ট্রয় নগরী দর্শন করে charsi অর্থাৎ বাজারে টুকটাক কেনাকাটা সেরে পাউরুটি, মাছ ভাজি ও লতাপাতার সালাদ খেয়ে হোটেলে আসলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য। হোটেলের নাম ANZAC। এখানে ANZAC নামে কয়েকটি হোটেল আছে। তাই ANZAC নামের জনপ্রিয়তার কারণ জানতে গিয়ে এক বিরাট ইতিহাস জেনে ফেললাম যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ। ANZAC মানে Australian Newzealand Army Corps. এখনও পৃথিবীর অনেক দেশে প্রতিবছর ২৫ শে এপ্রিল Anzac Day পালন করা হয়। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এটি জাতীয় দিবস হিসাবে প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে। ইতিহাসটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১০০ বছর আগে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন তুরস্ক অর্থাৎ সে সময়ের অটোম্যান সাম্রাজ্য কে এক প্রকার অনিচ্ছা সত্বেও যোগদান করতে হয় জার্মানির পক্ষে।

২৬৭ কেজি ওজনের গোলা বহনরত সৈনিকের ভাস্কর্য২৬৭ কেজি ওজনের গোলা বহনরত সৈনিকের ভাস্কর্য

অার মিত্রবাহিনী রাশিয়াকে সাহায্য করার জন্য এবং সে সময়ের তুরস্কের রাজধানী ইস্তানবুল দখল করতে দার্দানেলিস প্রনালী দিয়ে অসংখ্য রণতরী নিয়ে আসলে তুরস্কের সাথে বাঁধে এক ভয়াবহ সংঘর্ষ । আর এই যুদ্ধ ১৯১৫ সালের ২৫ শে এপ্রিল শুরু হয়ে চলে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত। ৮ মাস ২ সপ্তাহ ব্যাপী এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রায় ৫ লক্ষ ৫ হাজার সৈন্য নিহত ও ২ লক্ষ ৬২ হাজার জন আহত হয়। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অনেক সৈন্য নিহত হয়। যাহোক ইতিহাস বাদ দিয়ে আমরা একটু ঘুরতে যাই।

পরিখা। এখান থেকে যুদ্ধ করতোপরিখা। এখান থেকে যুদ্ধ করতো

আমাদের এখনকার ডেস্টিনেশন হলো Naval মিউজিয়াম। দার্দানেলিসের ধারে সেই মিউজিয়ামে গিয়ে দেখি আবারো সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আসলে এখানকার সব কিছুই কোনো না কোনো ভাবে যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। এখানে প্রজেক্টরের মাধ্যমে সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মিত্রশক্তি কিভাবে আক্রমণ করেছিল ও তুরস্ক কিভাবে সাগরে মাইন পুতে তা প্রতিরোধ করেছিল সেটা পর্যবেক্ষণ করলাম যে জাহাজে করে মাইন পুতে ছিল তার একটি রেপ্লিকা জাহাজে।

একটি রেপ্লিকা জাহাজএকটি রেপ্লিকা জাহাজ

এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কামান, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেখে castle বা দূর্গ দেখতে ঢুকলাম। এখানে ঢুকে বুঝতে পারলাম এই যুদ্ধের ভয়াবহতা। এখানে এত বেশী গুলি বর্ষিত হয়েছে যে একটা গুলির মধ্যে আরেকটা গুলি ঢুকে গেছে যা না কি বিশ্বে একমাত্র। আর এখানে প্রতি বর্গমিটারে গুলি বর্ষিত হয়েছে ৬০০০। এই যুদ্ধের উপর Gallipoli, The Water Diviner, Gelibolu, All tthe King's Men সহ অনেক মুভিও তৈরী হয়েছে।

দূর্গ ও যুদ্ধে ব্যবহৃত কামানদূর্গ ও যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান

যা হোক Naval মিউজিয়াম দেখে যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশী ছোট ভাই সাদিকের মেসে গিয়ে আলু ভর্তা দিয়ে ভরপেট খেয়ে হোটেলে এসে দিলাম ঘুম। সকালে উঠে নাস্তা সেরে রওনা দিলাম তুরস্কের ইউরোপীয় অংশ গ্যালিপ্পলির উদ্দেশ্যে ট্রাভেল এজেন্সীর বাসে করে। এখন এখানে অফ সিজন তাই ট্যুরিস্ট কম। আমাদের গ্রুপের সবাই তার্কিশ। শুধু আমি ও সাদিক বাংলাদেশের। আমরা Foreigner হওয়ায় তার্কিশ লোকজন ও গাইডের কাছ থেকে একটু বাড়তি খাতিরও পেলাম। গাইড একজন রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক। ফলে উনি বেশ সুন্দরভাবেই বর্ননা করছিলেন।

দার্দানেলিস প্রণালীদার্দানেলিস প্রণালী

যাহোক এখন কাজের কথায় আসি। দার্দানেলিস প্রণালী পার হওয়ার জন্য জাহাজে ওঠা মাত্রই অসংখ্য গাংচিল আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এতটুকুও দেরী করলো না। সে এক অন্যরকম অনুভুতি। নীল আকাশে সাদা গাংচিল, দুদিকে সবুজ পাহাড় আর নীল জলরাশি দেখে চোখের পলক ফেলতেও ইচ্ছে করছে না।

সবার উপরে Black sea, মাঝখানে মর্মর সাগর ও সবার নীচে এজিয়ান সাগর। মর্মর ও এজিয়েন সাগর সংযোগকারী সরু টানেলটায় দার্দানেলিস প্রণালী।সবার উপরে Black sea, মাঝখানে মর্মর সাগর ও সবার নীচে এজিয়ান সাগর। মর্মর ও এজিয়েন সাগর সংযোগকারী সরু টানেলটায় দার্দানেলিস প্রণালী।

দার্দানেলিস ও গ্যালিপ্পলি পেনিনসুলা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়- ৬১ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্য ও ১.২ - ৬.৪ কিঃমিঃ প্রস্থের দার্দানেলিস প্রণালী এজিয়েন সাগরকে মর্মর সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশকে পৃথক করেছে। আর একারণেই এই এলাকাটি সামরিক ও অর্থনৈতিক ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ন। রাশিয়া, ইউক্রেন, রোমানিয়া সহ ককেশাস অঞ্চলের অনেক দেশের বহিঃবিশ্বের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ এটি। তাই সংগত কারনেই সকলের দৃষ্টি এই প্রণালীর দিকে।

এজিয়ান সাগরএজিয়ান সাগর

গ্যালিপ্পলি পেনিনসুলা বা গ্যালিপ্পলি উপদ্বীপ যাকে তার্কিরা বলে গেলিবলু। এটি দার্দানেলিসের পশ্চিম পাশে এজিয়েন সাগরের একটি পেনিনসুলা বা উপদ্বীপ। তুরস্কের ইউরোপীয়ান অংশ থেকে এজিয়েন সাগরের মধ্যে লম্বাকৃতির এক খন্ড পাহাড়ী ভুমি উত্তর থেকে দক্ষিন দিকে স্ফীত হয়ে সাগরকে সরু করেছে। আর এই সরু অংশটার নামই হলো দার্দানেলিস।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মুরাল চিত্রপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের মুরাল চিত্র

যাহোক দার্দানেলিস ও তার আশে পাশের নয়াভিরাম দৃশ্য অবলোকন করতে করতে আমরা ইউরোপের মধ্যে প্রবেশ করলাম। প্রথমেই কিলিতবাহির দূর্গ যা ১৪৫২ সালে অটোমান সম্রাট সুলতান মেহমেত-২ এর সময় তৈরী। এই দূর্গ থেকেই তুরস্কের সৈনিকেরা মিত্র শক্তির উপর প্রধানত আক্রমণ করেছিল। এখানকার অস্ত্রাগার গুলো দেখে খুবই ভাল লাগলো। দুর থেকে দেখলে পাহাড়ের মত লাগে। আসলে শত্রুপক্ষকে ফাঁকি দেবার জন্যই এভাবে তৈরী করা হয়েছে।

এখান থেকে কামানে করে গোলা ছোড়া হতএখান থেকে কামানে করে গোলা ছোড়া হত

এখানে একটা সত্যি ঘটনা না বললেই নয়। শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে অস্ত্রাগার থেকে কামানে গোলা নিয়ে আসার লাইনটা নষ্ট হওয়াতে কামানে লোড দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন একজন সৈনিক ২৬৭ কেজি ওজনের এক একটি কামানের গোলা একাই পিঠে করে নিয়ে এসে কামানে লোড করেছিল। যেটা এখনও সবার কাছে চিরবিস্ময় ও চিরস্মরণীয়। এখানে অনেক জায়গাতেই তার এই পিঠে করে গোলা নিয়ে যাবার ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে। পরিবর্তিতে তার কাছে জানতে চাইলে সে বলে তখন কিভাবে এটা করেছি আমি বলতে পারবো না। তবে আবার যদি যুদ্ধ লাগে তখন হয়তো পারবো। তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলে সে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। এটাই আসলে সত্যিকারের ত্যাগ ও দেশপ্রেম।

অস্ত্রাগারঅস্ত্রাগার

এই দূর্গ দেখে আমরা চললাম দক্ষিন দিকে গ্যালিপ্পলি উপদ্বীপের শেষ মাথায় যেখানে তুরস্ক ও অন্যান্য অনেক দেশের সৈন্যদর সমাধি ও তাঁদের স্মরনে Canakkale Martyr's Memorial নামে একটি স্মৃতি সৌধও আছে। এই পথটা সেই পথ যেখান দিয়ে যাবার সময় প্রতিটা বাংগালীর গাইতে ইচ্ছা করবে " এই পথ যদি না শেষ হয়'"। একদিকে সাগর, অন্যদিকে পাহাড়। আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সর্পিল পাহাড়ী পথ। স্মৃতিসৌধ ও সমাধি দেখলাম। আর শুনলাম যুদ্ধের অনেক গল্প। অসাধারণ জায়গা। আর অসাধারণ এখানকার বাতাসের গতিবেগ। ঠিকমত দাড়ায়ে থাকা যাচ্ছে না। এমনকি ছবিও তুলতে হলো অনেক কস্ট করে। মনে হচ্ছে এটি যেন বাতাসের শহর। এসব দেখে পাশের আর একটি মিউজিয়াম ঘুরে গমের ভাত ও ভেড়ার মাংসের কাবাব খেয়ে রওনা দিলাম। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সৈন্যদর উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধ ও তাঁদের সমাধি দেখতে। বাস চলুক। আমরা এই সুযোগে যুদ্ধের আরো কিছু গল্প শুনি।
এখানে এতটায় সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল যে কোনো কোনো জায়গায় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক গজ। রাস্তার এপার আর ওপার।

তখন অজ্ঞান ও অবস করার ভাল ব্যবস্হা না থাকায় সৈন্যরা কাপড় পেচানো কাঠের টুকরো কামড় দিয়ে থাকতো শরীর থেকে গুলি বাহির করার সময়। আর গুলি বাহির করার পর দেখা যেত কাঠের টুকরোর সাথে দাঁতও উঠে এসেছে।
এ যুদ্ধের সময় প্রায় ২৫০০০ সৈন্য মারা যায় ভিটামিন সি এর অভাবে স্ক্যর্ভি রোগে। 

পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে শরীরে এক ধরনের পোকা হয়েও অনেক লোক নিহত হয়। আর সৈন্যদের কাপড়ে উকুন জাতীয় সুলসুলি হয়েছিল। তাই তারা জামা কাপড় পিঁপড়ার গর্তে রাখতো। পিঁপড়া সুলসুলি খেয়ে ফেললে সৈন্যরা সেগুলো ব্যবহার করতো। যাহোক এরকম অনেক গল্প আছে যা বলতে গেলে লেখা শুধু বড়ই হবে। অাপনাদের যেমন পড়তে কষ্ট হবে, আমার তেমন লিখতে কস্ট হবে। শেষ পর্যন্ত Turkish War Memorial Cemetery দেখে আমরা চলে আসলাম সেই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিসৌধে।

Turkish War Memorial CemeteryTurkish War Memorial Cemetery

এখানে ইতিহাসটা একটু না বললেই নয়। এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পক্ষে অনেক দেশ যুদ্ধ করতে আসে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে অনেকেই। যার মধ্যে আমাদের জাতীয় কবিও আছেন। এখানে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি অনেক ভারতীয় সৈন্যরাও চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। এই স্মৃতিসৌধে প্রতিবছর ২৫ শে এপ্রিল বিশ্ব নেতৃবৃন্দ আসেন শ্রদ্ধা জানাতে।

২০১৫ সালে গ্যালিপ্পলি যুদ্ধের শতবর্ষ পূর্তিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস ও হ্যারী সহ অনেক নেতৃবৃন্দ এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। আসলে এই যুদ্ধটা এক অর্থে আধুনিক তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল। এই যুদ্ধে তুরস্কের স্কুল কলেজের অসংখ্য ছাত্রও অংশগ্রহন করে। তুরস্ক সবগুলো সেক্টরে পরাজিত হলেও এখানে তারা মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় শুধুমাত্র দেশপ্রেম, নৈতিক মনোবল ও একজন দূরদর্শী কমান্ডার মোস্তফা কামালের দিক নির্দেশনার কারনে। নতুবা আজকের তুরস্কের ইতিহাসটা অন্যরকম হতো। আর এ যুদ্ধের ফলাফল শুধু তুরস্কে নয় সারা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছে। আর এ যুদ্ধের মাধ্যমে একজন সৈনিক কামাল পাশা কামাল আতার্তুক ( জাতির পিতা) হয়ে ওঠেন। গ্যালিপ্পলির এই জায়গাটা সবচেয়ে উঁচু। এখান থেকে দার্দানেলিস প্রনালী ও এজিয়েন সাগর দুটোই দেখা যায়। আর তাই মোস্তফা কামাল পাশা এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিলেন তার ঘাটি হিসাবে। এখান থেকে তিনি বাইনোকুলারের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্নয় করে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন।