এলি ক্ল্যারি- একজন সলো ট্রাভেলার ও ফ্রিল্যান্স রাইটার। হসপিটালিটি ও ট্যুরিজম নিয়ে পড়ালেখা শেষে বছর পাচেক নামী এক পাঁচতারা চেইন হোটেলে কাজ করেছেন। তারপর একদিন সব ছেড়েছুড়ে বেড়িয়ে গেছেন পৃথিবী দেখতে।

সম্প্রতি ঘুরে গেলেন তিনি বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশে একা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন তার নিজস্ব ব্লগ 'সোল ট্র্যাভেল' এ। বাংলাদেশ কি তার আশা পূরণ করতে পেরেছিল? ভালো-খারাপ নাকি মিশ্র ছিল এলির বাংলাদেশ ভ্রমণ? এই দেশ সম্পর্কে ঠিক কি মানসিকতা নিয়ে ফেরত গেছেন তিনি? আর কখনো কি ফিরে আসবেন এখানে? 
তার সেই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরছি অনুভ্রমণের পাঠক দের জন্য। 

"এমন একটা দেশ ঘুরবো যেখানে খুব কম সংখ্যক বিদেশীরাই যায়- এই উদ্দেশ্য থেকেই বাংলাদেশে ভ্রমণ করার ইচ্ছেটা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ ট্যুরিজমের জন্য বেশ ভালো একটি দেশ হলেও আমাদের বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা হয় দূর্যোগের দেশ হিসেবে যেখানে খুব কম সংখ্যক ভালো দিকের জন্য বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ইন্ডিয়ার একজন নিয়মিত ট্রাভেলার হিসেবে সবসময়ই আমার একটা কৌতুহল ছিল পাশ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ কেমন হবে, কেমন হবে তার রুপ-বৈচিত্র্য, স্থানীয় আচার-ব্যবহার। কৌতুহলটা এতই মাথা চেপে বসছিলো যে ঠিক করলাম নিজেই গিয়ে এক্সপ্লোর করবো বাংলাদেশ।

গ্রামবাংলার কুয়াশামাখা ভোর গ্রামবাংলার কুয়াশামাখা ভোর

যাত্রার এক সপ্তাহ আগে শুরু হল যাত্রার আগের দূঃশ্চিন্তা! আমার পরিচিতজনরা একা বাংলাদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করলো, চিন্তা করতে শুরু করলো। মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম "আমি কি সত্যিই পাগল?" কিন্তু চোখে বাংলাদেশের অপরুপ সৌন্দর্য্য যার পসরা সে সাজিয়ে রেখেছে শুধু আমার জন্য, আমি যাবো, তাকে নিয়ে লিখবো আর গল্প করবো একটি সফল একা বাংলাদেশ ভ্রমণের -এই লোভ আর সামলাতে পারলাম না!

এখানে বসে লিখতে লিখতে আমি বলতেই পারি "বেশ, আমি এটা করেছি!" কিন্তু ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম ঠিক তেমনটা হয় নি, গল্পটা ভিন্ন হতে পারতো।

স্মৃতিসৌধে এলি স্মৃতিসৌধে এলি

 

রাজ্যের প্ল্যান নিয়ে পৌছালাম বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকায়। প্রথম কয়েকদিনের জন্য ঢাকা থেকে "বাংলাদেশ এক্সপেডিশন" এর সাথে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, অনিন্দ্য সুন্দর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল "সুন্দরবন" এর একটা ট্রিপে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। ফিরে এসে কোথায় ঘুরবো তার কয়েকটা অপশন হাতে রাখা ছিল, কিন্তু কোনটাই ফিক্সড ছিল না।

সুন্দরবন থেকে ফিরে এসে দেখলাম শরীর খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধরণের যানবাহন চড়তে গিয়ে এই দশা আমার। যখন হোটেলে ফিরে গেলাম পুরো পরিবারের মতো একটা অভ্যর্থনা পেলাম যা আমার সমস্ত ক্লান্তিই দূর করে দিল।

কথায় কথায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানালাম আগামী কয়েকদিনের জন্য শ্রীমঙ্গল আর সিলেট থেকে ঘুরে আসা যায়। পরের দিন ঘুম থেকে উঠলাম বিস্ময় নিয়ে। দেখলাম আমার ট্রেনের টিকেট বুক করে রেখেছে ওরা। শুধু তাই করে ক্ষান্ত হননি তাঁরা.. সাথে একজন কে দিয়ে দিচ্ছেন আমার সাথে যার বাড়ি কিনা শ্রীমঙ্গলেই। তবে যেহেতু আমি এখানে বাংলাদেশটা একা এক্সপ্লোর করতে এসেছি, আর একটু জেদী হওয়ার কারণে ওদেরকে বললাম "দয়া করে কাউকে আমার সাথে দেয়ার দরকার নেই! আমি একাই ভ্রমণ করতে চাচ্ছি!" কিন্তু কে শোনে কার কথা? আমার সেফটি নিয়ে তাদের অনেক কনসার্ন, তাই শেষে আমি আর জুবায়ের (যার বাড়ি শ্রীমঙ্গল) ছুটলাম জলের দেশ সিলেট পানে।

ট্রেনের জানালা দিয়ে বাংলাদেশট্রেনের জানালা দিয়ে বাংলাদেশ

হাসিখুশি আর ভালো মানুষ এই জুবায়ের। তার সাথে সিলেট, শ্রীমঙ্গল এক্সপ্লোর করলাম বেশ আনন্দের সাথে। জুবায়ের আগে শ্রীমঙ্গলের এই অঞ্চলটাতেই গাইড হিসেবে কাজ করতো। পরে ঢাকায় যে হোটেলে আমি উঠেছি সেটায় জয়েন করে। সিলেটের দিনগুলার একটা কমন রুটিন দাঁড়িয়ে গিয়েছিলঃ ভ্রমণের পথে জুবায়ের এর অসংখ্য আত্মীয়ের সাথে দেখা হতো, অসংখ্য দুপুরের খাবার দাওয়াত পেতাম অপরিচিতদের কাছ থেকে! সিলেটের বড় একটা অংশ "চা বাগান" আর আরো বেশ কিছু সুন্দর জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছিলো জুবায়ের এর কারণে। একসাথে বেশ মজা করেছি, ইচ্ছেমত ডাব খেয়েছি আর ছবি তুলছি। এত কিছুর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে আরো জেনেছি, শিখেছি, অনুভব করেছি। জুবায়ের সাথে ছিল বলে যেমন রাজকীয় ভাবে ঘুরেছি তেমনি এটা বাংলাদেশীদের অতিথি আপ্যায়নের একটা সুন্দর উদাহরণও বটে।

জুবায়ের এর সাথেজুবায়ের এর সাথে

এই আপ্যায়ন চলতে থাকলো সিলেট থেকে ঢাকায় পৌছে যাওয়ার পরেও। শেষ কয়েকটা দিন আমি ঢাকায় একা কাটাতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু বেশ কিছু ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির ইভেন্টের দাওয়াত, ঘুরতে গিয়ে দেখা হয়ে যাওয়া মানুষদের দাওয়াত আমাকে একা থাকার লাক্সারীটা দিচ্ছিলো না। তার উপর কোথাও একা বের হতেই পারতাম না সে সময়টায়।

বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসার পর যখন স্মৃতিচারণ করি তখন দুইটা জিনিসই খুব করে মাথায় ঘোরেঃ এক হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ যাদের সাথে আমার দেখা হয়েছে কত সুন্দর করে তারা আমাকে আপন করে নিয়েছে, তাদের বন্ধুত্বের আর সাহায্য করার যে মানসিকতা তা সত্যিই মুগ্ধ করেছে আমায়। একই সাথে আরেকটা বিষয় নিয়ে যথেষ্ঠ মন খারাপ ছিল এই ভেবে বাংলাদেশে একা ট্রাভেলার হিসেবে আমি ব্যর্থ!

স্থানীয় হাসিখুশি জনগণস্থানীয় হাসিখুশি জনগণ

এটা ঠিক যে ট্রেন জার্নিটা আর ট্যাক্সির জার্নিগুলো আমি একাই করেছি, কিন্তু ভ্রমনের দিনগুলোর মধ্যে এমন একটা দিন ছিল না যে আমাকে গাইড করার লোক ছিল না, চারপাশে মানুষজন থাকতো আমার। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঠিক কিভাবে আমি সম্পূর্ণ একা একটা বাংলাদেশ ট্রাভেল এক্সপেরিয়েন্স পাবো! এইজন্য যারা একা ট্রাভেল করতে ভালোবাসেন এমন কয়েকজন মেয়ের সাথে কথা বলে জানলাম আসলে নারীদের একা ট্রাভেল করার গ্রহণযোগ্যতার একটা ব্যাপার এখানে রয়েই যায়।

তবুও বাংলাদেশের মানুষ থেকে যে সাহায্য আর আতিথেয়তা পেয়েছি জানি সেটা আমরা বিদেশীরা চাইলেই করতে পারি না। কিছু সময় আমরা যে সাহায্য আর ভালো ব্যাবহার পাই মানুষ থেকে সেটা খুশি মনে বরণ করে নেয়াই উত্তম।

যদিও একদম একা ট্রাভেল করার অভিজ্ঞতা টুকু হলো না.. তবুও বাংলাদেশ থেকে যে সেইফ জার্নি এক্সপেরিয়েন্স আর নতুন নতুন বন্ধু পেয়েছি তা কোন অংশেই কম নয়।

জুবায়েরের পরিবারজুবায়েরের পরিবার

বাংলাদেশে যারা আমাকে হোস্ট করেছিল আর যাদের সাথে আমার দেখা হয়, সাহায্য করে তাদেরকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিলঃ বাংলাদেশে নারীদের একা ট্রাভেল করা কি বিপদজনক? এটার জন্যই কি সবাই বলছিলো আমার একা ট্রাভেল করা উচিত না? ঠিক কোন জিনিসটা থেকে ট্রাভেলের সময় আমার প্রোটেকশন দরকার?

যেহেতু তাত্ত্বিক ভাবে আমি একা বাংলাদেশ ট্রিপটা শেষ করতে পারিনি তাও এই প্রশ্নগুলার উত্তর যা আমি দেখেছি আর শুনেছি  তার থেকে অনুমান করে বলা যায় ১৪০ মিলিয়নের বাড়ন্ত এই জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ কিন্তু সমস্যামুক্ত নয়!

বাংলাদেশের প্রায় সবজায়গায়ই দেখালাম মেয়েদের চলাফেরার ক্ষেত্রে কোন বাঁধা নেই, এমনকি ঢাকায় রাতেও যথেষ্ঠ সংখ্যাক মেয়ে নিজেদের প্রয়োজনে চলাফেরা করে। তাদের পর্দা করা বা মাথায় কাপড় দেয়ারও বাধ্যতামূলক কোন নিয়ম নেই, কিন্তু যখনই প্রশ্ন উঠে একা  কোথাও ঘুরতে যাওয়ার-গল্পটা পালটে যায়!

নৌকায় করে সুন্দরবন ঘুরে দেখা নৌকায় করে সুন্দরবন ঘুরে দেখা

আমি কিছু স্বাধীনমনা মেয়েদের সাথে কথা বলছি, তারা একা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা ইউরোপে ঘুরে এসেছেন কিন্তু নিজের দেশ বাংলাদেশে একা ঘুরতে যাওয়া হয়ে উঠে নি। কেন? প্রশ্নটার এক কথায় উত্তর দেয়া যায় এইভাবে- বাংলাদেশে মেয়েদের একা ঘুরতে যাওয়ার ধারণাটা গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষ ধরেই নেয় মেয়েদের একা ঘুরতে যাওয়া হয় নিরাপদ নয় অথবা অনৈতিক কোন ব্যাপার আছে এটায়!

আমার অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশের মেয়েদের একা ঘুরতে যাওয়ার স্বাধীনতা বা সুযোগ খুব একটা নেই।

ঘুরতে যাওয়ার সময় বিপদ থেকে একটা মেয়েকে রক্ষা করা বা সাহায্য করা এই ব্যাপারটা দয়ার মনোভাব থেকে আসে, কিন্তু এটা কি বড় একটা ইস্যুকে ঢেকে দিচ্ছে না? মেয়েরা যদি ঘর থেকে বেরই না হয়, নিজের দেশকে না দেখে তবে মন প্রশস্ত হওয়ার, বিশ্বাস স্থাপন করার বা অন্ধ বাঁধাধরাকে প্রশ্ন করার আত্মবিশ্বাস আসবে কোথা থেকে?

মংলা পোর্টের পাশেই এক নদীতেমংলা পোর্টের পাশেই এক নদীতে

অভিজ্ঞতা থেকে যদি প্রশ্ন করা হয় "আমি কি আবার বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছুক?" উত্তর হবে "অবশ্যই! যে সম্পর্কগুলো আমি বাংলাদেশের মানুষদের সাথে বানিয়েছি তাদের জন্য, যে জায়গাগুলো আমার পছন্দের তাদের আবার দেখা জন্য আর যে জায়গাগুলোই আমি যেতে পারি নি সেখানে যাওয়ার জন্য আমি অবশ্যই আরেকবার বাংলাদেশে যেতে চাই! তখন কিছু দিন কাটবে সবার সাথে ঘুরে আর কিছু দিন তোলা থাকবে একান্তই নিজের জন্য!"