কাতালানিয়ায় আসছি কয়েক দিন হয়ে গেল, খাঁটি ট্যুরিস্টের মত বালুময় সৈকতে যেয়ে দাপাদাপি করা হলে ধুমসে, শিল্পবোদ্ধা সাজার ব্যর্থ চেষ্টায় গাউডির সমস্ত কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, ক্রীড়াপ্রেমিক সাজার চেষ্টায় অলিম্পিক ভিলেজ হেঁটে, বার্সেলোনার অন্যগ্রহের ফুটবল ক্লাবের সামনে দিয়ে ঘোরাঘুরি করে বার্সেলোনার অধিবাসীদের মত জুরিখ পাবে বসে এন্তার পানীয় ধ্বংস করার পরও স্থানীয় বন্ধু দানি ব্যটল রোসেল বলে বসল- নাহ, চার বেড়ালের রেস্তোরাঁয় এক বেলা না খাওয়া পর্যন্ত তোমাদের এই সফরকে সফল বলা যাচ্ছে না !

চার বেড়ালের রেস্তোরাঁ ! একখানা নয়, পুরো এক হালি বেড়াল! এমনিতেই কাতালান রাজধানীতে এসে ঝিনুকের স্ট্যু থেকে শুরু করে অক্টোপাসের শুড় ভাজা সবই খাওয়া হয়েছে, তাই বলে বেড়ালও খেতে হবে? না, বেড়াল খেতে পারব না, ঢের আপত্তি আছে আমার মিউ মিউ করে এমন প্রাণী খেতে। দানি ব্যাটা কাতালান মার্কা প্রাণখোলা ঠা ঠা হাসি দিয়ে বলল- চল আজ সন্ধ্যায় সেখানে, বুঝবে কেন বলছি সেখানে না গেলে বার্সেলোনা ঘোরা অপূর্ণ থাকবে!

দানি ঠিক পূর্ব পরিচিত নয়, বরং বার্সেলোনার ছেলে হুয়ান আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ছোকরার আবার বাংলাদেশ ভ্রমণের ব্যপক ইচ্ছা, একবার ক্ষুদ্রঋণের কী একটা প্রোজেক্টে জানি সেখানে চলেই গেছিল কিন্তু বন্যা দেখা দেওয়ায় পরিকল্পনাটি মাঠে শুকিয়ে যায়। বার্সেলোনা আসার পরপরই হুয়ানের বন্ধু দানির সাথে পরিচয়, মহা হাসি খুশী ছেলেটার প্রেমিকা ফিনল্যান্ডের মেয়ে, আমার ভ্রমণসঙ্গিনীও ফিনল্যান্ডের, সেই আলাপেই খুশী মনে স্বেচ্ছায় বার্সেলোনা ঘুরিয়ে দেখার দায়িত্ব নিয়ে নিল সে।

(আমি, দানি, হুয়ান, ফটুগফুরনী ক্যামেরার পিছনে )

শহরের সবচেয়ে মজার আইসক্রিম শপে চেয়ে অন্যরকমের দারুণ অভিজ্ঞতা হল, আইসক্রিম কেনার পর দাম দিয়ে গেলে টাকা নেবার আগে তরুণী দোকানদার চোখ মটকে বলল- বাইলা বাইলা! বাইলা মানে নাচ, কিন্তু আইসক্রিম কিনতে আবার নাচানাচি কেন! বাদামী চোখের তন্বী নিজেই একটু শরীর দুলিয়ে বলল- বাইলা! আমাদের এখানে আইসক্রিম কিনতে হলে তোমাকে একটু হলেও শরীর ঝাঁকিয়ে নাচের ভঙ্গী করতে হবে, ঝকঝকে হাসি দিতে হবে, গোমড়ামুখো কারো কাছে আমরা আইসক্রিম বেচব না!

বাহ, বেড়ে ব্যবস্থা তো ! আইসক্রিম খাও, তো নাচ দেখাও!

অন্য দিকে দানি দেখি মুচকি মুচকি হাসছে দরজায় দাড়িয়ে, আবার ছোকরার অন্য রূপ টের পাওয়া গেল তাপাস খেতে যেয়ে, স্পেনের আবহাওয়া খুব ভাল, এমন নিরীহ কথায় সে তেড়ে ফুঁড়ে জ্বলে বলে বসল- সেটা স্পেনে যেয়ে বল, এটা বার্সেলোনা, এটা কাতালান রাজ্য, স্পেনকে আমরা দেশ হিসেবে মানি না, ব্যাটারা আমাদের জবরদখল করে রেখেছে গত ৩০০ বছর ধরে। যদি তার আগে ১৭০০ বছর আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারি, ভবিষ্যতেও স্বাধীন কাতালান হব আমরা, দেখ না ইতিমধ্যেই আমাদের আলাদা ফুটবল দলের দাবী পর্যন্ত উঠেছে ফিফার কাছে।

হুম, কাতালান আর স্প্যানিশদের রেষারেষি বেশ স্পষ্ট বোঝা যায় এখানে আসলে, একাধিক পানশালাতেও দেখলাম লেখা আছে Barcelona is not Spain, its Catalan. কিন্তু কাতালান বেচারাদের হাতে নেয় কোন ক্ষমতা, শেষ ভরসা তাদের নয়নমণি ফুটবল ক্লাব, রিয়েল মাদ্রিদ- বার্সেলোনার খেলায় বাড়তি উত্তেজনা যোগ করে এই ঐতিহাসিক ঘৃণাময় সম্পর্ক।

স্প্যানিশরাও যে কিভাবে সুযোগ পেলেই সেই বৈষম্য ঝালাই করে তা দেখতে পেলাম পিকাসো জাদুঘরে গিয়ে, সেখানের অধিকাংশ শিল্পকর্মই নানা অজুহাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাদ্রিদের গ্যালারিগুলোতে! কাতালানরাতো বলে, বজ্জাত লুটেরা স্প্যানিশগুলো সুযোগ পেলে ল্য সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া পর্যন্ত উপড়ে নিয়ে যেত!

যাক, সেই সন্ধ্যায় চার জনে হাজির হলাম চার বেড়ালের রেস্তোরাঁয়, ইংরেজিতে লেখা Four Cats , সেই সাথে Els Quatre Gats। সামনে বেধড়ক লম্বা লাইন! তরমুজের বিচির মত দাঁত বাহির করে বাহিরের দরজায় কর্মরত বেয়ারা জানালেন, রিজার্ভেশন না থাকলে কমপক্ষে সোয়া ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে !!

কী এমন রেস্তরাঁ যে খাবারের লিস্টি দেখার জন্যই দেড় ঘণ্টা তক দাড়িয়ে দাড়িয়ে পায়ের ব্যায়াম করতে হবে! অন্য কোথাও যাবার প্রস্তাব এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে হুয়ান বলল- তুমি বুঝতে পারছ না, ১৮৯৭ সাল থেকে এই রেস্তোরাঁর যাত্রা শুরু, আর এটা সবসময়ই ছিল আমাদের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, এই চার বেড়াল আসলে আমাদের বিখ্যাত চার শিল্পী Pere Romeu, Santiago Rusiñol, Ramon Casas, Miguel Utrillo! তারাই শিল্পীদের আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে ক্যাফেটির পত্তন করেন, এবং মূল নাম আসে প্যারিসের সেই বিখ্যাত কালো বেড়াল ক্যাফের নাম অনুকরণে। ১১৫ বছর ধরে এটি পানশালা, ক্যাবারে, হোটেল, রেস্তরাঁ ইত্যাদি নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, আর জানো এখানে কোন বিখ্যাত শিল্পীর প্রথম একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী হয়েছিল, ১৯০০ সালে? যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ !

রহস্যের গন্ধ পেয়ে বললাম, কে সেই শিল্পী?

কে আবার ! জনাব Pablo Diego José Fransisco de Paula Juan Nepomuceno María de los Remedios Cipriano de la Santísima Trinidad Martyr Patricio Clito Ruiz y Picasso যাকে সারা বিশ্ব চেনে পাবলো পিকাসো নামে !

হায় হায়! এরপরে ঘণ্টা কেন, সারা দিনমান অপেক্ষা করতেও কোন আপত্তি ছিল না চার বেড়ালের রেস্তোরাঁয় প্রবেশের জন্য। পাবলো পিকাসো তার শিল্পী জীবনের শুরু দিনগুলি বার্সেলোনাতেই কাটিয়েছিলেন, (বার্সেলোনার জীবনে শুরু করা ব্লু পিরিয়ডের আত্মচিত্রসহ বেশ কিছু শিল্পকর্মের এক অসাধারণ প্রদর্শনী নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাতে ) , এবং এই ক্যাফেতেই শিল্পী ইয়ারবক্সীদের উৎসাহে প্রথম একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে ফেলেন প্রবল আত্মবিশ্বাসে। আবার সেই বছরই প্রথম প্যারিস যাত্রা করেছিলেন অন্য প্রদর্শনীর জন্য।

পিকাসোর কথা অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছিল এই শহরেরই সমুদ্রসৈকতের এক বৃদ্ধ, বলা যায় না, আমাদের পাবলো পিকাসো যে রকম প্রবল প্রেমিক পুরুষ ছিলেন, হয়ত এই তরুণ বৃদ্ধের সাথে তার কোন রক্তের সম্পর্ক থাকতেই পারে। ছবি দেখে বলেন দেখি আমার ধারণা কী খামোখা সৃষ্টি হল?

অবশেষে ভাগ্যদেবীর মুখে ছাই দিয়ে ঘণ্টাখানেক আড্ডাবাজির পরেই ভিতরে বসার অনুমতি মিলে গেল, এতক্ষণ দাড়িয়ে রাখার জন্যই কিনা টেবিলে বসতেই মুফতে পিচ্চি পিচ্চি কিছু জলপাই আর সফেদ রুটি দিয়ে গেল একজন। পরে শুনি এই লিলিপুট জলপাই কাতালানের স্পেশাল উৎপাদন, খেতেও বেশ, যদিও চট করে শেষ হয়ে যায়। এত ভিড় সত্ত্বেও বেয়ারা ভদ্রলোক বেশ রসিয়ে গালগল্প করতে করতে অর্ডার নিলেন আমাদের, শুনলাম তার বাড়ী আন্দালুসিয়ায়। আন্দালুসিয়া শুনলেই আমার উজ্জল কমলাবর্ণের মন ভালো করা রোদ আর ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কথা মনে আসে, যদিও লোরকার অঞ্চলের লোকের সাথে তার কবিতা নিয়ে কথা চলাচালির সুযোগ মিলল না ভিড়ের কারণে।

বেশ বড় রেস্তোরাঁটি, দেয়ালে দেয়ালে নানা চিত্রকর্ম ঝোলানো, জাদের অধিকাংশই এইখানে একসময়ে আগত শিল্পীদের সৃষ্টি। তার মধ্যে ঘর আলো করে আছে Ramon Casas and Pere Romeu on a Tandem, র‍্যামন কাসাসের এক অনবদ্য চিত্রকর্ম। পরিবেশটা আসলেই বেশ আলাদা, মনে হচ্ছে খাবার চেয়ে আড্ডা দিতেই এখানে আসে মানুষ, আসলে এককালে তাইই আসত, এখন আসে স্থানটির খ্যাতিতে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় তৎকালীন ক্যাফেটি বন্ধ হয়ে গেলেও ১৯৮৯ সালে আবার চালু করা হয় কিছু মানুষের উদ্যোগে।

খাবার চলে এসেছে, সামুদ্রিক খাবারের সাথে আজকের বিশেষ আকর্ষণ ফোয়াগা। সুনীল গাঙ্গুলীর ছবির দেশে কবিতার দেশেসহ অনেকের ভ্রমণ কাহিনীতেই ফোয়াগা নিয়ে অনেক পড়া সত্ত্বেও ফোয়াগার দেশ ফ্রান্সে যেয়ে তা খাবার সুযোগ করতে পারিনি, এখানেই তার বাস্তবায়ন ঘটল। জিনিসটা পাতলা জেলির মত, কিন্তু মোটেও থিকথিকে নয়। তৈরি করা হয় অতি নিষ্ঠুর উপায়ে, পোষা একধরণের বিশেষ রাজহাঁসকে ঠেসে ঠেসে খাবার খাইয়ে তার লিভার বড় করে, সেই লিভার দিয়েই তৈরি হয় উমদা ফোয়াগা, মানে অল্প ফোয়াগার জন্যই হয়ত অনেক রাজহাঁস মারতে হয়। রাজহাঁস যতই বড় হোক, তার লিভার আর কত বড়ই বা হতে পারে! যদিও জানা যায় ৪৫০০ বছর আগেও প্রাচীন মিশরে ঠেসে ঠেসে খাইয়ে রাজহাঁসদের নাদুসনুদুস করা হত!

ব্যক্তিগত কারণে বুনো প্রাণী খেতে আমার আপত্তি আছে, এছাড়া স্থানীয় খাবার যতই কিম্ভুত লাগুক তার স্বাদ নিতে পেছাই না কখনোই, আর ফোয়াগা তো অতি খাসা চীজ! মুখের মাঝে গলে গলে গেল রুটি সহ।

খাবার ফাঁকে যেন খুব সাধারণ কোন তথ্য দিচ্ছে এমন ভাব নিয়ে হুয়ান বলল, ওহ, তোমাকে বোধ হয় বলা হয় নি, আমার ঠাকুরদাও একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন, এই ক্যাফেতে আড্ডা দিতেন অন্যদের সাথে গড্ডালিকা প্রবাহে মেতে, পিকাসো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন জীবনের এক পর্যায়ে।

বলিস কী, মামুর বুটা! তোর দাদা আঁকা ছবি কোথায়?

আমাদের সংগ্রহে অল্প কিছু আছে, বাকীগুলো বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগে, দুয়েকটা গ্যালারীতেও আছে, চাইলে দেখা যেতে পারে।

বাপরে, মেঘ না চাইতেই জল, সাধাসিধে ডিনার করতে এসে পিকাসোর প্রথম একক প্রদর্শনীর স্থান আবিষ্কার, কাতালান সংস্কৃতির মিলন কেন্দ্রে আড্ডা, এবং সঙ্গী স্বয়ং পিকাসোর শিল্পী বন্ধুর নাতি! আর কী ! চলল আড্ডা বেদম তালে –

(রেস্তোরাঁর ছবিগুলো চার বেড়ালের ওয়েব পেজ থেকে নেওয়া।)