কলকাতা থেকে সিমলা-মানালি হয়ে লেহ এর মত বিশাল লম্বা একটা জার্নি করতে, কেন শুরুর জার্নিটাই কালকা মেইলের মত একটা ক্লাসলেস ট্রেনে শুরু করছি? জার্নি শুরুর আগে এবং পরে অনেকেই এই প্রশ্নটা তুলেছেন। তাদের জন্য আর আগামীতে যারা ভারত ভ্রমণে এই ট্রেনে চড়বেন কি চড়বেন না? চড়লে কি পাবেন বা পাবেন না, কালকা মেইলের এই গল্পটা তাদের জন্য।

যদি কেউ বিশাল ভারতবর্ষ উপভোগ করতে চান, উপভোগ করতে চান একই সাথে একাধিক প্রদেশের মানুষ, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, দেখতে চান তাদের জীবন যাপন, কার্যকলাপ তবে তাদের জন্য কালকা মেইলে কলকাতা থেকে কালকা যাওয়াটা হতে পারে একটা আদর্শ ভ্রমণ ও একই সাথে এইসব উপভোগের সবচেয়ে ভালো উপায়। অন্তত আমার মতে।

কালকা মেইলেকালকা মেইলে

কালকা মেইলে কলকাতা থেকে কালকা যেতে আপনাকে ভ্রমণ করতে হবে অন্তত ৩২ ঘণ্টা! পাড়ি দিতে হবে বাংলা, বিহার, উত্তর প্রদেশ, দিল্লী, হরিয়ানা, পাঞ্জাবের মত বড় বড় সব প্রদেশের ছোট বড় হাজারো শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ ও নদী নালা। ট্রেন থামবে একেক সময় একেক প্রদেশের সেইসব ছোট-বড় শহর, গ্রাম বা বন্দরের কোন না কোন স্টেশনে। সেই একেক প্রদেশের, একেক শহরের, গ্রামের এক একটি স্টেশন থেকে উঠবে নানা রকমের, ভাষার, সংস্কৃতির, আচার-আচরণের, ধর্মের, বর্ণের, মতের নানা রকম নারী-পুরুষ ও শিশু। যাদের ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, রুচি, আচার-আচরন, খাদ্যাভ্যাস একদম আলাদা। কারো সাথে কারো কোন কিছুর এততুকু মিল নেই। তবুও তারা সবাই চলেছে কোন না কোন গন্ত্যব্যে, নিজেদের জীবন, জীবিকা বা নিতান্ত প্রয়োজনে। অথবা হয়তো আপনার মত নিতে নিখাদ ভ্রমণ আনন্দ।

তবে হ্যাঁ কালকা মেইলের এই অন্য রকম ভ্রমণ আর নানা রকম ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাদ পেতে চাইলে আপনাকে কাটতে হবে ৬৮০ রুপীর নন এসি স্লিপার শ্রেনীর টিকেট। ভ্রমণে থাকতে হবে ভিন্ন রকম এক প্যাশন। কারন ৩২ ঘণ্টার জার্নি হলেও যে কোন কারণে, যে কোন যায়গায় আপনার ট্রেন দাঁড়িয়ে পরতে পারে অনন্ত সময়ের জন্য, কারণে বা অকারণে! হ্যাঁ এটাই কালকা মেইলের বৈশিষ্ট্য! এতে করে আপনি বাড়তি একটা লাভ করতে পারেন, মানসিকতা ধরে রেখে উপভোগের উপযোগী করে নিজের মনকে ঠিক করতে পারলে।

কালকা মেইলেকালকা মেইলে

পেতে পারেন একেক স্টেশনের একেক রকম খাবারের স্বাদ, মিশতে পারবেন ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সাথে অল্প সময়ের জন্য হলেও। এক এক জায়গায় পাবেন এক এক রকম আচার-ব্যবহার। কোথাও পাবেন ভাত, কোথাও রুটি, কোথাও ভাত আর রুটির সাথে সবজি মিলিয়ে থালি। কোথাও পুরি আর আলুর দম, চাটনি, কোথাও নিতান্ত কম দামে সুস্বাদু নানা রকম ফল ইত্যাদি।  

সাধারণত দুই রাত আর এক দিনের কালকা মেইলের এই ভ্রমণে আপনি চাইলে বাইরের কোন খাবার না খেয়ে ট্রেনের মধ্যে বসেই ফরমায়েস করতে পারেন সরবরাহে থাকা খাবারের মধ্যে থেকে আপনার চাহিদা মত। সকালে চায়ের সাথে বিস্কিট ২০ রুপী। সকালের নাস্তায় পাবেন রুটি-সবজি ৪০ রুপী, ব্রেড-ডিমের ওমলেট ৪০ রুপী, বাড়তি চা ১৫ রুপী, কফি ২০ রুপী।

দুপুরের খাবারে পাবেন ভাত-রুটি-সবজি ১২০ রুপী। ভাত-রুটি-ডিম ১২০ রুপী বা ভাত-রুটি-চিকেন ১৫০ রুপী করে। রাতের মেনুতে পাবেন চিকেন বা ভেজ বিরিয়ানি ১৪০-১৬০ রুপী বা ভাতের সাথে দুপুরের মত মেন্যু দাম একই রকম। যখন খুশি তখনই চা বা কফি পাবেন ১৫-২০ রুপীতে। অথচ বাইরের স্টেশন গুলো থেকে খাবার কিনে খেলে এক বেলার টাকা দিয়েই চালিয়ে নিতে পারবেন পুরো একদিন অনায়াসে।

৩২ ঘণ্টার এই জার্নি কখনো কখনো হয়তো খুব বিরক্তিকর মনে হতে পারে যদি ঠিকঠাক ঘুম না হয়। তাই আমার পরামর্শ হল দিনে না ঘুমিয়ে পুরো ভারত বর্ষের নানা প্রান্তের রূপ-রস-গন্ধ-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি উপভোগ করুন তাড়িয়ে তাড়িয়ে। আর রাতে দিন একটা টানা ঘুম নিজের আরামদায়ক স্লিপারে সটান করে ঘুমিয়ে। যেখানে বাইরের হুহু হাওয়া আপনাকে দেবে ঘুমের দারুণ আরাম আর উপলক্ষ।

তো দেবেন নাকি এমন একটা লম্বা জার্নি ৩২ ঘণ্টার, দুই রাত আর এক দিনের,কলকাতা থেকে কালকা যেতে। স্বনামে ধন্য কালকা মেইলে?

আমি তো দারুণ উপভোগ করেছি, চাইলে আর ভ্রমণে প্যাশনের পাশাপাশি এমন বৈচিত্র পেতে আপনিও চেস্টা করে দেখতে পারেন কালকা মেইলের এই অন্য রকম যাত্রা একবার।