আমরা যারা ভ্রমণ ভালোবাসি, তারা যে দেশে যতই ভ্রমণে যাইনা আর ভালো যে যায়গা যতই ভালো লাগুকনা কেন, নিজের দেশের যে কোন যায়গার জন্য সবসময়, সবচেয়ে বেশী টান অনুভব করি। কিন্তু যখন দারুণ ভ্রমন আকর্ষণ আর সম্ভাবনাময় কোন যায়গার অপমৃত্যু দেখি তখন ভালো মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়। অবহেলা, অনাদর আর অব্যবস্থাপনা দেখে। তখন মনে মনে বলি নাহ, এখানে আর আসা যাবেনা! 

একবার ভাবুন তো যে আপনি-আমিই যদি আমাদের ভীষণ নান্দনিক কোন যায়গায় গিয়ে, সেই যায়গার অনাদর আর অবহেলা দেখে সেখানে আর না যেতে চাই, তাহলে দূরের বা বাইরের কেউই সেসব যায়গায় গিয়ে কিভাবে খুশি হতে পারে? যেখানে ঘুরে এসে আমাদের উচিৎ সেই যায়গাটার কথা বলা, লেখা বা দারুণ ছবি তুলে ধরে অন্যদেরকে উৎসাহ দেয়া, সেটার পরিবর্তে আমরা অন্যদেরকে নিরুৎসাহিত করতে বাধ্য হই! যেন গিয়ে, ঘুরে এসে গালাগাল না দেয় সেই ভয়ে!

ক্যাম্পিং...ক্যাম্পিং...

 

ঠিক এমনই অনুভূতি হয়েছে সম্প্রতি আহসান মঞ্জিল বেড়াতে গিয়ে! কি চমৎকার, নান্দনিক আর আকর্ষণীয় একটা স্থাপনা, গাড় নীল আকাশের নিচে, সবুজের গালিচার মাঝে ভীষণ রোমান্টিক রঙের সেজে থাকা গোলাপি রঙের আহসান মঞ্জিল! তার বাকি সৌন্দর্য বা ভিতরের নান্দনিকতার গল্প আর একদিন বলবো, কারন সেদিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ভিতরে যেতে পারিনি। কিন্তু বাইরে থেকে সবুজের মাঝে ওর রূপ দেখেই আমি মুগ্ধ, অভিভূত আর আহ্লাদিত। যে আর একদিন গিয়ে ওকে ভালভাবে, মন ভরে উপভোগ না করলেই নয়। 

কিন্তু এই এমন নান্দনিক আহসান মঞ্জিলের বাইরের পরিবেশ দেখে আমি যারপর নাই, হতাশ, ব্যাথিত আর ক্ষুব্ধ। আপনি ভেবে দেখুন, চমৎকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁসে সবুজের মাঝে দাড়িয়ে আছে একটা দারুন আদুরে স্থাপনা গোলাপি রঙে রেঙে, যার উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ, ছুটে চলা সাদা মেঘেদের ভেলা, ঝিরঝিরে নদীর বাতাসে দোল খেয়ে চলেছে খেয়া নৌকা! কেমন লাগবে? শুধু যদি ঠিক এমন পরিবেশ পেতেন তবে অনন্তকাল সেখানে বসে থাকতে চাইবেন যে কেউ। 
 

ঘাসের গন্ধ, সবুজের দ্বন্দ্বঘাসের গন্ধ, সবুজের দ্বন্দ্ব

কিন্তু যদি এমন হয়? নদীর পাড় ঘেঁসে হাটতে গিয়ে পড়লেন অনবরত ময়লা-আবর্জনার সামনে, উপরে রাস্তায় হাটবেন আহসান মঞ্জিলের প্রাচীর বা দেয়াল ঘেঁসে? সেখানে ডাস্টবিন আর উচ্ছিষ্টে ভরপুর! খোলা রাস্তার উপরে বসেছে ফলের আড়ত, তরকারীর বাজার আর সেসবের সকল আবর্জনা যে যার মত করে ছুটে ফেলছে রাস্তাতেই! চারপাশ উপভোগ করবেন কি করে, চোখ-নাক আর মুখ ঢাকতেই যদি ব্যাস্ত থাকতে হয়? আর এমন নান্দনিক একটা স্থাপনার সামনের, পিছনের, পাশের চারপাশ জুড়ে শুধু ময়লা আবর্জনা, পানের পিক, নানা রকম মল ও উচ্ছিষ্টর আধার! 

তখন আপনার সুন্দর ভ্রমন মানসিকতা কতক্ষণ টিকে থাকবে? তখন কি আপনি চাইবেন আপনার পরিবার, সন্তান, বন্ধু-বান্ধবসহ সেখানে গিয়ে একটা বেলা নিজের মত করে কাটাতে? চাইবেন এমন উচ্ছিষ্টে ভরা কোন যায়গার কথা ফলাও করে কাউকে বলতে? কোন বিদেশী বন্ধুর কাছে পারবেন কি গর্ব আর অহংকার করে বলতে? পারবেন না। 

অথচ এমন একটা যায়গায়, এমন দুর্লভ একটা স্থাপনাই পারে আমাদের পর্যটনে অনেক অনেক অবদান রাখতে। হোক সে স্বল্প পরিসরে, কিন্তু নিজের মহিমা তো জানান দিতে পারবে সগৌরবে। ঠিক এমনই অবস্থা আমাদের অন্যান্য পর্যটন সম্ভাবনার সকল স্তরে। হোক সেটা কক্সবাজার, সেন্ট মারটিন, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, সাজেক বা সিলেটে।
 

কক্সবাজারকক্সবাজার

অনেকে হয়তো মনে মনে ভাবছেন, আরে পিছিয়ে পরছি কোথায়? আমরা তো এগিয়ে যাচ্ছি! আগে তো এতো মানুষ বেড়াতে যেতনা, পাহাড়ে বা সমুদ্রে। এখন তো প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বেড়াতে যাচ্ছে নানা যায়গায়, তাহলে এগিয়ে না গিয়ে কিভাবে পিছিয়ে পরছে! 

শুধু বেশী মানুষ বেড়াতে গেলেই কোন দেশের পর্যটন এগিয়ে যায়না। পর্যটন এগিয়ে যায়, পর্যটন আকর্ষনের যায়গা গুলোর টেকসই উন্নয়ন করে, সুন্দর আর সুস্থ রেখে। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরের মানুষের কাছেও সেই যায়গাটাকে আকর্ষিণীয় করে তুলে ধরে, তাদেরকে এদেশে এসে সেই যায়গা দেখে অভিভূত হতে বাধ্য করে। যেটা আপনার-আমার পাশাপাশি বিদেশীরাও বলতে বা প্রচার করতে চাইবে এবং করবে। এভাবেই পর্যটন এগিয়ে যায়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের দরবারে। যার প্রমাণ আমাদের প্রতিবেশী দেশ, ভারত, নেপাল আর ভুটান। 

এবার আপনিই বলুন আমাদের দেশ কতটা পর্যটন বান্ধব? কতজন বিদেশী আসে আমাদের দেশটা চষে বেড়াতে? আর কতজন অন্য দেশ গুলোতে? অথচ আমাদের পর্যটন আকর্ষণ কিছু কোন মতেই কম কিছু নয়। কি নেই আমাদের? সব আছে, আছে অনেক দুর্লভ কিছু। কিন্তু তবুও আমরা এগিয়ে যাবার পরিবর্তে, পিছিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। কারন...... 
 

ঘাসের গন্ধ, সবুজের দ্বন্দ্বঘাসের গন্ধ, সবুজের দ্বন্দ্ব

অসীম সম্ভাবনার পর্যটন খাতকে আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করে চলেছি প্রতিনিয়ত, শুধু মাত্র আমাদের অবহেলা, অনাদর, অসচেতনটা, অব্যবস্থাপনা দিয়ে। যে পর্যটন হতে পারতো আমাদের সম্ভাবনা, উন্নতি আর সমৃদ্ধির সোপান সেটা আজ ঠিক উল্টো দিকে চলেছে! শুধু মাত্র নীতিনির্ধারকদের সাধারণ, সঠিক, সময়ের সাথে তাল মেলানো, সুন্দর সিদ্ধান্তের অভাবে। 

তাই আমার মনে হচ্ছে আমাদের এই অসীম সম্ভাবনাময় পর্যটন এগিয়ে যাবার পরিবর্তে পিছিয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত।
সত্যিই, পিছিয়ে পড়ছে আমাদের পর্যটন! 
কে হাল ধরবে এই...
পিছিয়ে পরা পর্যটনের?

(ছবি লেখকের বিভিন্ন ভ্রমণ থেকে নেয়া।)