বেশ একটা ভালো লাগা কাজ করছিল প্রত্যাশার চেয়ে তাড়াতাড়ি বুড়িমারি পৌঁছে যাওয়ায়। কিন্তু ইমিগ্রেশনের বিল্ডিং এ ঢুকতেই ভালো লাগাটা এক নিমিষেই বিষাক্ত হয়ে উঠলো, চারপাশের গা ঘিনঘিনে পরিবেশ, নোংরা আবর্জনায় ভরা করিডোর, বালু-কাঁদাময় ওয়েটিং রুম, যাত্রীর চেয়ে দালালের অধিক পরিমাণ দেখে। আর সেই সাথে তো রয়েছেই যার কাছ থেকে যেভাবে পারে টাকা খসিয়ে নেবার নানা রকম ছল চাতুরী। বাটপার আর ঘুষ খোরের একটা আখড়া হল বুড়িমারি বন্দর। একে, একে আসা যাক সবগুলো বর্ণনায়।

যেখানে গাড়ি আপনাকে নামিয়ে দেবে সেখান থেকেই আপনাকে পাড়ি দিতে হবে ধুলোর সাগর, ভাঙা এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা, ড্রেনের দুর্গন্ধ, দালালদের সব রকম কুরুচিপূর্ণ গালাগালি, ব্যাগ-পত্র নিয়ে টানাটানিসহ আরও নানা রকম বিড়ম্বনা।

ড্রেনের দুর্গন্ধড্রেনের দুর্গন্ধ

ইমিগ্রেশনে ঢুকতেই আপনি নিজে করুন আর যেই ফরম পুরণ করুন পাসপোর্ট প্রতি ৩০০-৫০০ টাকা চার্জ ধার্য করে বসে থাকবে, সেটা আপনি কত কমাতে পারবেন আপনার দক্ষতার ব্যাপার। আর আপনার পাসপোর্টে যদি থাকে অন্য কোন পোর্টের ভিসা, তবে তো ওরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল অবস্থা! তখন পাসপোর্ট প্রতি ১০০০ টাকা! যেন মগের মুল্লুক। টাকা মগের মুল্লুক! বা মামা বাড়ির আবদার! সেটা চাইছে।

সারা রাত বা অনেকটা ধকল গেছে ইমিগ্রেশনে পৌছাতে, একটু বাথরুমে যাবেন, ফ্রেস হতে বা হালকা হতে? পারবেন না, বরং বাথরুমের অবস্থা দেখে আপনার সকল ইচ্ছা নিমিষেই উধাও হয়ে যাবে, আপনি বুঝতেই পারবেননা! বাথরুমের ভিতরে নয়, বাইরের অবস্থা দেখেই আপনি পেটের সবকিছু উগলে দেবেন পারলে। এমন অবস্থা যে, সেখানে আপনি আপনার বাসার কুকুর কেও পাঠাতে চাইবেন না। নিজের যাওয়াতো অনেক দূরের কথা।

বাথরুমের অবস্থাবাথরুমের অবস্থা

এরপর আসুন ইমিগ্রেশন যেসব মানুষরুপী ঘুষখোর বসে আছে তাদের কথায়। এরা যেন এক একজন পুলিশের ডিআইজির ক্ষমতা নিয়ে বসে আছেন। আপনার সাথে টাকা পয়সা নিয়ে রফা হয়ে গেছে তো আপনার সাথে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু যার সাথে হয়নি, তাকে বা তাদেরকে বলবে এই আপনারা ১০ মিনিট পরে আসেন। বেশ অবাক লাগবে শুনে, আর জাগবে কৌতূহল, যে এই পিক আওয়ারে ১০ মিনিটের জন্য সবাইকে বাইরে কেন পাঠিয়ে দেবে ভেবে?

এই সময় তারা আগের পাসপোর্টধারী, যারা টাকা দিয়ে সিল লাগিয়ে চলে গেছে, তাদের টাকাটা নগদের উপরে ভাগাভাগি করে নেয়। নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ার হয়ে গেলে তারপর আপনাকে ডাকবে, ওদের ইচ্ছামত না হলেও কমে যা পায় তা নিয়েই কাজ করে সিল লাগাবার জন্য।

বাথরুমের অবস্থাবাথরুমের অবস্থা

তবে হ্যা আপনি যদি খুবই দাপট দেখাতে পারেন, তবে আপনার কাছে কিছু চাইলেও, আপনি আপনার ভোকাল দেখাতে পারলে ছাড় পেলেও, পেতে পারেন। তারপর, আবারো ধুলোর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপনাকে পৌছাতে হবে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় সীমান্তে। আর এই সীমান্তে আসতেই আপনি পাবেন একদম ভিন্ন রকম একটা ফ্লেভার।

আমাদের সীমান্তে ওপারে ইমিগ্রেশনের যেমন আধুনিক বিল্ডিং আছে, সেটা ওদের নেই। ওদের শুধু মাত্র বেড়ার বা চাটাইয়ের ঘর বলা যেতে পারে। তবে পরিস্কার, ঝকঝকে, দালালের দৌড়-ঝাঁপ আছে তবে, কাড়াকাড়ি করবেনা আপনাকে নিয়ে। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেবে, কোন ঝামেলা আর লাইনে দাড়িয়ে কাজ করতে না চাইলে ১০০ টাকা দেবেন, সব করে দেব আর নিজে নিজে করতে চাইলে কোন টাকা লাগবেনা। হ্যাঁ সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?

আপনি নিজে কষ্ট করে, লাইনে না দাড়িয়ে অন্যকে দিয়ে কাজ করাবেন, সেটা তো বিনে পয়সায় হতে পারেনা, কে আপনাকে ফ্রি কাজ করে দেবে? ১০০ টাকা চাইতেই পারে। আপনাকে কষ্ট থেকে বিরত রাখার বিনিময়ে। আপনি কোন একটা গাছের ছায়ায়, চায়ের দোকানে বা মানি এক্সচেঞ্জের ঘরে বসে থাকবেন ওরা সবকাজ করে আপনাকে ডেকে নিয়ে যাবে সই আর ছবির জন্য।

ওদের কোথাও পাকা কোন ঘর বা আধুনিক কোন বিল্ডিং নেই, পুরো এলাকাটাই ছোট ছোট খুপরি ঘরের মত, তবে গাছের ছায়া আছে, ধুলোর সাগর নেই, ভাঙা-চোরা আর এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা নেই, জোচ্চুরি করে আপনার কাছ থেকে যা খুশি তা বাগিয়ে নেবার মানসিকতা নেই। হয়তো আছে কারো, কারো, তবে সংখ্যায় কম আর আমার চোখে পরেনি। সবচেয়ে বড় কথা পয়সার বিনিময় সাহায্য করার মানসিকতা আছে, আপানকে অযথা হয়রানি করার ইচ্ছা নেই।

এখন অনেকে আমার এই, নিজ দেশের এসব অবস্থা নিয়ে নেতিবাচক লেখা পড়ে বলতে পারেন, ভাই আপনি কি ওপারের দালালি শুরু করলেন নাকি? 
আমি বলি কি, যারা গিয়েছেন এই পোর্ট দিয়ে তাদের কাছে দুই পারের অবস্থা জিজ্ঞাসা করেই দেখুন না? আর যারা যাননি এই পোর্ট দিয়ে, তারা না হয় একবার গিয়ে দেখে আসুন। যদি ভিসা থেকে থাকে যে কোন পোর্টের। এই পোর্ট সবার জন্যই উন্মুক্ত। যদিও এখনো অফিসিয়াল ঘোষণা আসেনি, তবে অনানুষ্ঠানিক ভাবে হলেও ওরা যেতে দিচ্ছে সবাকেই। এটা নিয়ে আলাদা একটি গল্প লিখবো পরে।

এবার শেষ কথায় আসি। এই যে আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতের নানা যায়গায় যাচ্ছি, প্রত্যেকের কাছ থেকে সরকার কমপক্ষে ৫০০ টাকা করে রাখছে ভ্রমণ কর হিসেবে। আমার প্রশ্ন হল, এই টাকাটা কিসের জন্য রাখছে?

নিশ্চয়ই বন্দরের উন্নতি, যাত্রীদের সেবা, ভালো মানের অবকাঠামো আর ভালো একটা কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনার জন্য, তাই নয় কি? আমার সাধারণ ভাবনায় তো ভ্রমণ কর নেবার অর্থ সেটাই হওয়া উচিৎ বলে মনে হচ্ছে। আর তাই যদি হয়...

তবে আমাদের বন্দরের রাস্তা-ঘাট, ড্রেন, বাথরুম, অপেক্ষাগার (ওয়েটিং রুম), করিডোর, ইমিগ্রেশনে যারা কাজ করেন, তারা সবাই আর চারপাশের সবকিছু এতো নান্দনিক কেন?

আমাদের ইমিগ্রেশন ও এর চারপাশ কতটা নান্দনিক, নিচের ছবিটাই তার প্রমান!

দেখুন, আমাদের বন্দরের নান্দনিকতা...!!!

আমি নিজে বা আমার সাথে থাকা কেউ কখনো নিজের ব্যাগে ছাড়া রাস্তায় বা কোন যায়গায় মলা-আবর্জনা ফেলিনা। সব সময় চেষ্টা করি যেন শুধু কোন ভ্রমণের যায়গা নয় যে কোন যায়গাই পরিচ্ছন্ন রাখতে। আপনারাও সহযোগিতা করুন। পরিবেশ সুন্দর রাখুন।

ধন্যবাদ ।