স্বল্প খরচের সঠিক গাইড পেতে হলে পড়তে হবে 

যাতায়াত, তিনবেলা খাওয়া, বিভিন্ন সাইটসিং সহ ৪রাত ৫দিন হোটেল ভাড়া দিয়ে যখন ট্যুর শেষে কাজিনদের টাকার হিসাব বুঝিয়ে দিলাম তখন তারাতো রীতিমত অবাক। বিশ্বাসই করতে পারছিলনো এত আনন্দে স্ট্যান্ডার্ড একটি বিদেশ ভ্রমণ স্বল্প খরচে কিভাবে সম্ভব হয়েছিল !! যেখানে কক্সবাজার ঘুরতে গেলেও এর চেয়ে বেশী খরচ হয়। সেখানে.........
(পরে অবশ্য চিন্তা করেছিলাম জনপ্রতি ৩ হাজার বেশী ধরলে হয়ত নিজেদের দুইজন ফ্রি করতে পাড়তাম যদিও আমার দ্বারা তা কোনদিনও সম্ভব না 

জ্বি ভ্রমণটি ছিল আমার দার্জিলিং কিন্তু সময়টি বেশ কয়েকবছর আগে কিন্তু খরচের পার্থক্য হয়ত খুব একটা বেশী কম এখনো হবেনা। আমি গিয়েছিলাম ২০০৯ সালে। যদিও তখনের অনেক খরচই হয়ত আমি ভুলে গিয়েছি তবে যতটুকু মনেপরে তার ভিত্তিতে লিখবো আজ। আমার এই গাইড নিয়ে একাধিক ফ্যামিলি পরবর্তীতে দার্জেলিং ঘুরেছেন এবং তারা এখনো আমাকে দেখলে সে কথা স্মরণ করেন।

আপনি যদি বিদেশ ভ্রমণের যাত্রা শুরু করতে চান তাহলে প্রথমেই শুরু করুন দার্জেলিং দিয়ে। আর যদি সদ্য বিবাহিত হয়ে থাকেন তাহলেতো কথাই নাই। সত্যিই দেখার মত দার্জেলিং এর প্রাকৃতিক সে সৌন্দর্য। আপনি মুগ্ধ হবেন এটি আমি একবাক্যে বলতে পারি।

সত্যিই দেখার মতসত্যিই দেখার মত

আমার ভ্রমণটি যেমন ছিলঃ

২০০৮ সালে আমার আরও একবার অফিসিয়াল ভাবে যাওয়ার অভিজ্ঞতার পর স্ত্রী ও কাজিনদের নিয়ে পরের বছর ২০০৯ এ নিজে নিজে প্ল্যান করি। দার্জেলিং এ যাওয়ার জন্য মিনিমাম ৬ জন ম্যানেজ করা ভাল। সেটি ৩ জুটিও হতে পারে। এতে আপনার ভ্রমণটি আনন্দের হবে এবং সঙ্গে খরচও অনেক সাশ্রয় হবে। প্রথমে সকলের ইন্ডিয়ার ভিসা সংগ্রহ করে পাসপোর্ট প্রতি ৩০০টাকা করে ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে নিলাম। ঢাকার কল্যানপুর থেকে ঢাকা টু বুড়িমারী নন এসি বাসের টিকিট রিটার্ন সহ কাটি “হয়ত ৯০০/- টাকা আপ ডাউন” ( আপনি ইচ্ছা করলে ঢাকা থেকে সরাসরি ইন্ডিয়ার শিলিগুড়ির আপ ডাউন ২০০০/- শ্যামলীর এসি বাস টিকিট কাটতে পারবেন)।

সময় ছিল ডিসেম্বর প্রথম সপ্তাহ তবে আমার মতে দার্জেলিং এর জন্য বেষ্ট সময় আগস্ট থেকে নভেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। রাত ৯টায় কল্যাণপুর থেকে বাস ছাড়লো এবং ভোরে পৌঁছাই গেলাম বুড়িমারী। সেখানে বাসের কাউন্টারে রেস্ট নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এমনকি বেডও আছে তবে খুব একটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন না। সূর্যি মামা উঠলো আর সকাল হলো টুথব্রাশ পেস্ট দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম।

কাউন্টার ম্যানেজারকে পাসপোর্ট প্রতি হয়ত ১০০/২০০ টাকা দিয়ে তাকে ইমেগ্রেশনের জন্য ব্যবস্থা করতে বললাম। আর আমরা চলে গেলাম কাছেই অবস্থিত বুড়িমারীর বুড়ির হোটেলে নাস্তা করতে। ভরপুর নাস্তা করে অপেক্ষায় কখন খুলবে বর্ডার। মনেহয় ৯টায় বর্ডার খুললো। আমাদের লাগেজ গুলো বর্ডারে নিয়ে গেলাম এবং কাউন্টার ম্যানেজারকে আমাদের ফেরত আসার দিনটি কনফার্ম করে গেলাম। এপাড়ে বাংলাদেশ আর তাড়কাটা সীমানার ওপাড়ে ভারত। BDR চেক করে বাংলাদেশ ইমেগ্রেশন পাড় হোলাম তারপর গেলাম ইন্ডিয়ার ইমেগ্রেশনে।

সুইজারল্যান্ড মনে হতে পারেসুইজারল্যান্ড মনে হতে পারে

এখানে বলে রাখি পৃথিবীর যেকোন ইমেগ্রেশন পাড় হতে গেলে বিশেষ করে আমাদের আশেপাশের দেশ সেখানে নিজেকে একটু স্মার্টের সাথে উপস্থাপন করবেন। সেখানে আপনি যদি একটু গেয়ো ভাব করেন তাহলে আপনাকে তারা পেয়ে বসবে তবে উন্নত দেশে উল্টা না বুঝলে তারা হেল্প করবেন। ইন্ডিয়ার ইমেগ্রেশনের বর্ডারের নাম চেংরাবান্দা। সেখানে পাড় হয়েই সামনে গাছ পালার মধ্যে অনেক দোকান ও কাউন্টার দেখতে পেলাম। সেখানে যেয়ে কিছু ডলার ভাঙিয়ে রূপি করে নিলাম। সেখানে আপনি দিব্যি বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক পাবেন।

বাস, ট্যাক্সি ছাড়াও অনেক প্রাইভেট গাড়ী আছে। আমরা ভাড়া দামদর করে মনেহয় ১১০০ রুপিতে একটি জীপ রিজার্ভ নিলাম। একটু বেশী লেগেছিল কারন যাত্রী তুলনায় গাড়ী কম ছিল। যাত্রা শুরু চেংরাবান্দা টু শিলিগুড়ি। কোথাও সবুজ ধান ক্ষেত কোথাও ঘরবাড়ী এরই মধ্যে দিয়ে রাস্তা দিয়ে চলে গেলাম শিলিগুড়ি শহরে। প্রায় ৩ঘন্টার পথ। ড্রাইভারকে বলবেন আপনাদের যেন শিলিগুড়ি শ্যামলী কাউন্টারে ওখানে নামান। শ্যামলী কাউন্টারের দোতলায় বুফে লাঞ্চের ব্যবস্থা আছে। দ্রুত লাঞ্চ শেষ করেই একজন চলে গেলাম হেটে ২০০ গজ দূরে জীপ স্ট্যান্ডে। সেখানে অনেক ভাড়া কষাকষি করে ১১০০ রুপিতে একটি জীপ নিলাম। উপরে খাঁচা থাকা জীপ নিলাম যাতে লাগেজ গুলো উপরে বাঁধা যায়।

যাত্রা আবার শুরু শিলিগুড়ি টু দার্জেলিং। কিছুদূর সমতল ভূমিতে গাড়ী চালানোর পর সামনে দেখতে পেলাম পাহাড়ের দৃশ্য। হায় হায় কিসের বান্দরবনের পাহাড়। হাজার হাজার ফিট উচ্চতা সেই পাহাড়। ধীরেধীরে গাড়ী যখন পাহাড়ের উপর উঠে চলা ধরলো তখন সমতল ভূমিতে অন্য গাড়ী গুলোকে পিঁপড়ার মত লাগতে থাকলো। সন্ধ্যা নামতে দার্জেলিং শহর চলে আসলাম। ড্রাইভারকে বললাম বিগ বাজারের ৩০০গজ আগে নামিয়ে দিতে।

একটি সরকারী রেন্ট এ কারের ডিপো দেখতে পেলাম সেখানেই নেমে পড়লাম। সবাইকে একটি দোকানের পাশে বসতে দিয়ে দুইজন চলে গেলাম হোটেলের সন্ধানে। সেখানের সব বিল্ডিং কম বেশী হোটেল তাই দূরে যাওয়া লাগেনা। এক হোটেলে ঢুকেই চাপাচুপা মেরে প্রতিদিন মাত্র ৩৫০ রুপিতে জনপ্রতি তিনবেলা খাওয়া ও থাকা কন্ট্রাক্ট করে নিলাম। ৩টা রুম দিল। কার্পেটিং করা, বাথরুমে গরম পানি সবই ভাল ব্যবস্থা। হোটেলে গোসল করে ফ্রেশ হয়েই পাশের সেই রেন্ট এ কারে চলে গেলাম।

মে হু না মুভির শ্যূটিং স্পটমে হু না মুভির শ্যূটিং স্পট

পরবর্তী দিনের ট্যুর প্যাকেজ প্ল্যান করতে থাকলাম। তাদের কাছ থেকে ৩দিনের ট্যুর প্যাকেজ নিলাম যা খুবই চিপ অন্য জায়গার তুলনায়। যার মধ্যে ছিল, দার্জেলিং সিটি ট্যুর। এটি সারাদিন আপনাকে দার্জেলিং শহরের আশেপাশের সকল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখাবে। এছাড়া পর্যাক্রমে নিলাম টাইগারহিল, গঙ্গামায়া পার্ক, রক গার্ডেন, মে হু না মুভির শ্যূটিং স্পট St.Pauls School বাকীটা ব্যক্তিগত শপিং সময়। দার্জেলিং এর প্রতিটি সাইটসিং সুন্দর তারমধ্যে এই ট্যুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে টাইগার হিল ভ্রমণ।

টাইগার হিলে যেতে আপনাকে রাত ৩টায় উঠতে হবে। সময় মত গাড়ী আপনার হোটেলে চলে আসবে। ভয়াবহ শীতের প্রস্তুতি নিয়ে আপনাকে বেড় হতে হবে। দার্জেলিং থেকে আরো উচ্চতার দিকে আপনি উঠতে থাকবেন যা ভূমি থেকে মনেহয় ১৭০০০ ফুট উপরে। অন্ধকার থাকতেই আপনি সেখানে পৌঁছে যাবেন। ধীরেধীরে অনেক গাড়ী ট্যুরিস্ট নিয়ে আসতে থাকবে। একটি সময় মানুষে ভরপুর হয়ে যাবে সেই স্থানটি। ঠান্ডার থেকে রক্ষা পেতে গরম গরম কফি খেয়ে নিলাম। আসলে সেটি একটি উঁচু স্থান যেখান থেকে সামনে তাকালে পৃথিবী গোলাকার তা দেখা যায়।

কাঞ্চনজঙ্গাকাঞ্চনজঙ্গা

অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য যা নিজ চোখে না দেখতে পারলে লিখে প্রকাশ করতে পারবোনা। সামনের সেই গোলাকার পৃথিবী ভেদ করে যখন সূর্যিমামা উদয় হয় তখনের মূহুর্ত অন্যরকম। হয়ত ভাববেন ঢাকা শহরে ভোরে ছাদে উঠলেওতো সূর্য উঠা দেখা যায়। কিন্তু আসলে এটি সে উঠা নয়। সূর্য উঠার আগে অপর পাশে অবস্থানরত হিমালয় সাদা বরফে ঢাকা পর্বত যা কাঞ্চনজঙ্গা নামে পরিচিত। সেই পাহাড়ের উপর প্রান্তে সবার আগে সূর্যের আলো এসে পরে এবং ডায়মন্ডের মত জ্বলে উঠে। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে দেখবেন হাল্কা আলোকিত হয়ে সূর্য আসছে। সবাই সেইক্ষনের অপেক্ষায়। সত্যি সূর্য আসলো তবে সেটি ঢাকার শহরের রুপ নিয়ে নয়। মনেহল দূরে মাটি ভেদ করে এক জ্বলন্ত লাল ডিমের কুসুম জেগে উঠলো। হায় হায় আমি কি দেখছি। কি অপরূপ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি।

কি অপরূপ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি।কি অপরূপ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি।

এভাবে আনন্দে পাড় হতে থাকলো দার্জেলিং ট্যুর। অনেক সভ্য একটি জাতি সেখানকার। ভাবতে অবাক লাগে আমাদের এত কাছে অথচ কতইনা সভ্য। কোন ইভিটিজিং নাই, নিরাপত্তাও ভাল। গভীর রাতে একা একা মেয়েরা পথ চলে টেনশন ছাড়া। দার্জেলিং এ শপিং তুলনামূলক মূল্য বেশী। বিভিন্ন মসল্লা, চাপাতা সেখান থেকে কেনা যেতে পারে এছাড়া শীতের শাল, সুয়েটার যা ভালই পাবেন। খাবার খেতে ভালই লাগবে তবে প্রতিবেলা খাওয়ার সময় ভাতের আগে আপনাকে পাঁপড় ভাঁজা দিবে যেটি ভিন্নতা লেগেছে।

আকর্ষণীয় স্থানআকর্ষণীয় স্থান

যেদিন দার্জেলিং থেকে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন গাড়ীর সাথে কন্ট্রাক্ট করলাম যেন সেটি মিরিক ভায়া হয়ে নিয়ে যায়। মিরিক আর একটি আকর্ষণীয় স্থান যেটি শিলিগুড়ি ফেরার পথে পড়বে। এখানে বলে রাখা ভাল শিলিগুড়ি থেকে দার্জেলিং আপ ডাউন দুই প্রান্ত দিয়ে করা যায় তাই যেখান দিয়ে যান না কেন আসার সময় কিংবা যাওয়ার সময় মিরিক ভায়া করে যাবেন। মিরিক ভূমি থেকে প্রায় দশ হাজার ফুট উপরে যেখানে বিশাল লেক ও মাঠ আছে এবং পাহাড়ে সুন্দর সুন্দর বাড়ী যা দেখতে সুইজারল্যান্ড মনে হতে পারে (ঘোলের স্বাদ ডালে মিটানো  ) । মিরিক ঘুরে শিলিগুড়ি পোঁছাইলাম দুপুরের আগে এবং কোনমতে খেয়ে আবার রিজার্ভ জীপ নিয়ে চলে গেলাম চেংরাবান্দা বর্ডারে। বর্ডারে ৫টার আগে পৌঁছাতে হবে নতুবা বন্ধ হয়ে যাবে। আপনি ইচ্ছা করলে একরাত শিলিগুড়ি থাকতে পারেন এতে আপনি খুশি না হলেও আপনার ঘরনি মহা খুশি হবেন কারন তারা প্রাণ খুলে একটু শপিং করতে পারবেন। যদিও আমি একবার ছিলাম।

লেখকলেখক

লিখলে আমি অনেক লিখতে পারতাম কিন্তু পাঠককে আর বিরক্ত করতে চাইনা। যতটুকু না লিখলেই নয় এরই মাঝে শেষ করলাম আমার দার্জেলিং ট্যুর। এই পরামর্শ নিয়ে আপনিও যেতে পারেন। সত্যি বলছি আপনার মন যতই খারাপ থাকুক না কেন তা ভাল হয়ে যাবে।