আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল কাওয়ানজাংসা নামক স্থানে অবস্থিত ভুটানের আর্ট স্কুল। এটা অনেকটা বাংলাদেশের চারুকলা ইন্সটিটিউটের মত। অনেকগুলো বিভাগ আছে। পাশাপাশি দুটো বিল্ডিং। ডানপাশের আধা-পাকা বিল্ডিং এর দুটো কক্ষে ছাত্রছাত্রীদের কাঠের কাজের তালিম দেওয়া হচ্ছে। আর তৃতীয় কক্ষে সুভেনির বিক্রয় চলছে। কি সুন্দর কাঠের ভাস্কর্য অল্প সময়ের মধ্যেই বানিয়ে ফেলছে শিক্ষার্থীরা। সবাই ভুটানের জাতীয় পোশাক পরিধান করে আছে। এই ব্যাপারটা খুব ভাল লেগেছে। ভুটানের জাতীয় পোশাক পরিধান করা কেবলমাত্র সরকারী চাকুরীজীবী এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় সবাইই জাতীয় পোশাক পরিধান করেই থাকে। একেই বলে জাত্যাভিমান এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা।

দ্বিতীয় ভবনটি তিনতলা। নিচতলায় ভাস্কর্য বিভাগ এবং দোতলায় চিত্রকলা এবং বুনন বিভাগ। তালা দেওয়া ছিল বিধায় তৃতীয় তলায় প্রবেশ করতে পারি নি। ভবন দুটো অনেক প্রাচীন। সিঁড়িগুলোও কাঠের এবং একটু জোরে চাপ পড়লেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কেঁপে উঠে। পিটার একটু মোটাসোটা হওয়ায় শঙ্কিত ছিল সিঁড়িগুলো ভেঙে পড়ে কি না। শেষ পর্যন্ত ইজ্জত রক্ষা হয়েছে। ভালোভাবেই আমরা মূল ভবন থেকে বাইরে আসতে সক্ষম হয়েছি। ১৫০ রুপি খরচ করে এই ভবন দেখা আমার কাছে একদমই নিরর্থক মনে হয়েছে। এর চেয়ে আমাদের চারুকলায় ঘুরলে অনেক বৈচিত্র্যময় বস্তু দেখা যায়।

আর্ট স্কুলের প্রবেশপথআর্ট স্কুলের প্রবেশপথ

 

ভাস্কর্য প্রক্রিয়াকরণ চলছেভাস্কর্য প্রক্রিয়াকরণ চলছে

আর্ট স্কুলের সাথেই একটা সুভেনিরের দোকান। দারুন সব জিনিস আছে ভিতরে কিন্তু দাম শুনে ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হরেক রকমের থাংকা (কাপড়ের উপর আঁকা চিত্রকল্প) আর মুখোশের ছড়াছড়ি চারদিকে। ছবি তোলা নিষেধ তাই স্মৃতির হার্ড ডিস্কই সম্বল।

চমৎকার এবং সুদৃশ্য থাংকাচমৎকার এবং সুদৃশ্য থাংকা

 

আর্ট স্কুলের পাশেই হাঁটা দূরত্বে Folk Heritage Museum বা লোক ঐতিহ্য জাদুঘর। জাদুঘরে প্রবেশ ফি ভুটানিজদের জন্য ১০ রূপি, ভারতীয়দের জন্য ৫০ রূপি আর অন্যান্য দেশের পর্যটকদের জন্য ২০০ রূপি।

“ভাই, এরা তো পুরাই ডাকাতি শুরু করসে। ভাঙাচোরা বাড়িঘর দেখিয়ে যদি পকেট ফাঁকা করে তাহলে বাকি জায়গা দেখব কিভাবে?"

লোক ঐতিহ্য জাদুঘরের প্রবেশপথলোক ঐতিহ্য জাদুঘরের প্রবেশপথ

 

পিটারের যৌক্তিক ক্ষোভের বিরুদ্ধে বলার কিছুই ছিল না। এমন সময় দেখি অনিন্দ্য বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে টিকেট হাতে ফিরছে। চোখ টিপে জানাল কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আমাদের চেহারা দেখে ভারতীয় ভেবে কিছু জিগ্যেস না করেই ৫০ রূপির টিকেট দিয়েছেন। সেই টিকেট নিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম জাদুঘরে।

জাদুঘরে প্রবেশ করার পরই মনে হল টাইম মেশিনে চড়ে ১০০ বছর পিছনে চলে এসেছি। মাটি, বাঁশ এবং কাঠ দিয়ে তৈরি ত্রিতল ভবনটির বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি।  ২০০১ সালে ভুটানের রাণীমাতা দর্জি ওয়াংমোর নির্দেশে এটিকে জাদুঘরে রুপান্তরিত করা হয়। ভুটানের লোকজন প্রাচীনকালে কিভাবে বসবাস করতেন, কোন কোন তৈজসপত্র এবং আসবাবপত্র ব্যবহার করতেন, কি কি উপকরণ দিয়ে যুদ্ধ করতেন, কি কি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটাতেন সব একত্রিত করা আছে। এইখানেও ছবি তোলা নিষেধ। বিরক্তির একশেষ, ভুটান কি কেবল হাওয়া খেতে এসেছি? স্মৃতি নিয়ে যেতে হবে না? তাই সবার অলক্ষ্যে ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম।   

প্রাচীন আমলের তৈজসপত্রপ্রাচীন আমলের তৈজসপত্র

 

প্রাচীন আমলের যুদ্ধ উপকরণ এবং পোশাকপ্রাচীন আমলের যুদ্ধ উপকরণ এবং পোশাক

সকাল থেকে একটানা ভ্রমণে থাকায় মাথাব্যথা করছিল ভীষণ। একটু চায়ের আশায় এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছিলাম। ভারতের রাস্তাঘাটে যেমন প্রচুর স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায় ভুটানে তেমন কিছুই নেই। হঠাত করেই তিন তলা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি পিটার চায়ের কাপে করে কি যেন খাচ্ছে। আহা, চায়ের নেশাটা একলাফে আকাশে উঠে গেল। দ্রুত নিচে নেমে যেইনা ওকে জিগ্যেস করলাম চা কোথায় পেলে, তখনই কেটলি হাতে দাঁড়ানো অষ্টাদশী তরুণীর খিলখিল হাসিতে সবাই আমার দিকে ফিরে তাকাল। পুরাই বেকুব বনে গেলাম। পিটার মুচকি হেসে বলল, “ভাই এইটা কিন্ত চা না, এইটা ওই জিনিস। শরীর গরম করে দেয়।“ বুঝলাম, এখনও বাচ্চাই আছি।

আমাদের পরের গন্তব্য ভুটানের জাতীয় পাঠাগার এবং মহাফেজখানা (Central Archive)। চেনচু আমাদের পাঠাগারের সামনে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেল ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পুনাখা ভ্রমণের পারমিট নিয়ে আসতে। এই ফাঁকে আমাদের লাইব্রেরী পরিদর্শন সম্পন্ন করতে হবে। আর্ট স্কুল এবং হেরিটেজ মিউজিয়াম দেখে মন ভরেনি। পিটার তো ইতোমধ্যে অনিন্দ্যকে একচোট বকে দিয়েছে, “এত ট্যাকা খরচ কইরা তুই ভুটান নিয়া আইলি কি হাড়ি পাতিল দেখানোর জন্য রে শয়তান” এই বলে। অনিন্দ্য কেবল হাসে। বলে, “অপেক্ষা কর গুরু, ভ্রমণ তো কেবল শুরু।“

লাইব্রেরী কমপ্লেক্সে প্রবেশের সময়ই মনটা ভাল হয়ে গেল Mittu দেখে। এটি একধরণের ফুল, বাংলাদেশে আমরা এটিকে জিনিয়া নামে ডাকি। চেনচুর ভাষ্য অনুযায়ী Mittu মানে “আমি তোমাকে ভালবাসি”। এই সময়টা নাকি ভুটানে প্রেমের সময় এবং প্রেমিকগণ প্রেমিকাকে এই ফুল নিবেদনের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করে। ব্যাখ্যাটা সুন্দর হলেও আমার মনঃপুত হয় নি। ভালোবাসার আবার নির্দিষ্ট মাস থাকে নাকি? এই কারণেই ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উদযাপনের বিষয়টা আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। যাই হোক, মুখ ব্যাদান করে দণ্ডায়মান সুউচ্চ পাহাড়ের ক্যানভাসে শেষ বিকেলের হিমেল হাওয়ায় Mittu ফুলের আনিয়ন্ত্রিত স্পন্দন মনটাই ভাল করে দিল।

ফুলের নাম Mittu ওরফে I love you ওরফে জিনিয়াফুলের নাম Mittu ওরফে I love you ওরফে জিনিয়া

 

লাইব্রেরী কমপ্লেক্সে দুটি ভবন। দ্বিতল ভবনটি ভুটানের কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা এবং সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ভবনটির সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। ডেনমার্ক সরকারের সহযোগিতায় ২০০৪ সালে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকার্যের সমারোহ ভবনটির সৌন্দর্যে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। অফিস প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য, এতটাই চমৎকার চারপাশের দৃশ্যাবলী। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটিই কেন্দ্রীয় পাঠাগার। ভিতরে প্রবেশ করে ভুল ভেঙেছে। খুব চমৎকার একটি বাক্য লেখা আছে ভবনের ভিতরে। “A nation stays alive when its culture stays alive.” সত্যিই তো, সংস্কৃতি না বাঁচলে একটা জাতি কিভাবে বাঁচে? হ্যাঁ, বাঁচতে পারবে। তবে সেই জাতি হবে অসভ্য এবং বর্বর এক জাতি।

কেন্দ্রীয় মহাফেজখানার সুদৃশ্য ভবনকেন্দ্রীয় মহাফেজখানার সুদৃশ্য ভবন

 

মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীমনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী

ভুটানের তৎকালীন রানীমাতা Ashi Phuntso Choden এর আর্থিক সহায়তায় কেন্দ্রীয় পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভুটানের প্রাচীন এবং দুষ্প্রাপ্য পুস্তক বিশেষ করে ধর্মীয় পুঁথিগুলোর সংরক্ষণ। তবে সেটির অবস্থান এই জায়গায় ছিল না। নতুন ভবনটি তৈরি হয়েছে ১৯৮৪ সালে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ভুটানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু (প্রভাবের দিকে রাজা এবং রাণীর পরেই যার অবস্থান) H.H. Dilgo Khyentse Rinpoche পাঠাগারটিকে একটি মন্দির হিসাবে প্রতিস্থাপিত করেন। মানে এটি একইসাথে পাঠাগার এবং মন্দির। এটিকে মন্দির হিসাবে ঘোষণা করার কারণ আছে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ধর্মীয় পুঁথিগুলো মন্দির ছাড়া অন্য কোন স্থানে রাখার নিয়ম নেই। পাঠাগারকে মন্দির বানালে সুবিধা। বই তো রাখা যাবেই, পুঁথিগুলোর সংরক্ষণও সহজ হবে।

মন্দির বলেই ভিতরে জুতা খুলে প্রবেশ করতে হয়। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে একটা দেশের জাতীয় পাঠাগারে যেই পরিমাণ বই থাকা উচিৎ সেই পরিমাণ বই দেখতে পাই নি। তার চেয়ে রাজপরিবারের নতুন এবং পুরাতন ছবির সংখ্যাই বেশি। কেবলমাত্র নিচতলাতেই দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন। এইখানে প্রাচীন পুঁথিগুলো নেই। সম্ভবত উপরে আছে। তবে মন্দির বলেই কি না দেবমূর্তি এবং পূজা অর্চনার জিনিসপত্র বিদ্যমান। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চুপিসারে ঠিকই মন্দির অংশের ছবি তুলে নিয়েছিলাম।

কেন্দ্রীয় পাঠাগারকেন্দ্রীয় পাঠাগার

 

পাঠাগারের ভিতর মন্দিরের অংশপাঠাগারের ভিতর মন্দিরের অংশ

পাঠাগার পরিদর্শন শেষে বের হয়ে অনুভব করলাম জোরে বাতাস বইছে। সেই বাতাসে পাঠাগারের সামনের লম্বা দণ্ডে টানানো প্রার্থনা পতাকাগুলো পতপত করে উড়ছে। সেই সাথে দুলছে পাঠাগার প্রাঙ্গণের বৃক্ষ, তরু এবং লতা-গুল্ম। পাঠাগারের পাশেই আরও একটি ভবন। কিসের ভবন জানা নেই। সেই ভবনের একপাশের দেয়ালের নিচে এক বৃদ্ধ বসে মুখোশ বিক্রি করছিলেন। কত রঙ বেরঙের মুখোশ। এই রঙিন দুনিয়ায় আমরা তো সবাই মুখোশের আড়ালেই বাস করি। কোনদিন কি পারব মুখোশের আড়ালের সত্যিকারের মানুষটাকে বের করে নিয়ে আসতে?

হরেক রকম মুখোশহরেক রকম মুখোশ

(চলবে...)

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-৩য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-২য় পর্ব

ড্রাগনের খোঁজে ড্রাগনের রাজ্যে-১ম পর্ব