন বিমান থেকে নেমে পরের পুরো একটি রাত আর দিন! অথচ আপনার কাছে টাকা পয়সার কোন কমতি নেই। আপনি অসহায় বা সম্বলহীন নন, তবুও আপনাকে বিমানের মত বিলাসবহুল জার্নি শেষে ফুটপাথেই যদি থাকতে হয়! তবে কেমন হবে বলুন তো?

চলুন আজ ঠিক এমনই একটি গল্প শুনি বা বলি......

জীবন যে কখন, কাকে, কিভাবে কি শিক্ষা দেয় তার কোন ঠিক নেই। জীবনে যে কখন, কি কারনে আর কেন, কি পরিস্থিততে দাড় করিয়ে দেয় সেটা কেউ জানেনা। এই সুখে ভাসিয়ে দেবে, তো এই হতাশায় ডুবিয়ে দেবে, এই আলো ঝলমল, তো এই ঘুটঘুটে অন্ধকার, এই জনাকীর্ণ পরিবেশ, তো এই নীরব-নিস্তব্ধ আর সুনসান চারদিক, এই বর্ণীল তো এই ধূসর! হ্যাঁ এটাই জীবন।

এভাবেই পদে-পদে বা বাঁকে-বাঁকে জীবন তার পথ-রঙ-রূপ আর ধরন পরিবর্তন করে। এটাই জীবন। কেউ দেখতে বা বুঝতে পারে, কেউ পারেনা। যে দেখতে বা বুঝতে পারে সে সব রকম পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নিতে পারে, একটু হোঁচট খেলেও। আর যে পারেনা, সে অতলে হারিয়ে যায় কখন নিজেই জানেনা। 
ভাইবারের বিপদ সংকেত পেয়ে শ্রীনগর থেকে পেহেলগাম গিয়ে, পরে জম্মু হয়ে ট্রেনে কলকাতার টিকেট বাদ দিয়ে। সাধ্যের বাইরে গিয়ে পরদিনের প্লেনের টিকেট কেটে ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে শ্রীনগর এয়ারপোর্ট এ চলে গেলাম ট্যাক্সির মত বিলাসবহুল যানে।

আহ কি চমৎকার লাগছিল যে একা একা বিমান ভ্রমণের সবটুকু স্বাদ শুষে নিতে আর তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে। জানালার পাসের সিট, দূরের নীল আকাশ, ভেসে বেড়ানো মেঘের সমুদ্র, নিচে সবুজ পাহাড়ের ঢেউ খেলানো পৃথিবী, মাথার আঁকাবাঁকা সিঁথির মত নদী, দূরের বরফ পাহাড়ের চূড়া, বিমান বালাদের সুরেলা কণ্ঠ, আকর্ষণীয় চাহুনি, জোর করে হাসি, বোনাস হিসেবে এক ঘণ্টা জম্মু দেখা এরপর আবার দিল্লীর দিকে উরাল দেয়া, দিনের আকাশে সন্ধার আগমনী আভা, আকাশের সেজে ওঠা, সোনালী সন্ধ্যা হওয়া, মেঘেদের পাহাড় দেখা, একই সাথে নিচে রাতের আঁধার আর উপরের আকাশে সূর্যের আলোর দুর্লভ দৃশ্য দেখা!

সবকিছু মিলে কেমন একটা মিশ্র মাদকতা মেশানো ছিল যেন! প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছিলাম তাড়িয়ে তাড়িয়ে। আকাশ-মাটি-পাহাড়-নদী-মেঘ-সন্ধ্যা-আঁধার আর আলো। ঠিক দেড় ঘণ্টা পরে রাত ৮:৪৫ এ জম্মু থেকে কলকাতা পৌঁছে গেলাম। প্লেন ল্যান্ড করার পরে লাগেজের ঘোষণা শুনে নেমে পড়লাম। লাগেজ নিয়ে, বাইরে গিয়ে দামী ট্যাক্সিতে না গিয়ে পাশের টার্মিনালের এসি বাসে উঠে বসলাম, নিউমার্কেটের আশেপাশে নামবো বলে। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা চলে, মনের ভুলে হাওড়া চলে গেলাম!

হাওড়া স্টেশন থেকে আবারো অনেকটা ঘুরে লোকাল বাসে আর হেঁটে যতক্ষণে এসপ্ল্যানেড পৌছালাম ততক্ষণে রাত ১০ পেরিয়ে গেছে! হোটেলের বাজেট ছিল প্রথমে ৫০০ টাকা। কোন ক্রমে রাতটা পার করা একটু গোসল করে। পরদিনই হালকা কেনাকাটা করে চলে যাবো বলে। কিন্তু টানা, পাঁচ-ছয়টি হোটেলে ঢুঁকে কোন সিট না পেয়ে, মনে মনে বাজেট বাড়িয়ে দিলাম ৫০০ থেকে ৮০০! রাতে একটু ঘুমোতে হবে, ভালো একটা গোসল দিয়ে।

এরপর নিউমার্কেট আর এর আশেপাশে আরও কয়েকটি হোটেল গেলাম কিন্তু কোথাও কোন সিট খালি নেই! ততক্ষণে বাজেট ৮০০ থেকে ১০০০ এ নিয়ে গেছি!! রাতটা থাকতে হবে, ভালো একটা গোসল দিয়ে, একদম ঠাণ্ডা পরিবেশে। ১০ টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে, কেনাকাটা করে, সিয়ালদাহ থেকে বনগাঁ লোকালে বনগাঁ গিয়ে, বর্ডার পার হয়ে সোজা ঢাকা! কিন্তু কোথাও হোটেল নেই! রাস্তায় রাস্তায় মানুষ বসে আছে! ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-শিশু! এসব দেখে, টানা তিন ঘণ্টা হেঁটে, ঘেমে নেয়ে জুবুথুবু অবস্থা! আর শরীরের অবস্থা কাহিল! সেই সাথে নিদারুণ ক্ষুধা! তাই আপাতত হোটেল বাদ! আগে খাওয়া।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকটা হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে! সাধারণত যেগুলোতে খাই। একটু হেঁটে রাস্তার মোড় পেরিয়ে অন্য এক হোটেলে খাসির মাংস আর গরম ভাত খেয়ে শান্ত হলাম কিছুটা। যাক আগে পেট তো ঠাণ্ডা হয়েছে। এবার না হয় আবারো একটু ঘুরে ঘুরে দেখা যাবে। কিন্তু কয়েকটা যায়গায় না পেয়ে, দূরের কোথাও যাবো খুঁজতে, কিছুটা এগোতেই পড়লাম এক মাতালের পাল্লায়!

মাতালরা আবার বেশ দয়ালু হয়ে থাকে। সেই মাতাল আমাকে হোটেল খুঁজে দেবার জন্য কয়েক যায়গায় নিয়ে গেল, একে ওকে ফোন করলো! মুশকিল হল এদের হাত থেকে সহজে রেহাই পাওয়া যায়না। এদেরকে উপেক্ষা করলেই এরা ক্ষেপে গিয়ে ক্ষতি করে বসতে পারে! তাই চুপচাপ ওর কথা মত হাঁটছিলাম পিছে পিছে।

একটু পর এক দালাল এলো, যে মাতালের সাথে পরিচিত। মাতাল সেই দালাল কে নিজের ভাই আর আমাকে ওর দেশী ভাই পরিচয় দিয়ে রুম খুঁজে দিতে বলে চলে গেল। আর আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ভাবলাম। কিন্তু না, এবার আরও বড় ফ্যাসাদে পরলাম। দালাল কোন ভাবেই আমাকে হাতছাড়া করেনা। তার কাছে চার হাজার টাকায় ভালো রুম আছে আমাকে দেবে! আমি মনে মনে প্রমাদ গুনছি! আর ভাবছি কিভাবে কাটানো যায়? এরই মধ্যে দালাল দুই দম্পতি পেয়ে তাদের দিকে মনোযোগ দেয়াতেই আমি আঁধারে হারিয়ে গেলাম, যেন খুঁজে না পায়!

হেঁটে হেঁটে মারকুইস স্ট্রীটের বাস স্ট্যান্ডের পাশের বেদীতে গিয়ে বসলাম একটা ঠাণ্ডা পানি আর লিমকা নিয়ে গিয়ে। বসার পরে বুঝলাম আমি আর উঠতে পারবোনা! এতোটাই অবসন্ন আর ক্লান্ত। সেখানে বসেই ঘামে ভেজা গেঞ্জি পরিবর্তন করলাম। পুরো বেদী শুধু নয়, দুই পাশের ফুটপাথ জুড়েই শুধু বাঙালি বাবু আর দিদিদের নাজেহাল অবস্থা! ঈদের ছুটির সাথে আরও ছুটি মিলিয়ে সকল বাঙালি বাবু কলকাতায় আশায় এখানে আর কোন হোটেল নেই!

তবু একটা ডরমেটরির খোঁজ পাওয়া গেল বেশ কিছুটা দূরে। অনেকেই সেখানে যাবে। আমি ঠিকানাটা যেনে রেখে, কাঁধের ব্যাগটা পিছনে গাছের সাথে রাখলাম। আর হাতের উইন্টার জ্যাকেটটা ভাঁজ করে পাশে রেখে ভাবলাম মাথাটা একটু রাখি। পরে উঠে যাওয়া যাবে।

কিন্তু এরপর আর কিছু মনে নেই! কোথায় হারালাম আর কতটা হারালাম! কারন সেই যে জ্যাকেটে মাথা রেখেছিলাম মনে আছে শুধু, পরে চোখ খুলে দেখি সকাল হয়ে গেছে!! আমার শুয়ে থাকার পাশেই বাস দাড়িয়ে আছে, যাত্রীরা উঠছে আর আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে! যে জ্যাকেট মাথায় দিয়ে, পাশে ব্যাগ রেখে আর বুট পরেই ঘুমিয়েছিল!!

কোন কিছু নিয়ে আমার তেমন কোন ভয় ছিলোনা। শুধু সাইড ব্যাগের পাসপোর্ট আর টাকা ছাড়া। আর পাসপোর্ট এর পরে সবচেয়ে বড় ভয় ছিল কেউ যদি আমার অনেক সাধনার উডল্যান্ড জোড়া নিয়ে যায়! তাই ওটা না খুলেই শুয়ে ছিলাম। নইলে হয়তো কেউ না কেউ নিয়েই যেতে পারতো! কারন ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার সাধের পার্পেল ড্রিম ট্রিপের পার্পেল ক্যাপটি নেই!

ওটা কেউ খুচরো পেয়ে নিজের মনে করে নিয়ে গেছে!!

আহ, এই হল আমার প্লেন থেকে ফুটপাথের স্মরণীয় গল্পটি।

তবে আর যাই হোক হোটেল খরচটা কিন্তু বেঁচে গেছে!

বিমান থেকে ফুটপাথের অনন্য অভিজ্ঞতার কারনে....

সব সময় পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন, ভ্রমণে বা যে কোন যায়গায়।