সমগ্র ভারত বর্ষের ইতিহাস পরিবর্তনের জন্য কালের সাক্ষী হয়ে যে স্থানটি সু অথবা কু পরিচিত তার নাম মুর্শিদাবাদ । বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তাক্ত অতীতের এক নগরী এই মুর্শিদাবাদ । এক বিশাল উপমাহাদেশ খন্ড বিখন্ড হবার শুরুটা হয়েছিল এখান থেকে । তাই বোধয় মুসলিম প্রধান এই অঞ্চলটিকে সবাই এড়িয়ে চলতে চায় । এড়িয়ে চলতে চায় নিষ্ঠুর ইতিহাসকে । চলুন আজ জেনে নেই কম খরচে মুর্শিদাবাদ ভ্রমন সম্পর্কে । 

কলকাতার শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে মাত্র ২৪০ কি; মিঃ দূরে অবস্থিত মুর্শিদাবাদ । ঘন্টা চারেক ট্রেন জার্নির জন্য রাত ১১.২০ এর লাল গোলা এক্সপ্রেসের ১০০ রুপির স্লিপার ক্লাসের টিকিট কেটে ফেলুন । ট্রেনে একটা জম্পেশ ঘুম দিয়ে রাত ৪.২০ বা ৫ টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন মুর্শিদাবাদ জংশনে । মোবাইলে এলাম দিয়ে রাখবেন না হয় ভুলে অন্য স্টেশনে চলে যেতে পারেন । স্টেশন থেকে বেড়িয়ে সামনের বাম দিকে হোটেল পাবেন । ২০০ রুপিতেই ডাবল বেডের রুম অথবা ৪ বা ৫ জন্য হলে হোটেলে কথা বলে সারাদিনের জন্য হোটেল বুক করুন । আপনি সারাদিন ঘুরে আবার রাত ১০.২০ শের লাল গোলা এক্সপ্রেসে কলকাতা ফিরে আসতে পারবেন । 

 হাজার দুয়ারীঃ

আমাদের দেশের অটো আর মুর্শিদাবাদে টো টো বলে । কারো কথা না শুনে হোটেল থেকে বেড়িয়ে ১০ রুপির টো টো তে করে হাজার দুয়ারী চলে আসুন । ২০ রুপির এন্ট্রি ফি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করুন । এখানে বলে রাখা ভালো যে ক্যামেরা , মোবাইল জমা দিয়ে ভিতরে যেতে হয় । ঘুরা ঘুরি শেষ হলে সেগুলো ফেরত নিয়ে হাজার দুরারির প্রাঙ্গনে আপনি ছবি তুলতে পারবেন । ইতিহাসের অনেক ঘটনার নিদর্শন রয়েছে এই হাজার দুয়ারিতে । ভিতরে গিয়ে সব জায়গায় নবাব সিরাজ কে খুজতে যাবেন না । কারন পুরো মুর্শিদাবাদ ঘুরে আমার যেটা মনে হয়েছে এখানে নবাব সিরাজ কে সেভাবে মুল্যায়ন করা হয় নি । বরং মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতাকে বেশি করে হাইলাইটস করা হয়েছে । হাজার দুরারী ঘুরা শেষ হলে সেখান থেকে বেড়িয়ে আবার টো টো তে করে চলে আসুন নবাব সুজা উদ্দিনের কবরে ।

 নবাব সুজা উদ্দিনের কবরঃ

১০ থেকে ১৫ রুপি ভাড়ায় হাজার দুয়ারির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথী নদীর অপাশে নবাব সুজা উদ্দিনের কবরে কাছে চলে আসুন । শান্ত নিরব কবর খানা আপনাকে ইতিহাসের অনেক গল্প মনে করিয়ে দিবে । এবার আবার টো টো তে করে চলে আসুন আজিমুন্নেসার কবর দেখতে ।

 আজিমুন্নেসার কবরঃ

নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যা ছিলেন আজিমুন্নেসা । তাকে নিয়ে অনেক প্রবাদ প্রচলিত আছে যে গুলোর সত্যতা পাওয়া যায় না । 

 মীর জাফরের কবরঃ

আজিমুন্নেসার কবর থেকে বেড়িয়ে ১০ রুপি ভাড়া দিয়ে আবার টো টো তে করে চলে আসুন ভিলেন অফ দ্যা হিস্টোরি মীর জাফরের কবরে । অনেক টা অবহেলিত অবস্থায় থাকা এই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ঘৃণা বা যা প্রকাশ করার ইচ্ছে সেটা প্রকাশ করে চলে আসুন কাঠ গোলা বাগান বাড়ি ।

 কাঠ গোলা বাগান বাড়িঃ

হাজার দুয়ারির পর আর একটা সুন্দর জায়গা এই কাঠ গোলা বাগান বাড়ি । এটা প্রাইভেট প্রোপার্টি এবং অনেক কিছু দেখার আছে । এখানকার শাসকেরা সুদুর পাঞ্জাব থেকে এখানে এসেছিলেন । 

 ফুতী মসজিদঃ

ইতিহাসের আর এক বিরল সাক্ষী এই ফুতী মসজিদ । প্রবাদে আছে এক রাতেই বানানো হয়েছিল এই মসজিদ । মসজিদের উপরের অনেক গুলো দেয়াল খসে পরে গেছে তার পরেও দেখার মত একটা জিনিস এই ফুতী মসজিদ । উপরে যাবার দুর্গম সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে পুরো মুরশিদাবাদ দেখার মজাই আলাদা আর সেই সাথে অনুভব করবেন সেই আমলের মুসলিম শাসকদের এসব মসজিদ প্রীতির উজ্জ্বল ভালবাসাকে ।

 কাটরা মসজিদঃ

মুর্শিদাবাদের সব থেকে বড় ঐতিহাসিক মসজিদ এই কাটরা মসজিদ । এর সিড়ির নিচেই সমাহিত রয়েছেন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ । ইতিহাসে আছে তার ঘনিষ্ঠ একজনকে মৃত্যু দন্ড দেবার কারনে তিনি চেয়েছিলেন তার কবর যেন মসজিদের সিঁড়ির নিচে দেওয়া হয় । যাতে মুসল্লিদের পায়ের ধুলো তার কবরের উপর পরে তার পাপের প্রাশ্চিত্ত হয় ।

মতিঝিল পার্কঃ

এটা ঢাকার মতিঝিল নয় বরং মুর্শিদাবাদের মতিঝিল পার্ক । সাজানো গুছানো সুন্দর একটা পার্ক যেখানে নবাব সিরাজ এর অনেক সৃতি রয়েছে । আগেই বলেছি পুরো মুর্শিদাবাদে নবাব সিরাজ কে নিয়ে বেশী এক্সপেকটেশন রাখবেন না । বরং এই পার্কার বিভিন্ন জায়গায় মীর জাফরকে হাইলাইটস করে তার কুকর্মকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

পুরো দিন ঘুরে দেখার পর পার্ক থেকে বেড়িয়ে ১০ রুপির টো টো তে করে মুর্শিদাবাদ স্টেশনে চলে আসুন । এর পর সারা রাত ট্রেনে সুন্দর একটা ঘুম দিয়ে সকালে কলকাতা।

খরচঃ 

কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ গিয়ে ঘুরে আবার কলকাতা ফিরে আসতে সব মিলিয়ে জন প্রতি ৯০০ রুপি মাত্র খরচ হবে ।