বগালেক বান্দরবন জেলা সদর হতে ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে পাহাড়ের উপর তৈরি করেছে বগালেক। সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ১৭০০ ফিট উপরে পাহাড় চূড়ায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই অত্যাশ্চর্য হ্রদটি।লেকটি যতটা না অবিশ্বাস্য তার চাইতেও বেশী এর সৌন্দর্য। শান্তজলের হ্রদ আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে নিজেও ধারন করে নিয়েছে সেই বর্ণীল রং। মুগ্ধ নয়তে দেখতে হয় আকাশ পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। তুলির আঁচড়ে বগালেকের পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে।

পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙেপুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে

এ এমনই এক ছবি যা দেখামাত্র ভ্রমনপিপাসুদের ক্লান্তি-তৃষ্ণা উবে যায় মুহুর্তের মাঝে। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তি হারিয়ে যায় নিমিষেই। সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত, প্রতি বেলাতেই বগালেক নতুন রূপে ধরা দেয়।নিজ চোখে না দেখলে কল্পনাতীত। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগালেককে দেয় স্নিগ্ধ সতেজ রূপ, ঠিক তেমনি রাতের বেলায় দেখা যায় ভিন্ন এক মায়াবী হাতছানি। রাতের বগালেক দিনের বগালেক হতে একেবারেই আলাদা। আর যদি রাতটি হয় চাঁদনী রাত তবে এটি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের একটি। নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিড়ে হঠাৎ একফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে বগালেকের শান্তজলে। মৃদুমন্দ বাতাসে ছোট ছোট ঢেউয়ে দুলতে থাকে হ্রদের পানিতে চাঁদের ঝরে পড়া আলোকরাশি। নিজেকে নিজে হারিয়ে ফেলতে হয় এমন রূপে। চারিদিক নিস্তব্ধ, নিথর, জনমানবশুন্য। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, সেই নির্জন বেলায় বগালেকের পাড়ে বসে জোছনাস্নানের অভিজ্ঞতাই অন্যরকম।

পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙেপুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রঙে

 

বগালেক তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। বগালেকের গড় গভীরতা আনুমানিক ১৫০ ফুটের মত। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ। এর আশেপাশে পানির কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই লেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়। আর লেকের সাথে সাথে আশেপাশের নদীর পানিও ঘোলাটে রং ধারণ করে। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়। প্রচুর মাছ ও জলজ লতাপাতায় ভরপুর এই হ্রদ।বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদগণ মনে করেন বগালেক মূলত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ।

বগালেকবগালেক

 

বগালেককে অনেকে ড্রাগনলেকও বলে থাকে। বগালেকের জন্ম ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় পাহাড়ি গ্রামগুলোয় একটি মজার লোককথা প্রচলিত আছে, সেটি অনেকটা এরকম – “অনেক অনেক দিন আগে একটি চোঙা আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম পাহাড় ঘন অরণ্যে ঢাকা। পাহাড়ের কোলে বাস করত নানা নৃগোষ্ঠীর মানুষ। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা প্রভৃতি। তো সেই পাহাড়ের নিকটবর্তী গ্রামগুলো থেকে প্রায়ই গবাদিপশু আর ছোট শিশুরা ওই চোঙ্গা আকৃতির পাহাড়টিতে হারিয়ে যেতো! অতিষ্ঠ গ্রামগুলো থেকে সাহসী যুবকদের দল এর কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে দেখতে পায়, সেই পাহাড়ের চূড়ার গর্তে এক ভয়ঙ্কর দর্শন বগা বাস করে। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। তারা কয়েকজন মিলে ড্রাগনটিকে আক্রমণ করে হত্যা করে ফেলে। ড্রাগনটির মৃত্যুর সাথে সাথে ড্রাগনের গুহা থেকে ভয়ঙ্কর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে এসে পুড়ে দেয় আশপাশ। নিমিষেই সেই পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম একটি পাহাড়ি লেকের জন্ম হয়”তবে বগালেকের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান।বান্দরবান থেকে চাদের গাড়ি বা বাসে রুমা উপজেলা।রুমা বাজার থেকে বগালেকের নীচে(কমলাবাজার)চাদের গাড়িতে।সেখানে থেকে বগালেকে হেঁটে চড়াই।বিকল্প হিসেবে ঝিরিপথে রুমা বাজার থেকে হেঁটে যেতে পারেন তবে সেটা কষ্ট এবং সময় সাপেক্ষ।

 

ট্রিপ টু বান্দরবান ২০১১(বগালেক)