গ্রেভি চিকেন আর বাবুদার নির্ঘুমরাত...!

যারা সকালে ১০ রুপীর নাস্তা, দুপুরে ১৫-২০ রুপীতে দুপুরের খাবার আর রাতে ৫০ রুপীতে ডিনার শেষ করে পুরো একদিনের খাবারের জন্য ৮০-১০০ রুপী খরচ করে, তাদের কাছে এক বেলায় ৬০০ রুপীর খরচ হয়ে যাওয়ার কষ্ট কতটা? সেটা বুঝতে খুব বেশী বড় দার্শনিক হবার প্রয়োজন হয়না। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনবেলা ১০০ রুপীর খরচ করাদের একবেলায় ৬০০ রুপী খরচের কষ্টটা অনুমেয়।

আমার আর আমার এবারের ভ্রমণ সঙ্গী বাবুদার ক্ষেত্রে সেই কষ্টটাকেই মুখ বুজে মেনে নিয়ে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছিল আমাদের বাবুদার! রাগে মাথার চুল ছিঁড়েছিলেন, ব্যাগ ছুড়ে ফেলেছিলেন! দেয়ালের সাথে ঘুষি মেরে নিজের হাতেই নিজে জখম করেছিলেন! দুঃখে কাতর হয়ে, কষ্টে পুড়ে গিয়ে, বেদনা আহত হয়ে! 
সেই গল্পটা এমন ছিল...

দুর্গাপুর থেকে বাস বহরমপুরের দিকে চলতে শুরু করার পর থেকেই বাবুদার কাছে একটি ফোন আসে। বাবুদার বন্ধুর বন্ধু তিনি। বাড়ি ওই বহরমপুরেই। আমাদের পৌছাতে বেশ রাত হয়ে যাবে, অচেনা যায়গায় হোটেল খুঁজে পেতে যেন সমস্যায় পড়তে না হয়, তাই বাবুদার বন্ধু তার বহরমপুরের বন্ধুকে আমাদেরকে একটু হোটেল খুঁজে দিয়ে সাহায্য করার জন্য ওনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ফোনের মাধ্যমে। সেই ভদ্রলোক একটু পরে পরে বাবুদার কাছে ফোন করে কতদুর গেলাম সেইসব খোঁজ খবর নিতে লাগলেন। বেশ ভালো।

কিন্তু আমার কেন যেন একটা সময় সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই একটু খটকা লাগতে লাগলো। একটু পরে পরে বাবুদা তাকে আর তিনি বাবুদাকে ফোন করেই যাচ্ছেন, ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার পরে পরে। যেটা ব্যাপারটা আমাকে বেশ অবাক করে ফেলছিল। অবশেষে ৫:৩০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা, প্রায় ৭০ কিলোমিটারের এবড়ো থেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে আমরা মুর্শিদাবাদের মুল শহর বহরমপুরে বাস থেকে নামলাম। বাবুদার বন্ধুর বন্ধু রাস্তার মোড়েই আমাদের জন্য দাড়িয়ে দিলেন বাইক নিয়ে। বেশ ভালোই লেগেছিল ব্যাপারটা তখন। যে একদম অপরিচিত যায়গায় কেউ আমাদের জন্য দাড়িয়ে আছে দেখে।

তিনি তার মোটর বাইকে করে আমাদেরকে যেদিকে একটু কম দামের হোটেল আর মুর্শিদাবাদ যাবার রেল স্টেশনের কাছে নিয়ে গেলেন। মাঝে পথে নেমে সেই বেশ রাতেই দেখলাম ব্রিটিশ আমলের সৃতি বহন করে চলা বিশাল এক মাঠ, যার চারদিকে চারটি কামান এখনো তাক করা আছে! যে মাঠের দৈর্ঘ-প্রস্ত সবদিকেই একই রকম বা স্কয়ার। যার এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত হেটে বা দৌড়ে গেলেই যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ভালো করে জগিং হয়ে যাবে। সেই মাঠ দেখে, ছবি তুলে হোটেলে সন্ধানে আবারো বাইকে চেপে বসলাম তিনজন মিলে।

কয়েক মিনিট এগিয়ে একটা ছোট রাস্তার মোড়ে নেমে একটি হোটেলে ঢুঁকে, সাধ্যের চেয়েও একটু কমে প্রায় নিম্ন মানের (মধ্য মানের চেয়ে সামান্ন একটু নিচু মানের) একটা কামরা পেয়ে গেলাম। রাত যেহেতু অনেক হয়েছে, একটু ঘুম ছাড়া যেহেতু রুমে আর কোন কাজ নেই তাই উঠেই পরলাম দুজন মিলে। টাকাটা তো বাচুক আগে।

রুমে ঢুঁকে ফ্রেস হবার আগেই ভাবলাম খেয়ে নেই। কারন বেশ রাত হয়েছে। আর বেশী সময় গড়ালে রাতের খাবার পাওয়া যাবেনা হয়তো। তাই হোটেলের সাথে লাগোয়া বেশ ভালো মানের রেস্টুরেন্টে ঢুঁকে পরলাম এই ভেবে যে, যেহেতু আগের দুইদিন বাজেটের চেয়ে কম খরচ হয়েছে, খাবার ক্ষেত্রে নিতান্ত অল্প টাকা গেছে, আর এখানে যেহেতু বাজেটের চেয়ে অনেক কম দামে হোটেল পেয়েছি সেহেতু এই রাতে একটু ভালো কিছু খাওয়া যেতেই পারে। বাবুদাও যুক্তি মেনে নিয়ে হোটেলে ঢুঁকে আলোচনা করে দুজনের জন্য একটি কাচ্চি বিরিয়ানি অর্ডার করবো।

কাচ্চি বিরিয়ানি কাচ্চি বিরিয়ানি

এমন সময় বাবুদা তার বন্ধুর বন্ধু, যিনি তার বাইকে করে আমাদের এখানে নিয়ে এলেন, তাকে নিতান্ত ভদ্রতা বসত আমাদের সাথে রাতের খাবার অনুরোধ করলেন। আর সেই ভদ্রলোক সাথে সাথেই রাজী হয়ে গেলেন। যে কারনে একটি কাচ্চির পরিবর্তে দুটো কাচ্চির অর্ডার করতে হল। ১৬০ রুপী করে। যার একটাতেই দুজনের আরামে হয়ে যাবে বলে হোটেল থেকে নিশ্চিত করেছিল। যেহেতু তিনজন তাই দুটো অর্ডার করতেই হল। খাবার এলো, সাথে সালাদ, চাটনি আর পেয়াজ। পরিমাণ আর স্বাদও মন্দ নয়। তিনজন মিলে দুটো কাচ্চি ভাগ করে নিয়ে আরাম করে খেতে শুরু করলাম।

খাওয়া শুরু করতেই বাবুদার বন্ধু বললেন, এতো ভালো খাবার একটু গ্রেভি না হলে খেয়ে আরাম হয়না। তাই তিনি একটি চিকেনকারী অর্ডার করলেন। আমরা একটুখানি অবাক হলেও তেমন কিছু ভাবিনি যেহেতু তিনি নিজে অর্ডার করেছেন। তো সেই গ্রেভি চিকেনকারী রেডি হয়ে আসতে আসতে আমাদের খাবার অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। আর যেহেতু এতো গ্রেভি চিকেন, পরিমাণটাও বেশ দেখে বাবুদা আর একটা রাইস অর্ডার করলেন, কারন পাতের খাবার দিয়ে এই চিকেন শেষ করা যাবেনা।

তো আবার একপ্লেট রাইস এলো, সাথে গ্রেভি চিকেনকারী যুক্ত হয়ে বেশ উদরপূর্তির একটা ভোজ হল, যদিও আমি সেই রাইস আর চিকেনকারী ছুঁয়েও দেখিনি। কারন পেতে সেই যায়গা আমার ছিলোনা। কাচ্চিতেই আমি ভরপুর। 
খাওয়া-দাওয়া শেষ। এবার বিলের পালা। আর এখানেই শুরু হল আমাদের হতাশা আর কষ্টের খেলা। দুই কাচ্চির বিল ৩০০ রুপী। এতো ভালো একটা ডিনারের জন্য যথেষ্ট সহনীয়। তার উপর আছে আগের দুই দিনের বেশ ভালো টাকা বেঁচে যাওয়ার অপরিসীম তৃপ্তি। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু......

যখনই বিল টেবিলে এলো। বাবুদার বন্ধু তার বাসায় দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে উঠে পড়লো, আমাদেরকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল, শুভ রাত্রিকে নিকষ কালো হতাশার অন্ধকার আর কষ্টের বেড়াজালে মুড়ে দিয়ে! কারন তার অর্ডার দেয়া গ্রেভি চিকেনের দাম ছিল ২৪০ রুপী আর সেই সাথে বাবুদার অর্ডার দেয়া রাইসের রাইসের দাম ছিল ৬০ রুপী যেটা তিনি অর্ডার করেছিলেন গ্রেভি চিকেনের সাথে সামঞ্জস্য করে। সবমিলে বিল এসেছে ৬০০ রুপী!

গ্রেভি চিকেনগ্রেভি চিকেন

যেখানে আমাদের বাজেট ছিল ১৫০-১৬০ রুপী। সেখানে সেটা বেড়ে চারগুন হয়ে গেছে! কারন আমরা ভেবেই নিয়েছিলাম যেহেতু ২৪০ রুপী দামের গ্রেভি চিকেনের অর্ডার তিনি করেছেন, সেটার বিলও তিনিই দেবেন। কিন্তু তিনি বাই বলে চলে যাওয়াতে, আমাদের আর কিছুই করার নাই দেখে সেই ৬০০ রুপীই বিল দিতে হয়েছিল সে রাতে!

সেই দুঃখে, কষ্টে, হতাশায় মুষড়ে পড়েছিলাম দুজনেই। যেখানে দুজনের তিন হাজার টাকায় পুরো ট্যুর শেষ হয়ে যাবে হিসেব করে ফেলেছিলাম দ্বিতীয় দিন শেষেই সেখানে সেটা ৩০০ রুপী করে বেড়ে হয়ে গিয়েছিল ৩৩০০ রুপী! ৬০০ রুপীর ডিনার বিলের দুঃখে, কষ্টে, হতাশায় সেই রাতে বাবুদা আর ঘুমোতেই পারেননি! টাকার কষ্ট বুকে নিয়েই বাবুদা পার করেছিলেন এক নির্ঘুমরাত।

বুকে নিয়ে ৬০০ রুপীর ডিনার ও গ্রেভি চিকেনে অসীম কষ্ট!