ভাগ্যের মুচকি হাসি, অট্টহাসি...!!

আমরা যারা দেশে বা দেশের বাইরে বিভিন্ন সময় বেড়াতে যাই, অনেকেই অনেক সময় অনেক ধরনের সমস্যায় পরে থাকি। এসব সমস্যার মধ্যে আর্থিক সমস্যা অন্যতম। অন্যান্য নানা রকম সমস্যায় অনেক মানুষের কাছ থেকে সাময়িক সাহায্য পাওয়া গেলেও, আর্থিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হলে সেটার সমাধান পাওয়া খুব কঠিন হয়ে ওঠে। আর সেটা যদি হয় পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে গিয়ে, তবে সেটার ভয়াবহতা হয় অসীম। আজকে তেমন একটা সত্য গল্প বলি।

তবে এমনটা যে ঘটতে পারে সেটা ভাবতেই পারিনি। ঘটনার শুরু আমাদের শ্রীনগর এয়ারপোর্ট থেকে। এমনিতেই সবার মন বেশ খারাপ ছিল, চোখের পলকে কাশ্মীরের ৭ দিন শেষ হয়ে যাওয়াতে। এয়ারপোর্ট এ এসে বোডিং পাস নিয়ে প্লেন ছাড়ার নির্ধারিত গেটে গিয়ে জানতে পারি আমাদের নির্ধারিত প্লেন এখনো ল্যান্ড করেনি, অন্য কোন যায়গা থেকে আসবে। তাৎক্ষনিক তেমন একটা ভাবনা হয়নি, আমাদের প্লেন দিল্লী পৌঁছানো আর দিল্লী থেকে ট্রেন তার ২:৩০ ঘণ্টা পরে ছাড়বে তাই, আর তাছাড়া আগে কখনো এভাবে প্লেন-ট্রেন কানেক্টিং অভিজ্ঞতা না থাকার কারনে।

কিন্তু ৩০ মিনিট পরেও যখন প্লেন এলোনা তখন ধীরে ধীরে শঙ্কা জাগতে লাগলো, পাশাপাশি কিছুটা টেনশন, প্লেন যদি বেশী দেরি করে আর ট্রেন যদি মিস করি তাহলে কি হবে? সেই দুইমাস আগে থেকেই রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেন এর টিকেট করে রাখা ছিল আমাদের। মা-ছেলে সহ অন্যান্য সঙ্গীদের এই ট্রেনে চড়ার দারুণ অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেব বলে। প্রায় ৪০ মিনিট পরে প্লেন ল্যান্ড করলে হাফ ছেড়ে কিছুটা বাঁচলাম, যাক এবার তবে যাবে, একটু দেরিতে হলেও। গিয়েই ১:৩০ থেকে ২ ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে।

কিন্তু না প্লেন ছাড়তে ছাড়তে আরও প্রায় ৪০ মিনিট নিলো! মানে ১:৩০ ঘণ্টা এখানেই দেরি! ততক্ষণে ধরেই নিয়েছি যে আজ আর ট্রেন পাওয়া সম্ভব হবেনা। পুরো প্লেনে দারুণ অস্থিরতা আর টেনশনে কেটেছে উপভোগের পরিবর্তে। কিছুটা আশা ছিল এই ভেবে যে শ্রীনগর থেকে একজন বলেছিলেন এয়ারপোর্ট থেকে নিউ দিল্লী স্টেশনে যেতে মেট্রোতে মাত্র ২০ মিনিট লাগে। তাই কিছুটা প্রত্যাশা ছিল মনে মনে।

ট্রেনের  অপেক্ষাট্রেনের অপেক্ষা

কিন্তু প্লেন দিল্লীর আকাশে এসেও ঠিকমত ল্যান্ড করতে পারলোনা খারাপ আবহাওয়ার কারনে! প্রায় ২০ মিনিট দিল্লীর আকাশে উড়ে উড়ে যখন ল্যান্ড করলো, ততক্ষণে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে! তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, যদি ট্রেন একটু লেট থাকে আর যতটা তারাতারি পৌঁছানো যায়। ট্রেন থেকে নেমে জানতে পারলাম যে এখান থেকে মেট্রো নয়, মেট্রো টার্মিনাল-৩ থেকে ছাড়ে! যেটা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নামে পরিচিত বা যেখান থেকে মুলত বিমান গুলো উড়ে যায়।

তো, সেটা তো অন্তত ২০ মিনিট থেকে ৩০ মিনিটের পথ, পথে কোন রকম জ্যাম ছাড়াই। আর যদি জ্যাম হয় তাহলে তো কথাই নেই। তার মানে ট্রেন পাবার আশা একেবারেই বাতিল! তবুও ছুটলাম মনকে সান্ত্বনা দিতে পড়িমরি করে। টার্মিনাল-৪ থেকে বাসে করে টার্মিনাল-৩ এর দিকে। কাঁধে-পিঠে দুই ব্যাগ, দুই হাতে দুই ব্যাগ, আর চোখে চোখে ছেলে আর ছেলের মা!

উহ কি যে দুঃসহ ছিল পরের একটি ঘণ্টা লিখে বোঝানোর সাধ্য নেই। বাসে উঠে ব্যাগ ঠিকঠাক মত রাখার যায়গা নেই, তবুও রাখা হল ঠেলেঠুলে। বাস ছেড়ে দিল উঠতেই। ২০ মিনিট নয় ১৫ মিনিটের মধ্যেই একটি মেট্রো স্টেশনে নামিয়ে দেয়া হল আমাদের। আগে থেকে বলে রাখায়। তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নেমে ছুটলাম মেট্রো স্টেশনের দিকে সামনে-পিছনে আর হাতে ব্যাগ নিয়ে, চোখে চোখে ছেলে আর ছেলের মাকে রেখে।

অপেক্ষাঅপেক্ষা

এখানেও কিছু বিড়ম্বনা, যেদিন দেরি হয় সেদিন সব যায়গাতেই হয়! ভাগ্য সেদিন খুব নির্মম ভাবে মুচকি হাসে, ভুক্তভোগীর দিকে তাকিয়ে! ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের ভাগ্যও আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল, আর আমাদের বলছিল আর তাড়াহুড়ো করিসনারে, তোরা আর ট্রেন পাবিনা আজ!

ধীরে ধীরে চল... কারন ভুলে মেট্রোর টিকেট না কেটে আবারো বাসের টিকেট কাটা হয়েছিল! পরে সেই টিকেট ফেরত দিতে আবারো স্ক্যানিং মেশিন এর বাইরে গিয়ে টিকেট ফেরত দিয়ে মেট্রোর টিকেটের জন্য যখন দাঁড়ালাম ততক্ষণে বিশাল লাইন হয়ে গেছে!

এরপরও মনকে বোঝাতে টিকেট কেটেই লিফট এ নিচে নেমে মেট্রোর জন্য অপেক্ষা। ঠিক ৪ মিনিট পরে মেট্রো এলো। উঠে পড়লাম, কিন্তু সিট ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও কেউ বসলামনা, টেনশনে। ৪ টি স্টেশন আর ঠিক ২০ মিনিট পরে আমাদের নামিয়ে দেয়া হল নিউ দিল্লী রেলওয়ে স্টেশনের মেট্রো স্টেশনে। তখন ঘড়িতে সময় ৮:২০। ট্রেন ছেড়ে গেছে ঠিক সময়ে ৭:৪০ এ!

এখন কি হবে? সবার তো মাথায় হাত, মুখ শুকিয়ে আমসত্ত হয়ে গেছে! কাশ্মীরের আনন্দ এখন দিল্লীর বিষাদে পরিণত হয়েছে! কারো কাছে তেমন কোন টাকা নেই! রাতে থাকতে হবে, খেতে হবে, তার চেয়েও বড় কথা কলকাতা যাবার ট্রেনের টিকেট কাটতে হবে! কি হবে এখন?

সবাইকে নিশ্চিন্ত করলাম, ভয় নেই, আমার কাছে ভ্রমণের নিরাপত্তা মুলক অর্থ আছে পর্যাপ্ত। যা দিয়ে আরও ৭ দিন দিল্লী থেকে-খেয়ে ট্রেন টিকেট কেটে যাওয়া যাবে! সাথে সাথে সবার মুখে হাসি ফুটলো। এরপরের কষ্ট আর খুব একটা কষ্ট মনে হয়নি কারো কাছেই, যেতে পারবে কলকাতা আর কোন বড় ক্ষতি ছাড়াই এই আনন্দে!

এরপর বিদেশীদের জন্য নির্ধারিত টিকেট অফিসে চলে গেলাম দুটি অটো ঠিক করে ১ নাম্বার প্লাটফর্মে। সেখানে গিয়ে এসির মধ্যে বসে আরাম করে টিকেট কেটে, চলে গেলাম হোটেল ঠিক করতে। সবাইকে ওই অফিসের আরাম দায়ক সোফা আর এসির প্রশান্তির মধ্যে বসিয়ে রেখে।

ষ্টেশনষ্টেশন

হোটেল ঠিক করে এলাম ৯০০ রুপী, ডাবল এসি রুম, সাথে ওয়াইফাই, বেশ ভালো আর বড় রুম, পরিচ্ছন্ন বাথরুম আর আন্তরিক সেবার। পরদিন দিল্লী ঘুরে দেখা হল একবেলা। আর এরপর ট্রেন ছাড়ার বেশ আগেই চলে গেলাম স্টেশনে। কিন্তু হায়, আজ আমাদের ভাগ্য শুধু মুচকি হাসি দিয়েই সুখ পেলনা, আজ যে সে অট্টহাসিতে ফেটে পরছে আমাদের দিকে তাকিয়ে! সেটা কি রকম?

সেটা হল, আজকে আমরা এক ঘণ্টা আগে স্টেশনে পৌঁছে জানতে পারলাম ট্রেন দেড় ঘণ্টা লেটে ছাড়বে! এখন পর্যন্ত ট্রেন স্টেশন এসেই পৌছায়নি যে......!!

তো এটা ভাগ্যের মুচকি হাসি-অট্টহাসি নয়তো কি?

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-৭ম পর্ব

কাশ্মীরের ছবি-গল্প

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-৫ম পর্ব

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-৪র্থ পর্ব

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-৩য় পর্ব

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-২য় পর্ব

কাশ্মীরের ছবি-গল্প-১ম পর্ব