সোনামার্গ থেকে যে আবার যোজিলাপাস নামক কোথাও যায় বা যাওয়া যায় সেটা কোন রকম ধারনাই ছিলোনা। তাই আমাদের ভ্রমণ তালিকাতেও এই যায়গা ছিলোনা। কিন্তু সোনমার্গে পৌঁছানোর কিছু পরে দেখি স্থানীয় লোকজন ঘিরে ধরেছে যোজিলা পাস নিয়ে যাবার জন্য। সেখানে বরফ পাওয়া যায়, স্লেজিং করা যায়, স্কি করা যায় নানা রকম লোভ দেখাতে থাকলো। কিন্তু আমি গুলমার্গে ২১০০ রুপীর যে আলপিনের খোঁচা খেয়েছি তাতে আর ওই পথে পা বাড়াবো না কিছুতেই।

এদিকে একটু পরে দেখি সহযাত্রীদের একজন জীপ প্রায় রেডি করে ফেলেছে ৫৫০০ রুপিতে, ১০ জনের জন্য যোজিলা পাস যেতে। তবুও আমি নিম রাজী, আর টাকা খরচ করে আরও ব্যাথা বাড়াতে চাইনা, যদিও এটার রেশিও বেশ কম তুলনামুলকভাবে। প্রতি পরিবার ১২৫০ রূপী করে পরবে। তবুও আমি ঠিকঠাক মনের সায় পাচ্ছিলাম না, কিন্তু সবাই গেলে আমরা না গেলে কেমন একটা অভদ্রতা হয়ে যায় দেখে চললাম শেষ পর্যন্ত, এটাকেও লস প্রজেক্ট ধরে নিয়েই।

রোমাঞ্চকর যোজিলা পাসরোমাঞ্চকর যোজিলা পাস

 

কিন্তু মাত্র ১০ মিনিট জীপ চলতেই আমাদের মাথা খারাপ হতে থাকলো ধীরে ধীরে। কারন যে বরফের পাহাড় গুলো আমরা সোনমার্গে বসে বসে দেখছিলাম, সেই পাহাড়ের দিকেই যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। আর তার পাশেই অঝর ধারায় বয়ে চলেছে সিন্ধু নদী দুই পাহাড়ের খাঁদ দিয়ে। বিকট হুংকার তুলে। সেই সাথে সবুজ পাহাড় ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলো। আর সামনে আসতে শুরু করলো, শুকনো মাটির রুক্ষ পাহাড়, ঝুরো পাথরের ভয়ানক রাস্তা, পাথুরে পাহাড় পিঠ কেটে বানানো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ সব বাঁক! যেখান থেকে একবার পরে গেলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবেনা, এতটাই খাড়া আর কোন রকম বাধাহীন এই রাস্তা।

এক একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক পার হয় আর সামনে এক এক রকম পাহাড় তার এক এক রকম রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে সামনে। পাথুরে পাহাড় দিয়ে ছুটে চলেছি, কখনো ধীরে, কখনো দ্রুত গতিতে। দূরে বরফে মোড়ানো পাহাড়ের সারি আর চূড়ারা চোখে পড়ছে অনবরত, অন্য পাশের পাহাড়ে সবুজ বনভুমি, আর অনেক অনেক নিচে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদীর জলধারা তার নিয়মে।

 দূরে বরফ পাহাড় দূরে বরফ পাহাড়

 

ঠিক এই যায়গাটা বৈচিত্রই নানা রকম, একই সাথে মাটির পাহাড়, পাথুরে পাহাড়, ঝুরো পাথরের রাস্তা, দূরে বরফ পাহাড়, অন্যপাশে সবুজ পাহাড় আর পুরো রাস্তা জুড়ে সিন্ধু নদীর বয়ে চলা। এইসব বইচিত্রে মাঝেই আচমকা চোখের সামনে চলে এলো একেবারে সিনেমার দৃশ্যের বাস্তবতা! বরফের পাহাড় কেটে বানানো রাস্তা! আমাদের গাড়ি এখন দুই বরফের পাহাড় কেটে মাঝ দিয়ে বানানো বরফের রাস্তা দিয়েই সামনে এগিয়ে চলেছে। আনন্দে সবাই প্রায় চিৎকার করে উঠলো একই সাথে।

রাস্তার দুই পাশে একদম গাড়ি ঘেঁসে বরফের পাহাড়, সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে বরফ গলে গলে, যে বরফ গলা অবশেষে ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পরে যোগ দিচ্ছে নিচে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী সিন্ধুর বুকে। একটু পরেই আমাদের গাড়ি থামলো সনাতন ধর্মের তীর্থ বলে খ্যাত বালতাল এর ঠিক চুড়ায়। আর বালতালের অবস্থান একদম নিচের পাহাড়ের পাদদেশে সিন্ধুর অববাহিকায়। সে এক অদ্ভুত যায়গা, বলে বা লিখে যার সৌন্দর্য বোঝানো সম্ভবই নয়। এটা শুধু নিজে গিয়ে, উপভোগ করেই বুঝতে হবে।

আবারো আমরা গাড়িতে উঠে পরলাম। ৩০ মিনিট সেই একই রকম, পাথুরে, মাটির, বরফের ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে চোখ বন্ধ করে এসে পৌছালাম যোজিলা পাস, বরফের রাজ্যে বা বরফের ভ্যালীতে। কারন বরফের এই গ্লেসিয়ারটা পাহাড়ের উপরে হলেও চারপাশে আরও অনেক উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা পাহাড়ী ভ্যালীই বলা যায়।

এখানে দারুণ কনকনে শীতে সবাই প্রথমবারের মত সত্যিকারের শৈল আবহাওয়া উপভোগ করলো আর সাথে সাথে যার যত গরম কাপড় ছিল পরে নিতে বাধ্য হল। এখানে চারপাশেই শুধু বরফ পাহাড়ের ছড়াছড়ি, নিচের ভ্যালীতে কোথাও সবুজ, কোথাও পাথর আর কোথাও বরফের আস্তরণ। এখানে কেউ স্লেজিং, কেউ স্নো বাইক, কেউ বরফে হেটে, কেউ গড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ ছবি তুলে সময় কাটালো একেবারেই নিজের নিজের মত করে।

 দূরে বরফ পাহাড় দূরে বরফ পাহাড়

 

অবশেষে ক্লান্ত হতেই, স্থানীয় তাবুতে নুডলস, চা, ডিম দিয়ে লাঞ্চ করে নিল তখনকার মত করে। খেয়ে দেয়ে একটু ক্লান্তি দূর হতেই গাড়িতে উঠে পড়তে হল আবহাওয়া খারাপ হয়ে রাস্তায় ঝামেলা হবার আগেই। কারন এখানে আবহাওয়ার কোন ঠিকানা নেই। এই ঝকঝকে নীল আকাশ তো, এই পরোক্ষনেই কালো মেঘে ঢাকা ঝড়ো বাতাস, এই ঝলমলে রোদ, তো এই ঝুমঝুম বৃষ্টি। আর পাথুরে ঝড় ও দুর্ঘটনা তো নিত্য দিনের ঘটনা!

তাই ছুটতেই হল নিজেদের আসল গাড়ির দিকে, সোনমার্গের পথে। ভয়ানক, ঝুঁকিপূর্ণ আর বাঁকে বাঁকে হারিয়ে যাবার রোমাঞ্চকর পাথুরে পাহাড়ের ঝুরো মাটি আর পাথরের রাস্তা দিয়েই। পথে দেখেছিলাম অনিন্যসুন্দর কাশ্মীরের শেষ গ্রাম। বালতালের একটু কাছেই। এটাই কাশ্মীরের শেষ জনপদ হিসেবে বিবেচিত। 
এরপর জনপদ আবার সেই লেহতে! আর এই পথেই যেতে হয় বিখ্যাত লেহ-লাদাখ হাইওয়ে, পৃথিবীর উচ্চতম যানবাহন চলাচলের রাস্তা আর উচ্চতম যুদ্ধখেত্র কারগিল!

খুব দ্রুত আমি কারগিল হয়ে এই লেহ-লাদাখ হাইওয়ের পুরো রোমাঞ্চকর রাইডের স্বাদ নিতে চাই সেই স্বপ্নের জালে আর একটু রঙ লাগিয়েই, সেদিনের মত ফিরে এসেছিলাম, সত্যিকারের সোনায় মোড়ানো সোনমার্গে! তবে যোজিলা পাশের আনন্দ-রোমাঞ্চ আর শিহরণও কোন অংশে কম ছিলোনা।

তবে সোনমার্গ থেকে শ্রীনগর ফেরাটা ছিল ভীষণ হিম ধরা, আর গাঁয়ে কাটা দিয়ে যাওয়া ঘটনার মধ্য দিয়ে, প্রায় মধ্য রাতে! কাশ্মীরের নিয়মিত আতঙ্ক আর ভয়ের মধ্য দিয়ে। ঝুঁকিপূর্ণ আর ফিরতে পারবো কি পারবোনা সেই আশংকা নিয়ে!