আচ্ছা শীত কি মানুষকে কিছুটা স্মৃতি কাতর করে তোলে? একটু সুখ-সুখ অনুভুতির ভিতরে রাখে কি কিছুটা? বোধয়! নইলে কয়েক দিন থেকেই, এই শীত-শীত আবেশটা, শীতের বাতাস ছুঁয়ে যাওয়াটা, আর শীতের একটা গন্ধ নাকে এসে লাগতেই স্মৃতি কাতর হয়ে পরছি যেন! কেন যেন আমার টানহীন গ্রামটার কথা মনে পরছে আজকাল। ঠিক শীতের কুয়াশা ভেদ করে, এক চিলতে নরম রোদের পরশের মত, সকালের শিশিরে ভিজে, জানালার গ্রিলে আর কার্নিশে জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ মুছে যাওয়ার মত করে কিছুটা। পুরনো কিছু সুখ স্মৃতি যেন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সকালের আদুরে রোদের মত করে!    

অনেক দিন ঢাকা শহরে তেমন শীত আসেনা। তাই শীতটাকে ঠিকঠাক উপভোগ করাও হয়ে ওঠেনা বেশ কয়েক বছর হল। এবার একটু বৃষ্টি, কিছুটা ঝড়ো হাওয়া, দুই একদিনের নিম্নচাপের কারনে বোধয় শীত-শীত ভাবটা চলে এসেছে, উষ্ণ ঢাকা শহরেও। তাই স্মৃতিরাও শিশিরে ভিজে, উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে উষ্ণ রোদের পরশ পেয়ে।  
আমাদের ছোট বেলায় গ্রামের শীত গুলো ছিল সত্যিকারের শীত। শেষ বিকেল থেকেই শীত জড়িয়ে ধরতো আমাদের।

সন্ধ্যা নামতে না নামতেই কোন মতে একটু খেয়েই লেপ বা কাঁথার ভিতরে ডুবে যেতাম সবাই। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে তেমন কেউই বের হতনা। যে কারণে শীতের রাত গুলো ভীষণ লম্বা হত, ভীষণ লম্বা! রাত যেন পোহাতেই চাইতোনা। আর তাছাড়া শীতে গরীব দুঃখীদের রাত একটু কেন, বেশ দেরি করেই পোহাত! আমাদেরও তাই ছিল। রাত যেন নয়, সেসব একটা একটা বছরের মত লাগতো মাঝে মাঝে! 

যখন কিছুটা বড় হলাম। কিছুটা স্বাধীনতা পেলাম একা একা ঘোরার বা বাইরে বের হবার, তখন থেকে শীতের রাত গুলো কিছুটা ছোট হতে থাকলো যেন! একটু দেরি করে ঘরে ফেরা, বন্ধু বা গ্রামের অন্যদের সাথে একটু আড্ডা, বা ক্লাবে টিভি দেখে ফেরার কারণে। আর সেই সময়েই নিজেদের মধ্যে কিছু নিখাদ আনন্দের ঘটনা ঘটতো বা কয়েকজন মিলে ঘটাতাম মাঝে মাঝেই। এবং সেটা অবশ্যই শীতের রাতে। 

dtbangla.comdtbangla.com

শীতে প্রায় সব গ্রামেই কম বেশী খেজুরের রস পাওয়া যায়। গাছি সন্ধায় গাছ চিলতে-চিলতে করে কেটে, মাটির হাড়ি বা ছোট কলসি ঝুলিয়ে যেত, দড়ি দিয়ে বেঁধে। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস পরে, শেষ রাতে বা একদম প্রত্যুষে সেই হাড়ি বা কলসি ভরে রসে টইটুম্বুর হয়ে যেত। সকাল বেলা সেই রস কেনাবেচা হয়ে এক-এক বাড়িতে, এক-এক রকম আয়োজন শুরু হয়ে যেত।

somewhere in... blogsomewhere in... blog

কেউ হয়তো রাতভর চিতোই পিঠার গুড়ো তৈরি করে রেখেছে, সকালে রস এলে, রসকে কাঠের চুলায় ফুটতে দিয়ে, গরম গরম পিঠে ভেজে রসে ডুবিয়ে রেখে খেতে দেবে, সকালের নরম রোদের মাঝে, মাটির উঠোনে পাটি বিছিয়ে। কেউ হয়তো ফুটন্ত রসের হাড়িতে চাল ধুয়ে দিত কয়েক কাপ, রসের ক্ষীর বা শিরনি রান্নার জন্য। সেটা পুরোপুরি হয়ে ওঠার আগেই কেউ কেউ আধফোঁটা অবস্থাতেই হামলা চালাতো, গরম চুলার পাশে পিড়ি পেতেই। সেটা নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে নানা রকম মারামারি আর ঝগড়াঝাতি লেগে যেত। কেউ কেউ, কাঁচা রসেই দারুণ মজা পেত। আবার কেউ হয়তো একটু গরম রসে মুড়ি বা আটার রুটি ভিজিয়ে খেত।

amartipssite.wordpress.comamartipssite.wordpress.com

তবে আমাদের মত কিছু ছেলেদের এতো আনুষ্ঠানিক আয়োজন তেমন একটা ভালো লাগতোনা। শীতের সময়ে আমাদের একটি অন্যতম আনন্দ ছিল গভীর রাতে রস চুরি করে, দূরের কোন মাঠে, ধানের শুকনো খড়ে আগুন জ্বালিয়ে, কারো বাড়ি থেকে একটা হাড়ি আর কারো বাড়ি থেকে কিছু চাল চুরি করে এনে নিজেদের মত করে রসে চাল ফুটিয়ে খাওয়া! কারণ পুরো ক্ষীর বা শিরনি হবার সময় আমরা দিতামনা! মোটামুটি চাল ফুটতে শুরু করতেই ঝাঁপিয়ে পড়তাম সবাই মিলে! সে এক ভীষণ রোমাঞ্চ আর দারুণ উত্তেজনার ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে। 

একবার এমনই এক দারুণ হীম শীতল রাতে, আমাদের ইচ্ছা হল আজকে রস চুরি করে চাল ফুটিয়ে খেতে হবে। ভাবতে দেরি আছে, কিন্তু কাজ ভাগাভাগি করতে আর দেরি নেই। এক একজনের কাঁধে, এক এক রকমের দায়িত্ব দেয়া হল। কেউ তার ঘর থেকে চাল চুরি করবে, কেউ একটা হাড়ি নিয়ে আসবে, কেউ ইট দিয়ে চুলা বানাবে আর কেউ শুকনো কাঠ আর কুটা জোগাড় করে আগুন জ্বালাবে। আর একজন বা দুজন, যারা গাছে উঠতে একটু বেশী পারদর্শী তারা কারো না কারো গাছ থেকে রসের কলসি নামাবে!

এটাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই এই কাজে সবাই কম বেশী সহযোগিতা করবে। কারণ ধরা পরলে শীতের  রাতে পিটোনি আসল আর বাপ-মাকে গালাগাল খাওয়ানো সুদ হিসেবে থাকবে! আর হ্যাঁ উপরি লোণ হিসেবে থাকবে ভবিষ্যতের জন্য লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর ভৎষনা! যে কারণে সবাই সাবধান আর ভীষণ ভীতু ভাবে প্রায় সব কাজ গুছিয়ে নিয়েছি। বাকি শুধু আসল কাজটা, গাছে উঠে, শব্দ না করে, রসের কলসি নিয়ে রস ঢেলে, সেই কলসিকে আবার গাছের মাথায় ঝুলিয়ে রেখে আসা! উহ ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ আর রোমাঞ্চকর কাজ এটা। 

তো কাদের গাছে ওঠা যায়, এটা নিয়ে ভাবতে বসে, মোটামুটি সহজ, ছোট আর কম ঝুঁকিপূর্ণ একটা গাছ বেছে নেয়া হল, যেটা আবার আমাদেরই এক চাচার ঘরের সাথে প্রায় লাগোয়া! তো সেই সময়ের কখনো বন্ধু, কখনো শত্রু! আমার সম বয়সী এক চাচা গাছে ওঠার দায়িত্ব নিল। সে গাছ থেকে রসের কলসি নামাবে। কিন্তু অন্য আর একজন রসের কলসি আবার গাছে ঝুলিয়ে রেখে আসবে, সেই শর্তে। তো শুরু হল গাছ থেকে রসের কলসি নামানোর আসল অভিযান।

কোন মতে শব্দ ছাড়াই সে ঝুলে থাকা কলসি নিজের হাতে নিতে পেরেছে। ধীরে ধীরে নামছে, কিন্তু একটা সময় অসমান খেজুর গাছের সাথে টুংটাং শব্দ হতে শুরু করলো! যেটা বন্ধ করা বা শব্দ ছাড়া নামিয়ে আনা তার সাধ্যের বাইরে চলে গেল! আর অনবরত গাছের সাথে হাড়ির সেই শব্দে এক সময় পাশের ঘরের চাচার ঘুম ভাঙিয়ে দিল! তিনি জেগে উঠেই, কেউ তার গাছ থেকে রস নামাচ্ছে বুঝতে পেরেই হাক দিল...

কেড়া? রস নামায় কেড়া? গাছি নাকি? কারণ যার গাছ সে সাধারণত গাছ কাটেনা। অনেক গুলো গাছ একজন কাটে আর রস নামায়। যাকে গাছি বলা হয়ে থাকে।

তো যিনি গাছে উঠেছেন, তিনি বেশ নার্ভাস হয়ে বলে বসলেন মেবাই মুই! 
(বড়ভাই আমি!)...

তার পরামর্শ ছিল, রস নামিয়ে, একটু পানি দিয়ে আবার যেন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় সেই কলসি! যেন সকালে গাছি কলসিতে রস কম দেখে মুক্ত মনে গালি দিয়ে, মা-বাপের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার না করতে পারে! কাছের আত্মীয় বা নিজের চাচা আর চাচাতো ভাই বলে বেঁচে গিয়েছিলাম সেবার। তবে সেই সব দিন গুলো কি যে ছিল বলে বোঝানোর মত নয়। সেই আনন্দ গুলো একেবারেই অন্য রকম, নিখাদ আর নির্ভেজাল।