‘কোমর পর্যন্ত ডুবে গেছি, নড়ার শক্তি নাই, দেখেন তো ভাই যদি টেনে তুলতে পারেন’। মুখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে কথাটা বললেন রেজাভাই, কিন্তু তার অবস্থা  দেখে আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে লাগল। ভাটায় জেগে ওঠা খালের মাঝখানে থকথকে কাদার মধ্যে গজালের মত গেঁথে গিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। কাদায় পা টেনে টেনে শ্রান্ত দেহে তখন আমি খাল-পাড়ে দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছি। হাতিয়ার দক্ষিণে ডোবাচরে সকাল থেকে আমরা হাঁটছি। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর নবীন চরে আছে শুধু সৈকত-পাখির পায়ের নকশা আঁকা মাখনের মত মসৃণ কাদার অন্তহীন প্রান্তর। এমন নরম কাদা, পাতি-লালপা পাখির ভরটুকু সয় না। ‘কাদা’ বললে প্যাঁকপেকে ভাবটা ব্যক্ত হয় না বলে চরের মানুষ একে বলে ‘প্যাঁক’, ‘খাবর’ কিম্বা ‘ভ্যাদর’।

এমন নরম কাদা, পাতি-লালপা পাখির ভরটুকু সয় না!এমন নরম কাদা, পাতি-লালপা পাখির ভরটুকু সয় না!

চার দিন হলো উপকূলে পা রেখেছি; পদে পদেই প্যাঁক আমাদের পা আটকে ধরছে। এক পা টেনে তুলতে গেলে প্যাঁকের মধ্যে আরেক পা হাঁটু অব্ধি ডুবে যায়। পুরো হাঁটু প্যাঁকে ঢুকলে তা টেনে ওঠানোর জোর থাকে না অন্য পায়ে। বিরল পাখির পিছু  নিলেও তাই দুরবিন সরিয়ে প্রায়ই আমরা কাদায় চোখ রাখি, প্যাঁক-লাইন হাঁটুর ওপরে ওঠার আগেই পিছু হটে যাই। প্যাঁকের জগতে রেজাভাই নতুন নন, জানেন যে খালের মাঝখানটাতেই ঘাপটি মেরে থাকে ঘাতক ভ্যাদর। তবুও চরের অপর প্রান্তে অপচ্ছায়ার মত সারি দিয়ে দাঁড়ানো অ-সনাক্ত পাখির অপ্রতিরোধ্য টানে খালে নেমে পড়েছিলেন, ভেবেছিলেন জোর দিয়ে কদর চালিয়ে পার হয়ে যাবেন। তা আর হয়নি, খাবরের খপ্পরে কদমের জোর শেষ, যত জোড়াজোড়ি করেছেন ততই ডুবেছেন।

আমি তড়িঘড়ি খালে নেমে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ভয়ে পা সরে না, তাই হাতের নাগাল পেলাম না। খালের ঢালে আছি বলে তখনও আমার পা সচল, দুরুদুরু বুকে আরো নীচে নামলাম। ঐ তো এখনও হাঁটু দেখা যায়, আরেক কদম নামা যাক! আহ্‌, পেয়েছি!.. ধরতে তো পেরেছি, কিন্তু টানাটানি করে রেজাভাইকে এক ইঞ্চি জাগানো গেল না, উল্টো আমি প্যাঁকে ঢুকে গেলাম। চিৎকার করে বললাম, ‘আমার হাঁটু কাদার নীচে, আমি আটকে গেছি। আমরা হাত ছেড়ে দিলাম, দুজনেই কাদায় গেঁথে গেছি, দুজনেই অচল। আমার হটকারি উদ্ধার প্রয়াসের করুণ পরিণতি দেখে দুজনেই বোকার হাসি হাসলাম।

এখন কেউ এসে টেনে না তোলা পর্যন্ত আমাদের দুজনকেই কাদার মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। জনহীন চরে কালেভদ্রে জেলেরা আসে; আশা আছে তাদের কেউ না কেউ এদিকে আসবে। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, খালে সুড়সুড় করে জোয়ারের পানি ঢুকছে, তিন-চার ঘন্টায় পানি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাবে। বেচারা রেজাভাই, প্রবাসে আয়েশে থেকেও প্রতি শীতে পাখি দেখতে দেশে আসেন- বলেন, ‘মাটির টান’। সে কথা স্মরণ করে বললাম, ‘রেজাভাই, মাটি আজ সত্যি আমাদের টানছে’। অট্টহাসি দিয়ে তিনি বললেন, ‘মাটির টানে দেশে এসেছি বলে কি কাদায় ডুবে মরব’!

তখনই দেখলাম দূরে এক জেলে-নৌকা পাল তুলে চলে যাচ্ছে। আমরা চার হাত শোরগোল করে দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস পেলাম; নৌকা চলে গেল। তারা কি আমাদের ঠাহর করতে পারল না! দুরবিনে চোখ রেখে আমার কিন্তু মনে হল, পালের নীচে উঁকি দিয়ে এক কিশোর আমাদের দেখছে। আমাদের এ করুণ অবস্থা দেখার পরও কি কেউ এভাবে চলে যেতে পারে! বিশ্বাস হয় না। রেজাভাইয়ের ধারণা, ওরা ফিরে  আসবে। ঘন্টা পার হলো, কেউ এল না; জোয়ারের পানি বেড়ে চলল।

মনুষ্য প্রজাতির ওপর হতে আমার আস্থা প্রত্যাহারের সংকল্প যখন চূড়ান্ত করে ফেলেছি তখন দেখি নৌকাটা ঠিকই আমাদের দিকে ফিরে আসছে। পাল নামিয়ে নৌকা খালে ঢুকিয়ে অনেক ঠেলাঠেলি করে জেলেরা এগিয়ে এল; আর খেতের মূলা তোলার মত কাদা থেকে টেনে ওঠাল আমাদের। নৌকায় বসে আমরা সমস্বরে বললাম, ‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, আরে ভাই তখন এলেন না কেন?’ প্রবীণ জেলে বললেন, ‘দরিয়াত জাল হালাই আইলাম। জোয়ারর হানি না বাইলি (বাড়লে) তো এ খালে ঢুকতি হাইত্তাম ন’।