সমগ্র ভুটান ২০ টি জেলায় (ভুটানি ভাষায় জংখা) বিভক্ত। প্রশাসনিকভাবে প্রতিটি জেলা পরিচালিত হয় জং (Dzong) থেকে। Dzong হচ্ছে জেলার প্রশাসনিক দপ্তর। আমাদের দেশের যেমন প্রতিটি জেলার জন্য জেলা প্রশাসকের দপ্তর থাকে অনেকটা তেমন। এই Dzong গুলো প্রতিটাই দেখার মত বস্তু। ভুটানে এসে যদি কেউ Dzong ঘুরে না দেখে তাহলে তার ভ্রমণই বৃথা। এইধরণের স্থাপনা কেবল ভুটান এবং তিব্বতেই দেখা যায়। তিব্বতের সংস্কৃতির সাথে ভুটানের সংস্কৃতির প্রচুর মিল আছে। বৌদ্ধ ধর্মের যেই ধারা ভুটানে প্রচলিত সেটি তিব্বত থেকেই এসেছে।

অন্যান্য প্রশাসনিক ভবনের সাথে Dzong গুলোর একটা বড় পার্থক্য আছে। Dzong গুলো আকারে বিশাল হয়ে থাকে। এর ভিতরে একইসাথে প্রশাসনিক অফিস, বিশাল উঠান (যেখানে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়), মন্দির এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নিবাস থাকে। প্রতিটি Dzong এর নির্মাণে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় মেনে চলা হয়। যেমন, বাইরের এবং ভেতরের দেয়ালে সাদা রঙ করা থাকবে। দেয়ালগুলো ইট এবং পাথর (যার সংখ্যা বেশি) দিয়ে তৈরি হতে হবে। জানালার সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম থাকবে। বহিঃদেয়ালের উপর দিকে গৈরিক বর্ণের ডোরা থাকবে। কাঠ এবং লোহার তৈরি প্রবেশদ্বারগুলো বিশালাকৃতির হবে এবং মন্দিরগুলো হবে বর্ণিল রঙে সজ্জিত যার ছাদে বিভিন্ন ধর্মীয় চিত্রকল্প আঁকা থাকবে।

আমাদের আজকের দিনের শেষ গন্তব্য এমনই এক Dzong এর উদ্দেশ্যে যেটি Thimpu Dzong অথবা Tashichho Dzong নামে পরিচিত। ভুটানের অন্যান্য Dzong এর সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে এটিতে স্বয়ং রাজা দাপ্তরিক কাজকর্ম সম্পাদন করে থাকেন। এছাড়া ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গও এখানে অফিস করেন। অনেকটা আমাদের দেশের সচিবালয়ের মত। তবে এটিকে সচিবালয় বলা যাবে না। কারণ মূল সচিবালয় ভুটানের পার্লামেন্ট ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাত্র ১ ঘণ্টার জন্য দর্শনার্থীগণ প্রবেশ করতে পারেন। সেটিও সরকারী অফিস শেষ হওয়ার পর। অর্থাৎ বিকেল সাড়ে ৫ টা থেকে সাড়ে ৬ টার মধ্যেই সব দেখে নিতে হয়।

পোস্টাল মিউজিয়াম থেকে Tashichho Dzong এ যেতে ১৫ মিনিটের মত সময় লাগে। পথেই ভুটানের পার্লামেন্ট ভবন দেখা যায়। ওয়াংচু নদীর একপাশে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ভবনটি থিম্পুর অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ। যদিও পার্লামেন্ট ভবনের ছবি তোলা নিষেধ তারপরেও আমরা বেশ কিছু ছবি তুলে ফেলেছিলাম। এমন সময় এক নিরাপত্তারক্ষী এসে অনুরোধ জানালেন আমরা যেন ছবিগুলো মোবাইল এবং ক্যামেরা থেকে মুছে ফেলি, কারণ এটি বেআইনী। নিরাপত্তারক্ষীর বিনয়ে মুগ্ধ হয়ে আমরা সবাই পার্লামেন্ট হাউজের ছবিগুলো মুছে ফেলেছি। তবে এই জায়গা থেকে থিম্পু শহরের সুন্দর একটা ক্যামেরা ভিউ পাওয়া যায়। নিরপত্তারক্ষীর অনুমতি নিয়েই শহরের কিছু ছবি তোলার সুযোগ হয়েছে।

পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে শেষ বিকেলের থিম্পু শহরপার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে শেষ বিকেলের থিম্পু শহর

 

Tashichho Dzong এর প্রাঙ্গণে পৌঁছে দেখি অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। এক ঘণ্টাই মাত্র সময় পাওয়া যায় বলে সকল দর্শনার্থী এই সময়েই ভিড় করেন। এখানে প্রবেশ করতেও ৩০০ গুলট্রাম লাগবে শুনে পিটারের চেহারা হল দেখার মত। বিড়বিড় করছে শুনলাম, “ফইন্নির দল। এন্ট্রি ফি দিয়াই তো ফতুর কইরা দিল।“ টাকা নিয়ে চেনচু গেল টিকেট করার জন্য। ফিরবার সময় দেখি একজন গাইড নিয়ে এসেছে। ব্যাপার হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকেই প্রতি ৫ কিংবা ৬ জন দর্শনার্থীর জন্য একজন করে গাইডের বন্দোবস্ত করা হয়। গাইড ছাড়া কেউই কোন Dzong এর ভিতরে একা প্রবেশ করতে পারবে না, দেখতে পারবে না এবং বেরও হতে পারবে না। জাতীয় সম্পত্তি বলে কথা।

আমাদের গাইডের নামটা ভুলে গেছি (কঠিন আঁকাবাঁকা নাম, মনে রাখা কষ্টকর)। আমাদের নিয়ে Tashichho Dzong Complex এর প্রবেশপথে দাঁড়াল। আরও দু’জন দর্শনার্থী হলেই একসাথে ভিতরে প্রবেশ করবে। বাইরে থেকেই Dzong টাকে খুব চমৎকার দেখাচ্ছিল। বিশেষ করে গোলাপের বাগান। কমপ্লেক্সের ভিতরে সেঞ্চুরি গাছটাও আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। আগে কখনও সেঞ্চুরি গাছ দেখি নি। সেই ছোটবেলায় শাহরুখ খানের ‘মোহাব্বাতিন’ সিনেমার সুবাদে সেঞ্চুরি পাতার সাথে পরিচয়। এতদিন পর সামনাসামনি দেখে মনটা আনন্দে ভরে উঠল।

বাইরে থেকে Tashichho Dzongবাইরে থেকে Tashichho Dzong

 

Dzong এর সামনে আছে চমৎকার গোলাপের বাগানDzong এর সামনে আছে চমৎকার গোলাপের বাগান

Tashichho Dzong এর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মূল Dzong টি নির্মাণ করেছিলেন Lama Gyalwa Lhanapa ১২১৬ সালে। তখন এটির নাম ছিল Do-Ngön Dzong অথবা Blue Stone Dzong. সেটির অবস্থান এই জায়গা থেকে কিছুটা দূরে এবং পাহাড়ের উপরে ছিল। বর্তমানে এটি Dechen Phodrang Monastery নামে পরিচিত এবং ৪৫০ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর আবাসস্থল। ১৬৪১ সালে Zhabdrung Ngawang Namgyal জংটি দখল করেন Lhapa Kagyu কাছ থেকে, নতুন করে প্রতিষ্ঠাপিত করেন এবং নাম দেন Tashichho Dzong. মূল Dzong এর পাশাপাশি তিনি বর্তমান স্থানে নতুন এই Dzong তৈরি করেন। ১৭৭১ সালে এক অগ্নিকান্ডে মূল Dzong টি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমস্ত জিনিসপত্র বর্তমান Dzong এ নিয়ে আসা হয়। এরপর অনেকবার এটিকে পরিবর্ধন এবং পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ১৮৯৭ সালের ভুমিকম্পে Dzong টি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯০২ সালে এটিকে আবারও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালে ভুটানের রাজধানী পুনাখা থেকে থিম্পুতে স্থানান্তরিত হলে তৎকালীন রাজা Jigme Dorji Wangchuck এটিকে নতুন করে নির্মাণ করেন যা এখনও বিদ্যমান। এরপর থেকেই এটি রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গাইডের কাছ থেকে বিস্তারিত শুনতে শুনতে আমরা প্রবেশদ্বারে পৌঁছুলাম। Dzong এ প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি প্রবেশদ্বার থাকলেও কেবলমাত্র উত্তরপূর্ব দিক দিয়েই সাধারণ পর্যটকগণ প্রবেশ করতে পারেন। একটা ব্যাপার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সকল গাইডের শরীরেই একটা সাদা রঙের শাল বিশেষভাবে জড়ানো দেখেছি। আমাদের গাইড ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল। শালের রঙ দেখে বোঝা যায় পরিধানরত ব্যক্তির পদমর্যাদা। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাগণ নীল রঙের শাল পরিধান করেন। আর রাজপরিবারের সদস্যগণের শালের রঙ হলুদ-কমলার মিশ্রণ।

Dzong এর প্রবেশদ্বারDzong এর প্রবেশদ্বার

 

বর্ণিল সেঞ্চুরি গাছবর্ণিল সেঞ্চুরি গাছ

Dzong এর ভিতরের দেয়ালে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি আটকানো। হিন্দু ধর্মের কিছু দেবদেবীর মূর্তির সাথে পরিচয় থাকলেও বৌদ্ধমূর্তি সম্বন্ধে আমার ধারণা একদমই নগণ্য। কেবলমাত্র গৌতম বুদ্ধকেই চিনি। গৌতম বুদ্ধকে যে শাক্য মুনি বলা হয় জানতাম না। যতদূর জানি বৌদ্ধ ধর্ম আসলে এক ধরণের জীবন দর্শন যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সিদ্ধার্থ ওরফে গৌতম বুদ্ধ। সেই দর্শনের একটা দিক ছিল নিরীশ্বরবাদ। অথচ এখন তাঁকেই দেবতা হিসেবে সর্বাধিক আরাধনা করা হয়। অতি অদ্ভুত আমাদের ধর্মচারণ। ধর্ম নিয়ে বেশিকিছু লিখলেও বিপদ। কোন দিক থেকে প্রাণের উপর আক্রমন আসে কে জানে। অতএব চুপ থাকাই মঙ্গল।

বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিবিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি

বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিবিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি

বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই Dzong এর ভিতর কত বড় উঠান আছে। এই প্রাঙ্গণে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে Tsechu Festival হয়। এই উৎসবে বর্ণিল মুখোশ পড়ে লোকজন নাচানাচি করে। আগামীকাল ঘুরতে আসলে উৎসবে অংশ নিতে পারতাম কিন্তু আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটানোর কোন ইচ্ছেই নেই। প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে প্রশাসনিক ভবন আর  উত্তর দিকে মূল মন্দির। এই দুইয়ের মাঝখানে আছে তিনতলা এক টাওয়ার যেটাকে স্থানীয়রা Utse বলে। বছরের বিশেষ কিছু দিনে সাধারণ মানুষ এই টাওয়ারে চড়তে পারে।

Dzong এর আঙিনায় ছবি তোলা গেলেও মন্দিরের ভিতরে ছবি তোলার অনুমতি নেই। জুতা খুলে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করলে মুগ্ধ হতে হয়। কাঠের মেঝেতে একবিন্দু ময়লা নেই। পুরো মন্দির চমৎকার সব ছবি এবং গৌতম বুদ্ধের ছোট ছোট ভাস্কর্যে সুসজ্জিত। ভাস্কর্যগুলো একইরকম দেখতে। কাঁচ দিয়ে আচ্ছাদিত সমান্তরালভাবে সজ্জিত কাঠের তাকের উপর সমদূরত্বে ভাস্কর্যগুলো রাখা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে গাইডের দিকে তাকাতেই বলল এইরকম ১০০০ ভাস্কর্য আছে মন্দিরের চারদিকের দেয়াল জুড়ে। এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে শাক্যমুনি মন্দিরকে সুরক্ষা দেন। মন্দিরের উত্তরপাশের দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের বিশাল এক সোনালি ভাস্কর্য। সেই সাথে আরও ছোট দুটো ভাস্কর্য চোখে পড়ল। এর মধ্যে একটা ভাস্কর্য সেই ভদ্রলোকের যিনি প্রথমবারের মত তিব্বত থেকে বুদ্ধের দর্শন নিয়ে এইদেশে এসেছিলেন। আরেকজন হচ্ছে স্থানীয় Deiti. ভুটানে Deiti শব্দটা Semi-God কে নির্দেশ করে যার কাজ হচ্ছে মানুষের রূপ নিয়ে স্থানীয় জনগণকে শয়তান এবং দুরাত্মাদের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া। দুইটা খালি চেয়ার রাখা আছে। একটাতে রাজার ছবি, অন্যটাতে আরেকজন ধর্মগুরুর ছবি। ধর্মগুরু মহাশয় ভুটানের প্রধান পুরোহিত, রাজপরিবারের সদস্যদের পরেই যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। চেয়ারদুটো এই দুইজনের জন্যই বরাদ্দ। তারা যখন মন্দিরে আসেন তখন এই চেয়ারগুলোতে বসেন।

মন্দিরের বহিঃভাগমন্দিরের বহিঃভাগ

 

মন্দির থেকে বের হয়ে দেখি Dzong এর ভেতরে আলো জ্বালানো হয়েছে। ভেতর থেকেই দেখতে এত সুন্দর দেখাচ্ছে বাইরে থেকে না জানি কেমন দেখাবে। মন্দিরের ভেতর এবং সিঁড়ি-বারান্দায় জ্বালানো সান্ধ্য প্রদীপগুলো অদ্ভুত এক আলো-আধারির সৃষ্টি করেছিল। সেই সাথে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনাধ্বনি কেমন যেন এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করছিল। মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় আর এই ধরাতে নেই। হারিয়ে গিয়েছি কোন এক অনন্ত দিগন্তে। Dzong থেকে বের হওয়া পর্যন্ত মন এই ভাবালুতায় আপ্লুত ছিল। তবে সত্যিকার অর্থে থমকে গিয়েছিলাম কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে। বাইরে তখন অন্ধকার নেমেছে, তাপমাত্রাও নেমে গেছে ঝপ করে। লাল, সাদা এবং সোনালি আলোর ঝলকানিতে Dzong টা কেমন যেন রহস্যময় লাগছিল। ভুটান দেশটাই তো রহস্যময়। বাকি তিনদিনে আর কি কি রহস্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচিত হবে আমাদের সামনে কে জানে।

আলোকসজ্জার পর Dzong এর ভেতরআলোকসজ্জার পর Dzong এর ভেতর

 

আলোকসজ্জার পর Dzong এর বাহিরআলোকসজ্জার পর Dzong এর বাহির

হোটেলে ফেরার পর ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে লিখতে বসেছি। আমাদের ভুটান যাত্রার প্রথম দিন ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। আগামীকালের গন্তব্য ভুটানের প্রাচীন রাজধানী পুনাখা। শুনেছি খুবই সুন্দর জায়গা। কালই বুঝতে পারব কথাটা কতটুকু সত্যি। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। অনিন্দ্য আর পিটার ঘুমিয়ে গেছে আগেই। বিছানায় শুয়ে রাতের থিম্পু শহর দেখতে দেখতে ক্লান্তি অনুভব করছি। চোখগুলোকে এইবার বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। শুভ রাত্রি।

(চলবে...)

 

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে- ৫ম পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-৪র্থ পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-৩য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-২য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-১ম পর্ব