আমরা যেদিন সোনমার্গ যাবো, সেদিন কাশ্মীরে ঈদ। তো সকালে পথে যেতে যেতে প্রথমবার সিন্ধু নদের প্রথম লোহার ব্রিজ পার হয়ে একটা ছোট বাজারের কাছে থেকে কিছু শুকনো খাবার কিনে গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল, কারন সামনে নাকি রাস্তা বন্ধ।

কোথায় যেন পুলিশের সাথে সাধারণ জনতার ধাওয়া, ইট পাটকেল নিক্ষেপ আর পথ রোধ চলছে! ড্রাইভারের মোবাইলের মাধ্যমে এই তথ্য পাওয়া গেল! অনেকে টেনশনে পরে গেল, কি হবে এখন? যাওয়া না হয় নাই হল, কোন ঝামেলায় যদি পরে এই সুদূর কাশ্মীরে এসে! তখন?

মিনিট ৫/১০ পরে আবারো কয়েক যায়গায় ফোন দিয়ে জানতে পারলো, এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। পুলিশ রাস্তা খুলে দিয়েছে। তাই আমরাও পথ চলতে শুরু করলাম। কিছুটা ভয় আর কিছুটা শঙ্কা মাথায় নিয়েই। এরপর আর তেমন কোন ঝামেলার খবর কানে না আসাতে বেশ নির্বিঘ্নেই পৌঁছে গিয়েছিলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। সারাদিন বেশ দারুণ কাটল সবার। এখন ফেরার সময় হয়ে এসেছে।

রঙ-বেরঙের পাহাড়ে তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আর আমাদের মনেও নানা রঙের সুখ সৃতি, ছবি আর পরিবার নিয়ে উপভোগ করা এক অন্যতম দিনের বর্ণীল বিকেলের উচ্ছ্বাস হাসি-আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দের মুখ গুলো নিমিষেই কালো মেঘের আঁধারে ঢেকে গেল, মিলিয়ে গেল উচ্ছ্বাসের হাসি, শুনে পথে বেশ ঝামেলা হয়েছে, কখন এখান থেকে গাড়ি ছাড়তে পারবে ঠিক নেই!!
আমরা যখন সকালে এদিকে আসি, তখনই ছোট ছোট কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা শুনেছিলাম, যদিও ততটা পাত্তা দেইনি তেমন।

কিন্তু এখন জানতে পারলাম, দুপুরে, বিকেলে এমনকি সন্ধ্যায়ও নাকি বিভিন্ন যায়গায় বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যে কারনে ওদিকের রাস্তায় এই মুহূর্তে যাওয়াটা বিপদ জনক আর ঝুঁকিপূর্ণও। এমনকি রাস্তায় টুরিস্ট গাড়ি পেলে পাথর ছুড়ে মারে অধিকার বঞ্চিত, দিশেহারা জনতা! এই কথা শুনে অনেকেরি চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ পড়েছে দেখলাম। কিন্তু আমার কেন যেন একটা দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি হচ্ছিল! যদিও সাথে বৌ-বাচ্চা আছে তবুও রোমাঞ্চ লাগছিল নিজের ভেতরে!

এখান থেকে যাত্রা শুরু করতে দেরি হবে জেনে আমরা যে যার মত রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে সময় বাঁচাতে বেরিয়ে পরলাম। আহ কি অদ্ভুত ছিল সোনমার্গের সেই ভেড়ার মাংস, জবের রুটি, কাঁচা পেঁয়াজ আর সাথে কোমল পানীয়! দুর্দান্ত ছিল, যেন এখনো মুখে লেগে আছে! মজায় মজায় এতটাই খেয়ে ছিলাম যে কতটা যে ঝাল সেটা খাবার সময় বুঝতে পারিনি! বুঝেছিলাম খাওয়া শেষ হবার পরে অনবরত মুখ জ্বালা করার পরে।

খেতে খেতেই মোবাইলে ফোন দিয়ে জানা গেল যে রাত ৯ থেকে ৯:৩০ এর মধ্যে আমরা যাত্রা শুরু করতে পারবো। খাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় ৯ টা বেজে যাওয়াতে, খেয়েই বেশী করে পানি আর ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে উঠে পরলাম আমাদের গাড়িতে। ও হ্যাঁ ঈদের দিন ছিল বলে শুধুমাত্র সেই দিনের রাতের খাবারটা আমরা ড্রাইভারকে অনেকটা জোর করেই খাওয়ালাম। এবং এতে যে সে ভীষণ খুশি হয়েছিল সেটা তার অভিব্যাক্তিতেই ছিল স্পষ্ট। আর তার খুশিটা ছিল আমাদের ছোট্ট একটা তৃপ্তি।

শুরু হল আতঙ্কের মধ্যে রোমাঞ্চকর যাত্রা। নীরব, অন্ধকার, শুনশান রাতের আঁকাবাঁকা, পাহাড়ি উঁচুনিচু রাস্তায় নতুন এক ধরনের রোমাঞ্চ। কেউ না ঘুমিয়ে, অপলক আর সতর্ক চোখে চেয়ে আছে সামনের দিকে। ড্রাইভারের পরামর্শ, সবাই কাঁচের জানালা যেন লাগিয়ে রাখি, সামান্য একটু খোলা রেখে, যেন বাতাস ঢুকতে পারে।

আর যদি কেউ কাউকে কিছু ছুড়ে মারতে দেখে বা এমন কিছু মনে হয়, তবে যেন সাথে সাথে সিটের নিচে বসে পরে এবং অন্যদেরকেও বসে যেতে বলে! কারন পাথর যদি মারে আর যদি তা জানালার কাঁচ ভেঙে ভিতরে ঢুকে পরে, তবে বেশ জখম হবার সম্ভাবনা আছে! সবাই তাই খুব খুব সতর্ক ভাবে চারদিকে অবলোকন করছিলাম অন্ধকারেই! গাড়ির সামনের আলোতে চারপাশে যতটুকু দেখা যায়।

আমাদের চলার পথ অন্ধকার আর আতঙ্কের হলেও, বামে বয়ে চলা সিন্ধুর উম্মত্ততা আমাদের মাঝে মাঝে মাতাল করে তুলছিল, ইস যদি ওর পরশ আর একবার নেয়া যেত? যদি আর একবার ছুঁয়ে দেখা যেত ওর কোমল শরীর! যদি আর একবার উপভোগ করা যেত ওর হিম শীতলতা! কিন্তু সে যে অসম্ভব এখন, স্থানীয় মানুষের কিছু আতঙ্ক ছাড়াও আছে পুরো রাস্তা জুড়ে আর্মির সতর্ক প্রহরা, এই জনমানবহীন রুক্ষ পাহাড়েই!ওরা যেভাবে সতর্ক অবস্থায় আছে যে কোন সময় ঠুস করে দিলেই পরপারে! তবে সেই দুঃখ কিছুটা ভুলে ছিলাম কানের পাশে অনন্ত সময় ধরে বয়ে চলা সিন্ধুর উচ্ছ্বসিত চিৎকারে।

মাঝে মাঝে দুই একটি গাড়ির দেখা পেতেই দারুন আনন্দ লাগে যে নাহ আমরা একা নই আরও কিছু মানুষ আছে যারা এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে বা আসছে। পুরো রাস্তার প্রায় কোথাও কোন আলোর দেখা নাই। একদম সুনসান আর অন্ধকার, যেটা একটা গা ছমছমে ভাব নিয়ে এসেছিল আরও বেশী করে। তবে একটা যায়গায় আমাদের চোখের সামনেই একটি পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে অন্ধকারের মধ্যেই কারা যেন ঠিকই পাথর ছুড়ে মেরেছিল, আমাদের গাড়ি পেরিয়ে আসার পরেই।

তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কোন ঘটনা বা ঝামেলা ছাড়াই রাত প্রায় ১১:৪৫ এ আমরা ঢুকে পরেছিলাম সুনসান রাস্তার পরে শ্রীনগরের মুল শহরে। আর একটু পরেই ডাল লেকের পাড় ঘেঁসে চলতে শুরু করেছিল আমাদের গাড়ি। তখন সবাই একটু হাঁফ ছেঁড়েছিল টেনশনের নীরব রাতের কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা পেরোনোর পরে।

তবে আর যাই হোক, কোন ঝামেলা না হোক, একটা দারুণ রোমাঞ্চ, টেনশন, কিছু অস্থিরতা কাজ করেছিল মনে মনে। সব মিলিয়ে সেই পুরনো, অনেক নাম শোনা, কাশ্মীর কাশ্মীর একটা গন্ধ পেয়েছিলাম এই যাত্রায়, সোনমার্গ থেকে শ্রীনগর ফেরার সময়টায়!

যত ঝামেলাই হোক, সাধারণত টুরিস্টদের কেউ কিছুই বলেনা। কারন ওরা সবাই জানে টুরিস্ট ওদের অন্যতম আয়ের উৎস। তাই কিছুটা রোমাঞ্চ থাকলেও, ভয়ের বা আতংকের কিছু নেই।

আর তাছাড়া, কাশ্মীর গিয়ে একটু রোমাঞ্চ না হলে কি জমে বলেন??