“পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিটের নাম বলতে পারবেন?”

সুন্দরী গাইডের চোখেমুখে ঔৎসুক এবং পরিহাসের সংমিশ্রণ। বুঝলাম ম্যাডাম ধরেই নিয়েছেন উত্তর দিতে পারব না। হুহ, বিসিএস এর ভাইভা দেওয়ার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আমাকে আটকানো কি এত্ত সোজা নাকি? ঝটপট জবাব দিয়ে দিলাম,

“পেনি ব্ল্যাক।“

মুহূর্তেই সরল এবং নিষ্পাপ হাসিতে গাইডের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

“আপনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছেন। এর আগে যাদেরকেই জিগ্যেস করেছি কেউই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নি।“

আমাকে খুশি করার জন্য বলল নাকি সত্যি সত্যিই বলল সেটা বোঝার তো আর উপায় নেই তাই প্রশংসা হিসেবেই গ্রহণ করলাম। জাতীয় পাঠাগার পরিদর্শন শেষে আমরা এসেছি থিম্পুর চাংলাম থ্রি নামক জায়গায় ভুটানের পোস্টাল মিউজিয়াম পরিদর্শনের জন্য। বলতে দ্বিধা নেই আজকের দিনে প্রথমবারের মত অতীব আগ্রহ সহকারে কিছু দেখতে এসেছি। ছোটবেলায় ডাকটিকেট জমানোর মারাত্মক নেশা ছিল। আজকালকার ছেলেপেলে বিনোদন বলতে বুঝে মোবাইল গেমস আর ফেসবুক। আমাদের কিশোর বয়সে  বিনোদন ছিল রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দার বই আর বিদেশী ডাকটিকেট ও মুদ্রা সংগ্রহ। সময় পাল্টায়, নেশাও পাল্টায়। কে বলতে পারে, ৫০ বছর পরের কিশোরদের নেশা হয়ত হবে পায়ে অথবা পিঠে জেটপ্যাক লাগিয়ে আকাশে চক্কর দেওয়া। 

ডাকটিকেট জাদুঘরের বয়স খুব বেশি নয়। ৪র্থ রাজা দ্রুক গিয়ালপো জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের ৬০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ভুটানের জিপিও বিল্ডিঙের নিচতলায় এই জাদুঘর যাত্রা শুরু করে। আমরা পৌঁছেছি বিকেল ৪ টায়, আর ১ ঘণ্টা পরেই বন্ধ হয়ে যাবে। জনপ্রতি ১৫০ টাকার টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। টিকিটের সাথে সুন্দরী গাইড ফ্রি।

প্রথমেই যা দেখে চমকে গেলাম সেটি হচ্ছে বর্তমান রাজার মুখের মুর‍্যাল। এই মুখটি সাজানো হয়েছে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি ডাকটিকিট দিয়ে। সিরমিক বা মার্বেল পাথরের মুর‍্যাল দেখে অভ্যস্ত এই চোখ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না কিভাবে এই অসাধ্য সম্ভব। আসলেও মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই।

সাড়ে ৪ হাজারেরও অধিক ডাকটিকিট দিয়ে তৈরি রাজার মুখায়ববসাড়ে ৪ হাজারেরও অধিক ডাকটিকিট দিয়ে তৈরি রাজার মুখায়বব

 

এই জাদুঘরে কেবল যে ডাকটিকিটেরই প্রদর্শনী হয় তা নয়। এখানে ভুটানের ডাক ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তন দেখানো হয়েছে। প্রথমদিকে ভুটানে ডাকহরকরা বা রানারগণ চিঠি বিলি করতেন। তখনও ভুটানে ডাকটিকিটের প্রচলন হয় নি। এমনই এক ডাকহরকরার প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে জাদুঘরের ভিতরে। ভুটানে রানার কিংবা ডাকহরকরাদের বলা হয় “Garps”. এদেরকে নিয়োগ দিতেন রাজা নিজে অথবা আঞ্চলিক প্রধান। যোগ্যতা হিসেবে দেখা হত নির্বাচিত ব্যক্তি কত দ্রুত হাঁটতে পারে, কতটা বিশ্বস্ত, কত পরিষ্কারভাবে কথা বলতে পারে এবং স্মৃতিশক্তি কেমন (অনেক সময় মৌখিক সংবাদ পৌঁছানোর ব্যাপার থাকত)। সবচেয়ে বিখ্যাত রানার ছিলেন Grap Lungi Khorlo. কথিত আছে তিনি বাতাসকে বশীভূত করে একদিনেই পুনাখা (ভুটানের প্রাচীন রাজধানী) থেকে ত্রংসা জেলায় হেঁটে যেতে পারতেন যেখানে সাধারণ মানুষের ১ মাস সময় লাগত। এমনই এক ডাকহরকরাকে দেখেই হয়ত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন,

রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে

রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,

রানার চলেছে, রানার!

রাত্রির পথে পথে চলে কোন নিষেধ জানে না মানার।

ডাকহরকরাডাকহরকরা

 

ডাক চলাচলের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনডাক চলাচলের জন্য ব্যবহৃত যানবাহন

ডাকহরকরার পর সাইকেল, মোটর সাইকেল এবং জিপগাড়িতে করে ডাক পৌঁছান হত। সেগুলোর নমুনাও আছে জাদুঘরে। এখন তো আধুনিক ব্যবস্থা। মোবাইল ফোনের এই যুগে অন্যান্য দেশের মত ভুটানেও চিঠি চালাচালির প্রচলন কমেছে। কোন একদিন হয়তবা পোস্ট অফিসের সেবা বন্ধই হয়ে যাবে পৃথিবীতে।

ভুটানিজরা তাঁদের ডাকটিকেট নিয়ে গর্ব করে। এর পিছনে যথেষ্ট কারণ আছে। ভুটানে প্রথম ডাকটিকেট চালু হয় ১৯৬২ সালে। এরপর থেকে তারা এমন কিছু ডাকটিকেট প্রকাশ করেছে যেগুলো পৃথিবীর ডাকটিকিটের ইতিহাসে প্রথম সংযোজন। যেমন ভুটানেই প্রথম সুবাসিত ডাকটিকেট (Scented stamp) চালু হয়েছিল। কথা বলা ডাকটিকিট (Talking stamp), স্টিলের ডাকটিকিট (Steel foil stamp), সিল্কের ডাকটিকিট (Silk stamp), ত্রিমাত্রিক ডাকটিকিট (Three dimensional stamp) ভুটানেই প্রথম চালু হয়। এর চেয়েও অবাক তথ্য হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম সিডি ডাকটিকিট (Compact Disk stamp) এবং গ্রামাফোন ডাকটিকিটের (Phonograph record self-adhesive stamp) আবিষ্কারও এই ভুটানেই হয়েছিল। ভুটানের সরকার তাই ডাকটিকিটকে বলে “Little ambassadors of our country”. কারণ পৃথিবী যখন ভুটানের ব্যাপারে খুব অল্পই জানত তখন এইসব সৃষ্টিশীল ডাকটিকিটের মাধ্যমেই ভুটানের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিভিন্ন ধরণের ডাকটিকিট। দেয়ালেও ডাকটিকিট।বিভিন্ন ধরণের ডাকটিকিট। দেয়ালেও ডাকটিকিট।

 

১৯৬২ সালে প্রকাশিত ভুটানের প্রথম ডাকটিকিট১৯৬২ সালে প্রকাশিত ভুটানের প্রথম ডাকটিকিট

যেসকল ডাকটিকিটের কথা বললাম সেগুলোর সবগুলোর নমুনাই জাদুঘরে বিদ্যমান। ভুটানের প্রথম ডাকটিকিট যেমন আছে, তেমনি পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিট “পেনি ব্ল্যাকে”র রেপ্লিকাও আছে। এই টিকিট দেখিয়েই গাইড আমাকে প্রশ্নটা করেছিল। আরও একটা বিশেষ ডাকটিকিট আছে যেটি সম্পূর্ণ সোনার তৈরি। ২০১১ সালে ভুটানের বর্তমান রাজার বিয়ের সময় এই ডাকটিকিটটি প্রকাশ করা হয়। এইসব ডাকটিকিটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভুটানের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য।

রাজার বিয়ে উপলক্ষ্যে ২০১১ সালে প্রকাশিত স্বর্ণের ডাকটিকেট। রাজার বিয়ে উপলক্ষ্যে ২০১১ সালে প্রকাশিত স্বর্ণের ডাকটিকেট।

পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিটের স্বর্ণের রেপ্লিকা।  পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিটের স্বর্ণের রেপ্লিকা।

শুধু যে ডাকটিকিট আছে তাই নয়, এখানে ভুটানের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাও সংরক্ষিত আছে। যদিও এখন ভুটানে মুদ্রার প্রচলন নেই (সবই নোট) তবে একসময় যে মুদ্রাই প্রধান বিনিময় মাধ্যম ছিল সেটা বোঝা যায়, কারণ ১৮৩৫ সালের মুদ্রাও জাদুঘরে দেখেছি। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ভুটানের এক পিস মুদ্রা আছে বলে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবছি।

ভুটানের মুদ্রাভুটানের মুদ্রা

 

এতোটাই বিমোহিত হয়েছিলাম যে কখন সময় কত দ্রুত কেটে যাচ্ছে খেয়াল রাখি নি। ঘড়িতে দেখি ৫ টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি। অতএব জাদুঘর থেকে বের হয়ে ভবনের নিচতলায়ই ছোট্ট একটা দোকানে প্রবেশ করলাম স্মারক সংগ্রহের জন্য, এবং সবচেয়ে দুঃখের সংবাদটা শুনলাম। ভুটান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে আপনি অফিসিয়াল ডাকটিকিটে নিজের ছবি ছাপাতে পারবেন এবং সেই টিকিট দিয়ে পৃথিবীর যে কোন দেশে চিঠি পাঠাতে পারবেন। এর জন্য খরচ হবে মাত্র দুইশত গুলট্রাম এবং সময় লাগবে আধা ঘণ্টা। আমরা যদি প্রথমেই দোকানে ঢুকতাম তাহলে টিকিটের জন্য ছবি তুলে দিয়ে যেতে পারতাম। এই আফসোসটা নিয়েই কয়েকটা স্মারক ডাকটিকিট কিনে জিপিও ভবন থেকে বের হয়ে আসলাম। (চলবে)

 

সুভেনির শপে অসংখ্য ডাকটিকিট কেনা যায়সুভেনির শপে অসংখ্য ডাকটিকিট কেনা যায়

চলবে...

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-৪র্থ পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-৩য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-২য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-১ম পর্ব