মরুভুমি ও জয়সালমীর দেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। প্রথমত, মরুভুমি বাদে প্রায় সবই দেখা হয়েছে। আর জয়সালমীরের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে- রাজপুতদের বীরত্বের ইতিহাস, সত্যজিৎ রায়ের সোনার কিল্লা, অঞ্জন দত্তের সেই গান- বৃষ্টি এলে চলে যাও জয়সালমীর। আর হঠাৎ বৃষ্টির নচিকেতার " সোনালী প্রান্তরে" গানতো আছেই। তাই এবার কাশ্মীর ভ্রমণের প্লান করার সময় জয়সালমীরকে অনেক কষ্টে যুক্ত করলাম।

যদিও এখন মরুভুমি দেখার জন্য উপযুক্ত সময় নয়। যাহোক কাশ্মীর ভ্রমন শেষে দিল্লী পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ৯টায় উদ্দেশ্য রাজস্থানের জয়সালমী যাব। আমাদের ট্রেন দিল্লী-জয়সালমীর এক্সপ্রেস বিকাল সাড়ে ৫ টায়। হাতে কিছু সময় আছে। তাই দেরী না করে নিউ দিল্লী রেলস্টেশনের কাছে একটা হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে ঘুরতে বাহির হলাম।

Red Fort ও India Gate দেখে অনেক খোঁজাখুজি করে রেল স্টেশনের পাশেই দাদা-বৌদি নামে বাঙালী হোটেলে দুপুরের খাবার সারলাম। কয়েকদিন পর বাংগালী খাবার খাবার পেয়ে খেলামও সবাই পেট পুরে। দামও কম। মাত্র ৭০ রুপিতে মাছ ও বেগুন ভাজি, সাথে ডাল ও ভাত ফ্রী। খাওয়া-দাওয়া করে নিউ দিল্লী স্টেশনে গেলাম ট্রেন ধরার জন্য। কিন্তু গিয়েই শুনলাম এখান থেকে নয়, ট্রেন ছাড়বে Old Delhi স্টেশন থেকে। মাথায় যেন বাজ পড়লো। হাতে আছে মাত্র ৪০ মিনিট।

জয়সালমীরজয়সালমীর

প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে একটা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে মনে মনে দোয়া পড়তে পড়তে রওনা দিলাম Old Delhi স্টেশন বরাবর। আর বোকামীর জন্য নিজের উপর এত রাগ হচ্ছিল যেন নিজের চুল নিজেই ছিড়ে ফেলি। এত কাছে এসে সামান্যর জন্য এতদিনের ইচ্ছা ধুলিস্যাৎ হবে ভাবতেই পারছিনা। আবার পরের ট্রেনে যাব? সে উপায়ও নাই। কারণ এই একটা ট্রেনই দিল্লী থেকে জয়সালমীর যায়। আবার আমাদের বিমানের ফিরতি টিকেটও কাটা আছে।

সুন্দর বালিয়াড়ী সুন্দর বালিয়াড়ী

যাহোক শেষ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার মত একেবারে শেষ মূহুর্তে ট্রেনে উঠতে পড়লাম। আর ট্রেনটা বোধহয় আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। উঠা মাত্রই পো আওয়াজ করে চলতে শুরু করলো। কিন্তু সমস্যা যেন পিছু ছাড়ছে না। আমাদের রিজার্ভেশন করা ছিট। কিন্তু অন্য লোকজন আমাদের সিটে বসে আছে। চেকারকে বলেও কোনো কাজ হলো না। উল্টো বলে ওনাদের সাথেই শেয়ার করে যান। ২ ঘন্টা পর সবাই নেমে গেলে আপনার ঠিকমত বসতে পারবেন।

জয়সালমীর রেল স্টেশনজয়সালমীর রেল স্টেশন

যাহোক ট্রেনেই খাওয়া সেরে সবাই ঘুম দিলে ঘটলো চোর বাবার আগমন। আমাদের একজন টের পাওয়াতে এযাত্রায় রক্ষা পেলাম। এরপর ভালভাবেই রাত পার করে সকালে যখন উঠলাম। তখন আমরা Already মরুভুমিতে ঢুকে পড়েছি। আর মরুভুমির উষ্ণ লু হাওয়া আমাদের উষ্ণ অভিনন্দন জানাতে ভুল করলো না।

রেল লাইনের দুপাশে ময়ূর, হরিণ ও উটের দল আমাদের ভ্রমণকে সহজ করে দিল। পাশের সিটে বসা এক বিএসএফ সদস্যের সাথে অনেক কথা হলো। ওনার পোস্টিং সিয়াচেন হিমবাহে। ছুটিতে বাড়ী যাচ্ছেন। সিয়াচেন হিমবাহ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনলাম। ওখানে অনেক শীত, তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রী সেঃ পর্যন্ত নেমে যায়। যাহোক মরুভুমি দেখতে দেখতে ও গল্প শুনতে শুনতে সকাল ১১:৩০টায় পৌঁছালাম অনেকদিনের স্বপ্ন সোনালী শহর জয়সালমীরে।

মন্দিরমন্দির

এরপর হোটেলে গিয়ে প্যাকেজ ঠিক করে বাঙালি হোটেলে অবাঙালী খাবার খেয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি স্বপ্নের থর মরুভুমির সবচেয়ে সুন্দর বালিয়াড়ী Sam Sand Dunes যাবার। এই সুযোগে জয়সালমীর ও থর মরুভুমি সম্পর্কে একটু বলে নেই। জয়সালমীর ভারতের রাজস্থান প্রদেশের পাকিস্তান সীমান্ত ঘেষা একটি মরু শহর। রাজা জয়সালের নাম অনুসারে শহরের নামকরণ করা হয়েছে। শহরের সকল স্থাপনা Yellow stone দিয়ে তৈরী। তাই একে Golden city বা সোনালী শহরও বলে। এখানেই সত্যজিৎ রায়ের সোনার কিল্লা বা Golden fort অবস্থিত।

থর মরুভুমিথর মরুভুমি

থর মরুভুমিঃ

বিশ্বের ১৭ তম বৃহৎ মরুভুমি। আয়তন ৩২০০০০ বর্গমাইল যা বাংলাদেশের প্রায় ২.৫ গুন। এর মধ্যে ৮৫% ভারতে ও ১৫% পাকিস্তানে অবস্থিত। ভারতের অংশের ৬০% রাজস্থানে, বাকী অংশ গুজরাট, পান্জাব ও হরিয়ানা প্রদেশে। এই থর মরুভুমিতে Sam sand dunes ( বালিয়াড়ী) অবস্থিত। এখানকার বালিয়াড়ী দেখতেই দেশ বিদেশের অনেক পর্যটক প্রতিবছর ভীড় জমায়। জয়সালমীরের আয়ের ৮০% আসে পর্যটন থেকে। যাহোক অনেক বকবকানি হল। এবার আসল কথায় ফিরে আসি।

ছুটে চললাম মরুভুমির বুক চিরে। ছুটে চললাম মরুভুমির বুক চিরে।

বিকাল ৪ টায় হোটেল রাজভিলা থেকে গাড়ী করে রওনা দিয়ে পথিমধ্যে Jain Temple দেখে Sam sand dunes পৌঁছে ৬ জন তিনটি উট নিয়ে ছুটে চললাম মরুভুমির বুক চিরে। শুরু হলো আমাদের Camel safari. New experience and more excitement। এখানেই সালমান খানের বাজরাঙ্গী ভাইজান ও ফেরদৌসেরর হঠাৎ বৃষ্টি ছবির শ্যুটিং হয়েছিল। এরপর উটের গাড়ী নিয়ে ঘুরে সূর্যাস্ত উপভোগ করে গেলাম তাবুতে যেখানে আমরা রাত কাটাবো।

সত্যজিৎ রায়ের সোনার কিল্লাসত্যজিৎ রায়ের সোনার কিল্লা

ভাবতেই ভাল লাগছে মরুভুমিতে Campaign। তাবুর গেটে কপালে ফোটা দিয়ে সবাইকে বরণ করে নিচ্ছে দুইজন মেয়ে।  এরপর তাবুতে fresh হয়ে খোলা মঞ্চে জায়গা দখল করলাম রাজস্থানী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখার জনা। অনুষ্ঠান চলছে, নাস্তা আসলো। নাস্তা খাচ্ছি আর গানবাজনা উপভোগ করছি। ৮ টা পাতিল মাথায় নিয়ে গ্লাসের উপর দাড়িয়ে নাচটা সবাই উপভোগ করলাম।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

ডিনার সেরে মরুভুমিতে রাত কাটিয়ে ভোরে Jeep safari করতে বের হলাম, সাথে মরুভুমিতে সূর্যোদয় দর্শন। এখানে Jeep safari অনেক Adventurous ও উপভোগ্য। Breakfast সেরে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের গাড়ীতে করে গাডিসার লেক ও কিছু টেম্পল দেখে গেলাম Golden Fort দেখতে। এখানেই সত্যজিৎ রায়ের সোনার কিল্লা ছবির শ্যুটিং হয়েছিল। অারো কিছু ছোটখাটো জায়গা ঘুরে হোটেলে এসে Lunch করে ছুটলাম রেল স্টেশনে জয়সালমীর - দিল্লী এক্সপ্রেস ধরতে। সাথে আবার সেই আব্দুল্লাহ ভাই। সবশেষে Golden city ও Golden fort কে বিদায় জানিয়ে শেষ হলো আমাদের থর যাত্রা।

সূর্যোদয় দর্শনসূর্যোদয় দর্শন

কিভাবে যাবেনঃ

কলকাতা থেকে জয়সালমীর সরাসরি ট্রেন আছে। সপ্তাহে ১ দিন( সোমবার) চলে। তবে দিল্লী হয়ে যাওয়াই ভাল। দিল্লী-জয়সালমীর এক্সপ্রেস প্রতিদান ১৭:৩৫ এ পুরাতন দিল্লী জংশন থেকে ছেড়ে পরদিন সকাল ১১:৩০ টায় জয়সালমীর পৌছে। আবার জয়সালমীর থেকে ১৭:৩০ ছেড়ে ১১:৩০ এ দিল্লী পৌছে। এখানে কোন বিমান বন্দর নাই। বিমানে যেতে চাইলে যোধপুর অথবা জয়পুর গিয়ে বাস বা ট্রেনে যেতে হবে।

মরুভুমিতে রাতমরুভুমিতে রাত